magazine_cover_12_october_18.jpg

Anandalok Review

ভাবনার রসদ জোগায়

পিউপা

pupa-still

পরিচালনা: ইন্দ্রাশিস আচার্য

অভিনয়ে: রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, প্রদীপ মুখোপাধ্যায়

‘পিউপা’… কথাটা শুনলেই মনে পড়ে ছোটবেলায় জীবনবিজ্ঞান বইতে পড়া প্রজাপতির জীবনচক্রের কথা। প্রজাপতির মতো বেশ কিছু পতঙ্গের অপরিণত অবস্থা থেকে পরিণতি পাওয়ার মধ্যবর্তী এক স্থবির অবস্থা হল পিউপা। সিনেমাতেও মানব জীবনের এইরকম এক স্থবির অবস্থার কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য। মানুষের জীবনে কখনও-কখনও এমন পরিস্থিতি আসে, যখন চলতে-চলতে হঠাৎ থমকে যায় জীবন। বর্তমান-ভবিষ্যৎ, পরিবার-কেরিয়ার কিংবা হৃদয়-মস্তিষ্কের মতো নানা দ্বন্দ্বের মাঝে মানুষকে দিতে হতে কঠিন পরীক্ষা—অপরিণত থেকে পরিণত হওয়ার পরীক্ষা।

মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে বিদেশ থেকে বাড়ি ফেরে শুভ্র (রাহুল)। কিছুদিন কাটিয়ে যখন বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রায় তৈরি শুভ্র, তখনই সেরিব্রাল অ্যাটাকে আক্রান্ত হন শুভ্রর বাবা সজল (প্রদীপ)। হাসপাতাল থেকে তিনি ফেরেন জীবন্মৃত হয়ে। কঠিন সমস্যায় পড়ে শুভ্র। তার কাকা রজত (কমলেশ্বর) বার্কলে থেকে অবসর নেওয়ার পর হিউম্যান সাইকোলজি নিয়ে গবেষণা করেন, মাঝে-মাঝেই তাঁকে বিদেশে যেতে হয় সেমিনারে আর তাঁর অনেকটা সময়ই কাটে হিমালয়ের কোলে ঘুরে-ঘুরে। শুভ্রর দিদি মউ (সুদীপ্তা) শ্বশুরবাড়ি-বাপের বাড়ির কর্তব্যের টানাপোড়েনে ব্যতিব্যস্ত। ইচ্ছে থাকলেও শয্যাশায়ী বাবাকে পুরোপুরি সময় দেওয়ার উপায় নেই তাঁর। এমতাবস্থায়, শুভ্রই ক্রমাগত নিজের ছুটি বাড়িয়ে বাবার পাশে থাকে। কেটে যায় একমাসের উপর। শুভ্রর অফিস থেকে খবর আসে, অবিলম্বে কাজে যোগ না দিলে চলে যেতে পারে চাকরি। এদিকে শুভ্রর বান্ধবী বর্ষাও আমেরিকায় পিএইচডি করতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। এই পরিস্থিতিতে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন কাকা রজত। তিনি ঘোর বাস্তববাদী। তারপর কাকা-ভাইপোর মধ্যে ঘটে মনস্তাত্বিক সংঘাত। মায়ার টানে আটকে পড়া ভাইপোকে কাকা ক্রমাগত বোঝাতে থাকেন বাস্তব পরিস্থিতিটা, ফিরে যেতে বলেন কাজের জায়গায়। গীতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন সুখ-দুঃখে অবিচল থাকতে। কার্যত কমলেশ্বরের চরিত্রটা এখানে অনেকটা কৃষ্ণের মতো, যিনি দিকভ্রান্ত অর্জুনকে (এখানে রাহুল) দিশা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। মউ ও বর্ষাকেও তিনি বলেন বাস্তববাদী হয়ে সব সমস্যার সমাধন করতে। কিন্তু জাগতিক মায়া কাটানো কি এতই সহজ! ঠিক যেন পিউপার মতোই এক স্থবির অবস্থাতেই আটকে যায় কয়েকটা মানুষ, যেখানে থেকে বেরোতে পারলে মিলবে পরিণত প্রজাপতির মতো রঙিন জীবন, কিন্তু সাহস করে বেরোতে পারছে না কেউই। শেষ পর্যন্ত এই অবস্থায় পরিত্রাতার ভূমিকা পালন করতে হয় কৃষ্ণ থুড়ি রজতকেই। কিন্তু, কী ভাবে? সেটা না হয় পরদার জন্যই তোলা থাক।

মাত্র একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকজন মানুষের জীবনের নানা সমস্যাকে তুলে ধরার চেষ্টাটি প্রশংসনীয়। মূলত একটা বাড়িকে কেন্দ্র করে পুরো ঘটনাটা নির্মিত হলেও কোথাও কিন্তু একঘেয়ে মনে হয়নি। তবে কিছু দৃশ্য যেন একটু অকারণ দীর্ঘায়িত। অভিনয়ের দিক থেকে বিশেষ কিছু বলার নেই, তবে বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন সুদীপ্তা এবং কমলেশ্বর। রাহুলের ইংরেজি আর একটু সাবলীল শোনালে ভাল হত। বিভিন্ন খুঁটিনাটির প্রতি পরিচালকের যত্নের ছাপ স্পষ্ট। আবহের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট মুনসিয়ানার ছাপ পাওয়া যায়। কাকা-ভাইপোর মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে বেটোফেনের সিম্ফনি। ছবির শেষটা নিয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে, তবে এই মতবিরোধটাকে এই সিনেমার ইউএসপি বলা যেতে পারে। কারণ শেষে কিন্তু সিনেমাটা নিঃসন্দেহে দর্শককে একটা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়!