magazine_cover_12_october_18.jpg

Anandalok Review

রাঁধুনি ভাল না হলে…..

উমা
uma-big

পরিচালক: সৃজিত মুখোপাধ্যায়
অভিনয়: সারা সেনগুপ্ত, যিশু সেনগুপ্ত, অঞ্জন দত্ত, শ্রাবন্তী, অনির্বাণ ভট্টাচার্য

সৃজিত মুখোপাধ্যায় গোড়াতেই গলদ করে ফেলেছেন! বড়দিনের সঙ্গে দুর্গাপুজোকে গুলিয়ে ফেলেছেন (ছবির শুরুতেই বলা হচ্ছে, মারণব্যাধি আক্রান্ত ইভান নামের এক শিশুর শেষ ইচ্ছে পূরণ করতেই ছোট্ট শহর সেন্ট জর্জের বাসিন্দারা নকল বড়দিনের আয়োজন করেছিলেন। এই ছবি তার থেকেই অনুপ্রাণিত)। বড়দিন বা ক্রিসমাস এমন একটি উৎসব, যা কিনা বাড়িতে-বাড়িতে পালন করা হয়, আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে। চার্চে প্রার্থনার মাধ্যমে নিজেদের সংযত খুশি প্রকাশ করা হয়। রাস্তায়ও আলো দেওয়া হয় বটে, তবে কলকাতার দুর্গাপুজোর মতো স্ট্রিট কার্নিভালের পর্যায়ে পড়ে না। আর দুর্গাপুজো মানেই সারা শহরের বয়ে যাওয়ার উৎসব। লক্ষ-লক্ষ মানুষের ভিড়ে এক মহাযজ্ঞের আয়োজন বিশেষ। সৃজিত সেই মহাযজ্ঞ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ব্যর্থ হয়েছেন, মানুষের আবেগের রাশ ভেঙে দিতে। হিমাদ্রি সেন তার ১২ বছরের মেয়ে উমার জন্য নকল দুর্গাপুজো সৃষ্টি করতে চেয়েছেন কলকাতা জুড়ে। তাও এপ্রিল-মে মাসে। কারণ মেয়ে মারণ ব্যাধিতে আক্রান্ত। উমার কাছে অক্টোবর অবধি সময় নেই। তাই সুদূর সুইৎজ়ারল্যান্ড থেকে হিমাদ্রি কলকাতায় চলে এলেন এবং খুঁজে পেলেন ব্রহ্মানন্দকে। যিনি একজন ব্যর্থ সিনেমা পরিচালক। ব্রহ্মানন্দ নকল দুনিয়া (পড়ুন দুর্গাপুজো) সৃষ্টি করে ‘ব্রহ্মা’ হতে চান। তা উমা এল। হাউজ়িং কমপ্লেক্সে নকল দুর্গাপুজো শুরু হয়। দুর্গাপুজো হবে আর মহিষাসুর থাকবে না! তাই এলেন মহীতোষ সুর। তিনি পুজো করতে দেবেন না। তাও পুজো হল, সিঁদুরখেলা হল, বাবুঘাটে বিসর্জন হল। উমা অসুস্থ হয়ে বিদেশে চলেও গেল। কিন্তু হৃদয়কে ছুঁয়ে গেল না। কাঁদার সব উপকরণ থাকা সত্ত্বেও কান্না এল না। বাঙালির দুর্গাপুজো নামক মহার্ঘ আবেগটি বড্ড জোলো হয়ে গেল স্রেফ পরিচালকের ভুলে। কিছুতেই যিশুর কষ্ট, ব্রহ্মানন্দের লড়াইয়ের সঙ্গে একাত্ম হওয়া গেল না। বোঝা গেল না, যে মহীতোষবাবু দুর্গাপুজো করতে বাধা দিচ্ছিলেন, সেই দুর্গাপুজো আয়োজন করার কারণ কী, তার উত্তরটাই কেন জানতে চাননি তিনি! তাঁর ভয়ঙ্কর ভিলেনি চালগুলোও বড্ড বোকা-বোকা। আচ্ছা মহীতোষবাবুকে ছাড়ুন। এবার বলুন, কোন মন্ত্রবলে মাত্র তিনদিনে এত বড়-বড় দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল থেকে প্রতিমা বানিয়ে ফেলল ব্রহ্মানন্দের টিম! ময়দানবও এতটা কুশলী ছিলেন কি? তা সিনেমাটিক লাইসেন্সের কথা উঠতে পারে। তাহলে বলি, ব্রহ্মানন্দ ব্যাঙ্ককের বৌদ্ধ মন্দির তৈরির কথা বললেন, আর সেই প্যান্ডেলটাই কিনা ২০১৭ সালে দেশপ্রিয় দুর্গোৎসব কমিটি দেশপ্রিয় পার্কে করে ফেলল? পরিচালক কি ভেবেছেন দেশপ্রিয় পার্কের পুজোর প্যান্ডেলের কথা বাঙালি ভুলে গিয়েছে? একবছরও কাটেনি। আরও একটা জি়জ্ঞাস্য, বিসর্জনে দেব, প্রসেনজিৎ, মিমি, নুসরতের ভূমিকাটা কী, বুঝলাম না। স্টাররা বুঝি ফ্যান ক্লাবের ম্যাটাডোর নিয়ে নিজেরাই সব জায়গায় পৌঁছন। পরিচালকমহোদয় এই চমক দেওয়ার হেতুটা বুঝতে পারলাম