magazine_cover_12_july_18.jpg

Anandalok Review

রূপকথা নয়

মুক্কাবাজ়
Mukkabaaz-still

অভিনয়: বিনীতকুমার সিংহ, জ়োয়া হুসেন, জিমি শেরগিল, রবিকিষন
পরিচালনা: অনুরাগ কাশ্যপ
……

স্ট্যালন-সলমন-দেব-দের দুনিয়ায় মাঝে-মাঝে বিনীতকুমার সিংহরা চমকে দেন। সৌজন্যে, অনুরাগ কাশ্যপ। ‘মুক্কাবাজ়’ ছবিটিতে সাধারণ স্পোর্টসমুভির প্রেডিকটেবিলিটি নেই, নেই ‘এ তো জিতবেই’ জাতীয় রূপকথা। আসলে ঠিক স্পোর্টসমুভি তো নয় এ ছবি। ছবির প্রধান চরিত্র ‘মুক্কেবাজ়’ বা বক্সার নয়, ‘মুক্কাবাজ়’ বা যোদ্ধা। রিংয়ের লড়াই সে হেরে যেতে বাধ্য হয়। জিতে যায় ব্যক্তিগত যুদ্ধে। একটু কাহিনিতে আসি। ছবির শুরুতেই কাশ্যপ এনে ফেলেছেন গোমাংস, লিঞ্চিং ইত্যাদির ঘটনাগুলি। ‘ভারতমাতা কী জয়’ আওড়ানো সেই গুন্ডাদের পাণ্ডা, ভগবানদাস মিশ্র (জিমি শেরগিল) ঘোর ব্রাহ্মণ, ঘোর বাহুবলী! সে-ই আবার উত্তরপ্রদেশ বক্সিং ফেডারেশনের হর্তা-কর্তা-বিধাতা, বরেলি জেলার তো বটেই। তারই ছাত্র শ্রমণ সিংহ (নামটি লক্ষ করুন) গুরুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। সে একে ছোট জাত, তার উপর বিদ্রোহ, তার উপর সে গুরুর ভাইঝি সুনয়নার (জ়োয়া হুসেন) প্রেমে পাগল। সুনয়না আবার মূক। বুঝতেই পারছেন, সম্পূর্ণ ঘেঁটে ঘ হয়ে গিয়েছে ব্যাপারটা। শ্রমণ অসাধারণ বক্সার, কিন্তু তাকে জেলা-লেভেলেও নামতে দেয় না ভগবানদাস। সেখান থেকে অনুশীলন কঠোর করা, নতুন কোচ খোঁজা, অন্য জেলায় যাওয়া… শ্রমণের স্ট্রাগলটা খুব বাস্তব। সে একেবারেই টিপিক্যাল স্পোর্টসফিল্ম স্টাইলে ‘এলাম-দেখলাম-জয় করলাম’ কায়দায় এগোয়নি। অতঃপর বিয়ে, মধ্যান্তর… এবং সিনেমার ক্রূরতম রূপ। জাত-ধর্ম-জেন্ডার-রাজনীতি-স্পোর্টস নিয়ে অসাধারণ একটি খেলা খেলেছেন অনুরাগ। অনুরাগের ছবির প্রচণ্ড অন্ধকার চেহারা এ ছবির নেই। কিন্তু বাস্তবতার দিকটি খুব স্পষ্ট। নজর কেড়ে নিয়েছে এ ছবির সাবটেক্সট, অর্থাৎ বক্সিং। হ্যাঁ, বক্সিং এই ছবির সাবটেক্সটটি। কারণ চাকরি, সমাজ, জাত-পাত, প্রেম নিয়ে প্রধান চরিত্রর যে ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি তিনি তুলেছেন, তা বক্সিংয়ের চেয়ে অনেক বড়। বক্সার হিসেবে বিনীতকুমার সিংহ অনবদ্য। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে অনুশীলনের ছাপ স্পষ্ট। রিংয়ে সত্যিকারের বক্সাররা লড়েছেন এবং বিনীতকে তাঁদের মধ্যে একটুও বেমানান লাগেনি। তিনি যখন ঝড়ের গতিতে ঘুসিগুলি ঝেড়েছেন, তখন অসম্ভব লাগেনি মোটেই। তাঁর পেশিবহুল চেহারায় যাচ্ছিই না। তিনি যে কষ্ট, যে পরিশ্রমটি করেছেন, তা অনবদ্য। স্ত্রী হারানোর যন্ত্রনা, রাগ, হতাশা, সেই রাগকে রিংয়ে আনা, অসহায়তা… সবেতেই বিনীত জ্বলে উঠেছেন। তিনি মহাতারকা নন, হবেনও না। তাঁর শক্তি সত্যিকারের মেথড অ্যাকটিং। প্রতিটি ফ্রেমে তিনি নড়িয়ে দিয়েছেন। তার চেয়েও বেশি করে মন জয় করে নিয়েছেন নবাগতা জ়োয়া। মূক অথচ মানসিকভাবে প্রচণ্ড শক্তিশালী সুনয়নার চরিত্রে ছোট-ছোট অনুভূতিগুলি তিনি অসাধারণ সাবলীলতায় ধরেছেন। জিমি শেরগিল ভিলেন হিসেবে ভাল (যদিও তাঁর অসুস্থ চোখটি দেখতে কেমন একটা লাগে), তার চেয়েও ভাল রবিকিষন। তবে এ ছবিতে অভিনয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী, ছোট চরিত্রগুলি। প্রত্যেকের কাজ ফুল ফুটিয়েছে। ছবিটি একটু লম্বা, কিছু ক্ষেত্রে একটু অকারণে লঘু এবং মোলাড্রামাটিক। তবু, অনুরাগ যেভাবে কাহিনিটি এগিয়েছেন, যেভাবে ওয়ান-লাইনার সাজিয়েছেন, যেভাবে অনায়াসে এসেছে থ্রিল… তা সিট থেকে নড়তে দেয় না। তাঁকে অনেকটা সাহায্য করেছে একটি অসাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। শ্রবণের মুখে ভগবানের প্রতি ‘বহুত হুয়া সম্মান’ ভেঙেছে বিস্তর ইনস্টিটিউট। তার জন্য অনুরাগকে ধন্যবাদ। সমবেদনা না জাগিয়ে তিনি যে একটি মূক মেয়েকে দেখাতে পেরেছেন, হয়তো নারীদের মুখ হিসেবেই, তার জন্য তাঁকে সম্মান। স্পোর্টস মুভি হেরে যায় এই বক্সারের জীবনের সঙ্গে যুদ্ধে। মানুষ শ্রবণ অনেক বেশি করে ছুঁয়ে যায় মন। তার জয় হোক।

এখন আপনার রিভিউ প্রকাশিত হতে পারে আনন্দলোক-এ। সিনেমা দেখে
চটপট লিখে ফেলুন রিভিউ আর ইমেল করুন

[email protected]