magazine_cover_12_mayl_19.jpg

Anandalok Review

সম্পর্কের এক অনবদ্য উপাখ্যান

জ্যেষ্ঠপুত্র

পরিচালনা: কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়
অভিনয়: প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋত্বিক চক্রবর্তী, সুদীপ্তা চক্রবর্তী

নায়ক-নায়িকাদের খ্যাতির বিড়ম্বনা বোধ হয় এটাই। চেষ্টা করলেও ‘নায়ক’ সত্তাটিকে টেনে হিঁচড়ে মাটিতে নামানো যায় না। প্রিয়জনের মৃত্যুর আবহেও জায়গা দিতে হয় সেলফি এবং সই শিকারিদের। কষ্ট বুকে চেপে পরতে হয় সানগ্লাস… কিন্তু কী অবস্থা হয় বাড়িতে থাকা অসাধারণ সেই নায়কের সাধারণ ভাই, বোন, ভ্রাতৃবধূর? তারা কি পারে জীবনের চেয়ে বড় ইমেজটাকে এই কষ্টের আবহেও মেনে নিতে? বলে রাখা ভাল, যত সহজে এই সমালোচনার শুরুর লাইনগুলো লেখা হল, কৌশিকের এই ছবির মনস্তত্ব ততটা সরলরৈখিক নয়। বরং এক অতি সরল গল্পের মাধ্যমে তিনি আমাদের দুই ভাইয়ের মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে ফেলেছেন। যেখানে ছবি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও চরিত্রগুলির মনস্তত্বের তল পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়… আর এখানেই ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’-এর সাফল্য।
সকলেই জেনে গিয়েছেন যে, ছবির মূল ভাবনা ঋতুপর্ণ ঘোষের। সেই ভাবনাকে নিজের মতো বিন্যাস করে চিত্রনাট্য লিখেছেন কৌশিক। বলতে বাধা নেই, সেই ভাবনা বা বলা ভাল বিন্যাস প্রথম দৃশ্য থেকে মন ছুঁয়ে যায়। ছবির গল্প বিস্তারিতভাবে বলার কিছু নেই। পিতৃবিয়োগের খবর পেয়ে পৈতৃক গ্রামে আসেন সুপারস্টার ইন্দ্রজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। বা়ড়িতে তাঁর ভাই পার্থ, ভ্রাতৃবধূ রাই, ভৃত্য মকাই, পারুল এবং মানসিক ভারসাম্যহীন বোন ইরা। প্রিয় সুপারস্টারকে দেখে গ্রামের লোকের উৎসাহ যেন অঘোষিত উৎসবের আকার নেয়। আর সেটাই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় পার্থর। সেটা কি শুধু দাদার স্টারডমকে ঈর্ষা? নাকি অন্য কোনও কারণ? উত্তরটা না হয় হলে গিয়েই নেবেন। তবে যে কথাটা বলার, তা হল, এই ছবির পরতে-পরতে ঋতুপর্ণকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন কৌশিক। কিছু দৃশ্য, কিছু মুহূর্ত ভীষণভাবে ঋতুপর্ণর স্টাইল মনে করায়। এক্ষেত্রে বলতেই হয়, বাবার মৃতদেহ দেখার পর মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ের রিঅ্যাকশনের জায়গাটার কথা। তা বলে কৌশিক কিন্তু স্বকীয়তা একেবারেই বর্জন করেননি। চিত্রনাট্যে, সংলাপে তাঁর পরিচিত ছাপ রেখেছেন বেশ ভাল মতোই। অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তৈরি করা স্ক্রিপ্ট প্রতিটি চরিত্রকেই বাড়তে দিয়েছে নিজের মতো করে। মুহূর্ত তৈরি করেছে সাবলীলভাবে। তাই যেখন ইন্দ্রজিৎ বাবার স্মরণসভায় গিয়ে ডামাডোলের মধ্যে ফেলে পরিবারকে, স্টারডমের অসহায়ত্বে চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু পরক্ষণেই বজায় রাখে স্টারডম, মনে হয়, এই তো… একেই তো বলে খ্যাতির বিড়ম্বনা!
কৌশিক দুটো সমান্তরাল জীবনকে খুব মুন্সীয়ানার সঙ্গে এঁকেছেন। নায়কের চোখে জল না এনে, দিয়েছেন মাস্টারস্ট্রোক (হয়তো তার মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে চেয়েছেন দর্শকের মনে)। তবে কৌশিকের এই স্ক্রিপ্ট এবং পরিচালনার যথাযোগ্য সম্মান রেখেছেন তাঁর অভিনেতারা। ইন্দ্রজিতের চরিত্রে প্রসেনজিৎ তো একেবারে একাত্ম হয়ে গিয়েছেন। নিজে স্টার বলেই একজন স্টারের ইগো, অস্থিরতা, দাদা হিসেবে স্নেহ, দায়িত্ব… প্রতিটি সূক্ষ্ম-সূক্ষ্ম আবেগ তাঁর চোখে মুখে ধরা দিয়েছে অনবদ্যভাবে। ভাল লেগেছে গার্গীকে। স্মরণসভায় গানের দৃশ্যটি সুন্দর। সুদীপ্তা চক্রবর্তী অভিনীত ‘ইরা’ ‘পারমিতার একদিন’ ছবির ‘খুকু’কে মনে করিয়েছে। কিন্তু মনে দাগ রেখেছে। বিশেষ করে দাদার সামনে নাচের দৃশ্যটি তো অনেকদিন চোখে ভাসবে। তবে যাঁর কথা বিশেষ ভাবে না বললেই নয়, তিনি ঋত্বিক চক্রবর্তী। ‘পার্থ’ হিসেবে ঋত্বিককে অনন্য বললেও কম বলা হয়। ছবিতে পার্থ দাদা ইন্দ্রজিতের চেয়ে বেশি ভাল অভিনেতা। সেটার প্রতি সম্মান রেখে যেন প্রসেনজিতের কাঁধে-কাঁধ রেখে (মাঝে মাঝে টক্কর দিয়েও) অভিনয় করে গেলেন ঋত্বিক! শুধু অভিনয় নয়, ক্যামেরা, সঙ্গীত, সব বিভাগের কথা আলাদা করে বলতে হয় যেগুলি ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’কে অন্য এক মাত্রা দিয়েছে।
ফলে ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ সবদিক থেকেই দাগ রেখে গেল মনে। শুধু মনে হল, ইন্দ্রজিতের বাড়ি ছাড়ার কারণ এবং ক্লাইম্যাক্সে তাঁর মানসিক স্থিতিটা আর একটু পরিষ্কার হলে ভাল হত। কারণ তাঁর যে চরিত্র দেখানো হয়েছে, সেখানে শ্রাদ্ধচিঠিতে শুকনো ‘এন ও সি’ দিয়ে দায় ঝাড়াটা যেন ছবি শেষ করার জন্যই মনে হল। ছোট গল্পের মতো এই শেষ যেন মনে খানিকটা হলেও অতৃপ্তির সৃষ্টি করে। শেষ হয়েও হইল না শেষ-এর কথা মনে হয়। একটু টুইস্ট থাকলে…অবশ্য কৌশিক তো নিজের প্রায় সব ছবিকে এভাবেই ট্রিট করেছেন।

এখন আপনার রিভিউ প্রকাশিত হতে পারে আনন্দলোক-এ। সিনেমা দেখে
চটপট লিখে ফেলুন রিভিউ আর ইমেল করুন

[email protected]