magazine_cover_12_september_18.jpg

Anandalok Review

ছুটি-ছুটি গন্ধ

গুপ্তধনের সন্ধানে
Guptodhoner-Sondhane-still

পরিচালক: ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়
অভিনয়: আবির চট্টোপাধ্যায়, অর্জুন চক্রবর্তী, ঈশা সাহা, রজতাভ দত্ত

ছবির ‘উৎসর্গ’ই বলুন বা ‘অনুপ্রেরণা’… হেমেন্দ্রকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়-দের নাম দিয়ে শুরু করেছেন পরিচালক। ওখান থেকেই সুর ধরা হয়ে যায় ছবির। কারণ এই ছবির সুর ফেলে আসা বাঙালি শৈশবের। ট্রেজার হান্ট, ধাঁধা, খাওয়া-দাওয়ায় ছুটির দুপুরে বই মুখে কাটানো ছোটবেলার গন্ধ খুব পরিষ্কার। ওই নস্ট্যালজিয়াই ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’র মূল শক্তি। গৌতম ঘোষের ন্যারেশন এবং আর্টওয়র্কে ছবির টাইটেল কার্ডটি চমৎকার হয়েছে। শিল্পীকে ধন্যবাদ, তিনি নড়ে-চড়ে বসতে বাধ্য করেন। প্রথম দৃশ্যে গৌতম ঘোষ স্ক্রিপ্টকে টানটান করে দেন।

এরপর শুরু হয় মূল গল্প। ট্রেলরের কল্যাণে সবটাই জানা, তবু বলি। অক্সফোর্ডের ইতিহাসের প্রফেসর সুবর্ণ সেন (আবির) দেশে ফিরেছে। ভাইপো আবিরের (অর্জুন) মামাবাড়িটি ঐতিহাসিক। ইতিহাস আর খাওয়া-দাওয়ার টানে সেখানে গিয়ে ওঠে সুবর্ণ, ওরফে সোনাদা আর আবির। তারপর ঝিনুককে (ঈশা) সঙ্গী করে শুরু করে গুপ্তধনের খোঁজ। ওবাড়িতেই লুকিয়ে আছে শাহ শুজার গুপ্তধন। আর ধাঁধায় তার সূত্র লিখে গিয়েছেন আবিরের মামা হরিনারায়ণ সিংহরায় (গৌতম)। কিন্তু ট্রেজার হান্ট সহজ নয়, কারণ ভিলেন উপস্থিত! দশানন দাঁয়ের (রজতাভ) চোখ সিংহরায়দের বাড়ির উপর। গুপ্তধনের উপরও বটে। বাকিটা আর বলছি না। ধাঁধার টানে, হালকা মাথা ঘামিয়ে খুলতে থাকে একের পর এক পরত। স্মার্ট মেকিংয়ে ব্যাপারটি বেশ মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে। দিব্যি একটা ‘ফেলুদা-ফেলুদা’ বা ‘জয়ন্ত-মানিক’ গোছের ফিল আছে ছবিটায়। বেশ হালকা চালে এগিয়েছে ছবি, তাতে ইতিহাসের ভার বিশেষ নেই। ধাঁধাগুলিও বিশেষত ছোটদের পছন্দ হওয়ারই কথা। সেগুলির সংখ্যা কম এবং বেশ সহজ। ইন্টারেস্টিংও বটে। আর লাজ়ারাসের টেবিলে অমন সব খাবারের সমাহার… জিভে জল আনেই।

কিন্তু সমালোচকের সমস্যা এই যে, তিনি ছবি দেখতে গেলে ছুটির আবহে ভেসে যেতে পারেন না। ফলে, তাঁর মাথায় ঘুরতে থাকে, ছোটবেলা থেকে অন্তত কয়েকবার তো আবির মামাবাড়িতে এসেছে, সে কি বাড়ির কিছুই জানে না? সবই যেন তার কাছে নতুন! মাথায় ঘোরে, দশানন দাঁ যেখানে বাড়ি এবং গুপ্তধন দুই-ই চায়, সেখানে কেন সে গুপ্তধন সন্ধানের মূল কাণ্ডারীদের বাড়ি থেকে তাড়াতে চাইবে? স্ক্রিপ্টের বহুলাংশ এবং সংলাপ বেশ অ্যামেচারিশ এবং একঘেয়ে লেগেছে। সবটাই যেন কেমন সাজানো, স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব। স্মার্টনেসে সেটা কিছুটা হয়তো ঢাকে। কিন্তু কতদূর? হাসির দৃশ্যগুলি মাঝে-মধ্যে ভাঁড়ামিতে পরিবর্তিত হয়। প্রথমার্ধ বেশ ফ্ল্যাট, গল্প সাজিয়ে উঠতেই অনেকটা সময় লেগে গেল। গল্পের প্লট অবশ্য মন্দ নয়। ওই যে বললাম, একটা ফেলুদা-ফ্লেভার! সোনাদার মুখে ‘শাহ সুজ়া’ শুনতে যতটা শ্রুতিকটু, ততটাই আশ্চর্য হতে হয় ক্লাইম্যাক্সে। অখিলেশ (কমলেশ্বর) চরিত্রটি ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও’-এর মতো জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের আভোগের অংশটি পুরোটাই ভুল বলছে! ধাঁধার সূত্র বলে কি ওটা আলাদা? কিন্তু রবি ঠাকুরের শব্দগুলিতে তো অর্থ কিছু পালটাচ্ছে না। প্রশ্ন আছে গর্ভগৃহে সাপের উপস্থিতি, সাইকেল থাকা সত্ত্বেও দৌড় ইত্যাদি নিয়েও। কিন্তু সেসব নিতান্তই ক্ষুদ্র ব্যাপার। তবে একটি বড় প্রশ্ন আছে। ‘সার্চ পার্টি’ শেষ ধাঁধার উদ্ধার করে গর্ভগৃহে এসে পৌঁছচ্ছে। সেখানে সন্ধ্যা না নামলে পরের পদক্ষেপ নেওয়া অসম্ভব হত। হরিনারায়ণ কি জানতেন, ব্যাপারটা সন্ধেবেলাই হবে?

অভিনয়ে আবির-অর্জুন-ঈশা যথাযথ, যদিও একটু যেন হাত-পা বেশি নাড়ছিলেন তাঁরা। সবচেয়ে উজ্জ্বল উপস্থিতি অবশ্যই রজতাভ দত্তর। ভিলেনের ভূমিকায় তিনি অত্যন্ত সাবলীল। ম-ম ছুটি-ছুটি গন্ধ ছবিটিকে উতরে দিল। আসলে লজিক খুঁজতে গেলে তো ফেলুদা বা জয়ন্ত-মানিকও একটু ফ্ল্যাট, তাই না?