magazine_cover_12_september_18.jpg

Anandalok Review

পুরনো গল্প আর কতদিন…

টুসকি

tuski-still

পরিচালনা: অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

অভিনয়ে: খরাজ মুখোপাধ্যায়, কাঞ্চনা মৈত্র, অনামিকা সাহা, রাণা মিত্র, প্রিয়ঙ্কা দত্ত, মৌমি বসু

টাকা আছে, তাই আপনি ভাল খেতে পারবেন, ভাল পরতে পারবেন, আপনার ছেলে বা মেয়ে ভাল স্কুলে পড়তে পারবে, সুন্দর, আরামদায়ক একটা জীবনও কাটাতে পারবেন… এ তো এক্কেবারে হক কথা। আর যদি টাকা না থাকে? আপনি যদি নিম্ম মধ্যবিত্তের একটু নিচে হন? নাহ, তা হলে উপরের যেগুলোর কথা বললাম, সেগুলোর একটাও পাবেন না, এ তো একেবারে সোজা হিসেব। যুগ-যুগান্তর ধরে ঠিক এইরকমটাই হয়ে আসছে। ‘টুসকি’র মোড়কে পরিচালক অনিকেত চট্টোপাধ্যায় এরকমই একটা গল্প শোনাতে চান আমাদের। টুসকি (প্রিয়ঙ্কা দত্ত) একটা ছোট্ট মেয়ে, বস্তিতে থাকে। তার মা (‘টুসকি’ নিজের মা মারা যাওয়ায় মাসির কাছে প্রতিপালিত) রণিতা (কাঞ্চনা মৈত্র) কাজ করে এক ধনী বাড়িতে। সে বাড়ির মেয়ে টুয়া (মৌমি বসু)। টুসকি আর টুয়া সমবয়সী, কাকতালীয়ভাবে তাদের জন্ম একইদিনে, ১৫ অগস্ট। টুসকির সঙ্গে টুয়ার মেলামেশা না-পসন্দ টুয়ার মায়ের। কারণ তাদের ‘শিক্ষা’ (মানে ইংরেজি স্কুলে পড়ে না, আর কী) নেই, তাদের মুখে অশ্লীল ভাষা। আর পাঁচটা বড়লোক বাড়ির আদুরে মেয়েরা যেমন হয়, সেরকমই টুয়াকে আতুপুতু করে রাখেন মা, মেয়ের পড়াশোনা, মেয়ে কোন স্কুলে ভর্তি হবে, এই নিয়ে মায়ের চিন্তার শেষ নেই! নামী স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করার জন্য ‌এই উন্নাসিক ‘ভদ্র’মহিলা ঘুরপথে ‘সাহায্য’ (কেমন সে সাহায্য সে না হয় আপনারা নিজে গিয়েই দেখে নেবেন) নিতে ছাড়েন না কাউন্সিলরেরও (রাণা মিত্র)। অন্যদিকে টুসকি মেধাবী, সে ভাল স্কুলে পড়তে চায়। রণিতা ঠিক করে টুসকিকে সে টুয়ার স্কুলে ভর্তি করবে। বস্তির মেয়ে কেন পড়বে ‘ভদ্রলোক’-দের স্কুলে? বেঁকে বসেন টুয়ার মা। আমদানি হয় ভিলেনেরও। শুরু হয় লড়াই।

সহজ, সাদামাটা একটা প্লট। নতুনত্বও নেই। কিন্তু অনিকেতের এই সিনেমাটা যেন তার চেয়েও বেশি সরল, বা বলা ভাল বড্ড সাধারণ। গল্পটা যে কী, সেটার পুরো আঁচ পাওয়া গিয়েছিল ট্রেলারেই। তাই সিনেমায় আলাদা করে কোনও চমকও থাকে না। বরং হলে ঢোকার আগেই জানা হয়ে যায় শেষপর্যন্ত কী হবে! সিনেমার মাধ্যমে সমাজকে বার্তা দেওয়া ভাল, কিন্তু শুধুমাত্র একটা সামাজিক বার্তা (যেটা কিনা খুব পুরনো একটা কথা) দেওয়ার জন্যই কি পরিচালক এত আয়োজন ফেঁদে বসলেন? একটি মেয়ের পড়ার জন্য সব্বাই মিলে চাঁদা তুলে টাকা জোগাড় করে, এরকম রূপকথার মতো বস্তিই বা কোথায় হয়? আর যেখানে পড়াশোনার জন্যই সবাইকে দিতে হয় দশ টাকা করে চাঁদা! লোকের খাবার জোটে না ঠিক করে, সেখানে মিশনারিদের আসার খবরে কী করে যে তারা বস্তিটাকে রং-টং করে, সাজিয়ে ঝাঁ চকচকে করে ফেলতে পারে রাতারাতি, সে নিয়ে বেশ খানিক খটকা লাগে বৈকি! কথায়-কথায় লোকজন (পড়ুন কাউন্সিলর আর তার সাগরেদরা) একটি বিশেষ পত্রিকাকে গালিই বা দেয় কেন বোঝা গেল না, ঠিক যেমন বোঝা গেল না শেষে একজন মাওবাদী সন্দেহভাজনকে (চে গেভারা পড়লেই কি মাওবাদী হয়ে যেতে হয়?) প্লটে ঢুকিয়ে ঠিক কী খিচুড়িটা পাকাতে চাইলেন পরিচালকমশাই! অভিনেতারা সকলের অভিনয়ে খানিক চড়া, অতিরিক্ত মেলোড্রামায় ঘনঘন তাল কাটে। তবে খরাজ মুখোপাধ্যায়ের কথা খানিক বলতে হয়, কারণ এই সিনেমায় কমিক চরিত্রের বাইরেও তাঁকে পাওয়া গেল অন্যরকম চরিত্রে। নবাগত শিশুশিল্পী প্রিয়ঙ্কা, মৌমি ঠিকঠাক। সিনেমার একটি গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, ‘হাওয়া লাগে গানের পালে’ লোপামুদ্রার গাওয়া। আর হ্যাঁ, এই সিনেমা তৈরি হয়েছিল ২০১৪ সালে, তাই উঁকি মারে পুরনো হাজার টাকার নোট। তবে মাত্র কয়েকটা গালাগালির জন্য (পরিচালকের ভাষায়, বস্তিবাসীরা তো আর শান্তিনিকেতনের ভাষায় কথা বলবে না!) ‘এ’ তকমা পাওয়া সত্যিই মানা যায় না। অনিকেতের আক্ষেপ যথার্থ, যাদের জন্য এ সিনেমা, তারা তো দেখতেই পাবে না। কিন্তু বাচ্চারা কি দেখতে পেলে আনন্দ পেত?