না। যেমন বুঝতে পারলাম না, কী করে ব্রহ্মান্দের ভাঙা পরিবার আবার জোড়া লেগে গেল! যতদূর মনে পড়ছে কাজের কারণে তো ব্রহ্মানন্দকে তাঁর স্ত্রী ছে়ড়ে যাননি। গিয়েছিলেন সময় দিতে পারছিলেন না বলে। তাহলে এখন কী করে ফিরে এলেন? আরও একটা প্রশ্ন বড্ড জ্বালাতন করছে। পুরো সিনেমা জুড়ে উমাকে বেশ পরিণত শিশুই দেখানো হয়েছে, সে তার সাজানো মাকে দেখেও কোনও বাধা দেয়নি শুধু তার বাবার ভালবাসার খাতিরে। এহেন উমা কিনা নকল বৃষ্টি বা নকল পুজোর কথা কিছুই বুঝতে পারল না! কিছু অপ্রয়োজনীয় দৃশ্যের কথা তো বাদই দিলাম। বিছানায় স্বামী-স্ত্রী অথবা অফিসে বসের সঙ্গে কর্মচারীর অপ্রয়োজনীয় সংলাপ, যুবক-যুবতীর চুম্বন দৃশ্য… এই দৃশ্যগুলো ছবিটিকে ভারাক্রান্ত করেছে। তবে এসবের মধ্যে কিছু খণ্ডচিত্র ভাল লাগে। হাউজ়িং কমপ্লেক্সে উমার প্রবেশ মুহূর্ত, দুর্গার অস্ত্রদানের গল্পের সঙ্গে চরিত্রগুলির (পড়ুন দেবতা) আবির্ভাব বা গাড়িতে যিশুর ভেঙে পড়া মনকে ভাল করে দেয়। দুর্গাপুজো যদি দেখাতেই হত, তা হলে কলকাতায় না দেখিয়ে কোনও পৈত্রিক বাড়ি বা গ্রামের প্রেক্ষাপটে তো পুজোটা ফাঁদতে পারতেন পরিচালক! তাতে বিশ্বাসযোগ্যও হত, ফাঁকফোঁকরও কম থাকত আর হৃদয়ের তারও ছুঁত! তবে মন ভাল করে দেয়, ‘ব্রহ্মানন্দ’-এর ভুমিকায় অঞ্জন দত্তের অভিনয়। হয়তো এটা অঞ্জনের সেরা অভিনয় নয়, কিন্তু চিত্রনাট্য ও সংলাপের দাক্ষিণ্য তিনিই পেয়েছেন এবং তার সদ্ব্যবহার করেছেন। ‘মহীতোষ’রূপী অনির্বাণ এবং উমার সাজানো মা ‘মারিয়ম’-এর ভূমিকায় শ্রাবন্তীও ভীষণ ভাল। কিন্তু তাঁরা চিত্রনাট্যের দুর্বলতার শিকার। আসলে মুশকিল হয়েছে কী, এত চরিত্রের ভিড়ে কোনও চরিত্রই তার বেড়ে ওঠার সুযোগ সেভাবে পায়নি। ফলে গোটা পুজোজুড়ে একবারও কথা বা সাক্ষাৎ না করে হঠাৎ উমার সামনে মহীতোষের ভেঙে পড়া ভীষণ বেমানান লেগেছে। বেশ কিছু সুন্দর মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল ব্রহ্মানন্দ-মহীতোষ-হিমাদ্রি এবং গোবিন্দর মধ্যে। কিন্তু সেগুলো সেভাবে ফুটেই উঠল না। ফলে কিছু হালকা চমক ছাড়া ‘উমা ফ্ল্যাট হয়েই থেকে গেল! তবে আলাদা করে সারা সেনগুপ্তর কথা বলতেই হবে। প্রথম ছবিতেই তিনি বেশ সাবলীল এবং তাঁর চোখ আলাদা করে প্রশংসার দাবি রাখে হিমাদ্রির ভূমিকায় যিশুও ভাল, কিন্তু তাঁর চরিত্রটি খানিকটা অতি অভিনয়ের দোষে দুষ্ট। এই ছবিতে ভাল লাগার জায়গা তৈরি করেছেন সঙ্গীত পরিচালক অনুপম রায়। প্রতিটি গান বড্ড মন ছুঁয়ে যায়। ‘জাগো উমা’ হোক বা ‘আলস্য’ আপনাকে মায়ায় আবদ্ধ করবে। কিন্তু পরিচালক যে ভুলটা করেছেন, সেটা অবহেলা করা যায় কি। আসলে উমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠাটাই করতে পারলেন না পুরোহিতমশাই।

বিশেষ দ্রষ্টব্য! ২০১০ সালে ‘নভেম্বর ক্রিসমাস’ নামে একটি ছবি তৈরি হয়েছিল। সেই ছবির বিষয়টাও অনেকটা এরকমই। কিন্তু শুধু ইভানের কথাই বলেছেন পরিচালকমশাই। একবারও সেই ছবিটির কথা কোথাও উল্লেখ করেননি। আসলে সিনেমা থেকে সিনেমা তৈরির চেয়ে সত্য ঘটনা থেকে সিনেমা তৈরির ঘটনাটা বোধ হয় একটু বেশি শ্লাঘার জন্ম দেয়…তাই নয় কি?

এখন আপনার রিভিউ প্রকাশিত হতে পারে আনন্দলোক-এ। সিনেমা দেখে
চটপট লিখে ফেলুন রিভিউ আর ইমেল করুন

[email protected]