magazine_cover_12_may_18_3.jpg

Anandalok Review

প্রেম আছে, গতি নেই

দৃষ্টিকোণ
DRISHTIKONE-big

পরিচালক: কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়
অভিনয়: প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়

আমরা যা দেখি, যা ধারণা করি, সেটাই কি সত্যি? কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর নতুন ছবি ‘দৃষ্টিকোণ’-এ খুব অদ্ভুতভাবে প্রশ্নগুলি তুলেছেন। ছবির নাম দেখে বুঝতেই পারছেন, উপরের প্রশ্নের উত্তরটি ‘দৃষ্টিকোণনির্ভর’ হওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। কিন্তু ব্যাপারটি কীভাবে দেখালেন কৌশিক? ছবির ট্রেলর দেখে এটিকে প্রেমের ছবি বলে মনে হলেও, মনের কোণে ‘থ্রিলার’-এর উপাদান খুঁজে পাওয়ার একটা আগ্রহও তৈরি হয়েছিল। সিনেমা হলে গিয়ে দেখা গেল, সেটা খুব ভুল নয়। ‘থ্রিলার’ এবং ‘লভ’… দু’টি ধারাকেই সমান্তরালভাবে দেখিয়েছেন পরিচালক। আর তাঁর দৃষ্টিকোণে দু’টি এলিমেন্টই মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। ছবির গল্প ছোট বলতে গেলে বলতে হয়, ‘দৃষ্টি’ আই ফাউন্ডেশনের কর্ণধার পলাশ সেন (কৌশিক সেন) গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। প্রিতম সেন (কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়) হয়েছেন পঙ্গু। শ্রীমতী সেন (ঋতুপর্ণা) দু’বছর পর যান উকিল জিয়ন মিত্রের কাছে (প্রসেনজিৎ)। কারণ তাঁর মনে হয় তাঁর স্বামীর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। জিয়নের আবার একটি চোখ নষ্ট, কর্নিয়া শুকিয়ে যাওয়ার ফলে। ডান চোখটিও চলে গিয়েছিল। কিন্তু কর্নিয়া ট্রান্সপ্লান্টেশনের ফলে সেটি ফিরে পেয়েছেন। বলা বাহুল্য, উকিল-মক্কেলের সম্পর্কের একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন কৌশিক। অবশ্যই সেটি প্রেমের। আর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে থ্রিলার এলিমেন্ট। প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণার কেমিস্ট্রি সব সময়ই টাটকা বাতাসের মতো। দিন-দিন সেটি আরও টাটকা হচ্ছে। বলতে বাধা নেই, ‘দৃষ্টিকোণ’-এ তাঁদের সম্পর্ককে একেবারে নতুন একটি আঙ্গিক দেওয়া হয়েছে। মজাটা হল, ছবির শেষের চমকটি। দেখতে খারাপ লাগে না। তবে অনেক আগেই ব্যাপারটির একটি আঁচ পাওয়া যায়। কিন্তু ‘থ্রিলার’ হিসেবে যে ঘটনাটিকে পাশাপাশি তুলে আনলেন কৌশিক, তাতে বেশ গলদ। দু’বছর ধরে প্রিতমকে সঙ্গে নিয়ে আছেন শ্রীমতী সেন। তিনি কি একবারও তাঁকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাননি? তা হলেই তো গোটা জিনিসটা পরিষ্কার হয়ে যেত! এমনকী, শেষে উদ্ঘাটিত হওয়া সত্যটুকুও! কেস রি-ওপেন করার পর জিয়ন মিত্রের কার্যকলাপের একটু আঁচ দিতে পারতেন পরিচালক। পরিবর্তে মনে হল, পুরো সময়টাই জিয়ন মেয়ের বার্থ ডে পার্টি করে, পুরী ঘুরে আর ১৮৯০ টাকার ‘কফি’ খেয়ে কাটিয়ে দিলেন। তবে ছবিটি কৌশিক এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে পুরো ফোকাসটাই প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণার উপর থাকে। জিয়নের স্ত্রী ‘রুমকি’ হিসেবে চূর্ণী এখানে তৃতীয় কোণে আছেন। তাঁর দৃষ্টিকোণটিও ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে। কিন্তু ফোকাস যে সরে অনেকটা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের উপর চলে এল! না, পরিচালক হিসেবে নয়, অভিনেতা হিসেবে। ‘প্রিতম’-এর চরিত্রে কৌশিকের অভিনয় দেখলে আফসোস হয়, ইসস্, ভদ্রলোক কেন জাতীয় স্তরে অভিনয় করেন না। এখন তো মনে হয় হুইলচেয়ারের চরিত্রে অভিনয় করলেও কৌশিক ফাটিয়ে দিতেন। কী আবেগ, কী ভয়, কী দৃঢ়তা… কৌশিক, আপনাকে কুর্নিশ। প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা তো ভালই অভিনয় করেছেন। কিন্তু প্রাণভোমরা পরিচালক-অভিনেতাই। আর একটি সম্পদের কথা বলতে হয়, অনুপম রায়। তাঁর তৈরি করা গানগুলি ছবির প্রতিটি ফ্রেমের পরতে-পরতে মিশে গিয়ে অনন্য এক মাত্রা দিয়েছে। শুধু কৌশিক চাইলে, ছবিটি বেশ খানিকটা ছোট করতে পারতেন। কিছু প্রেমের গল্প হয়, যা আস্তে-আস্তে মননে জায়গা করে নেয়। গ্রাস করে মনকে। কিন্তু ‘দৃষ্টিকোণ’-এর প্রেম অনেক বেশি উদ্দাম। তার গতির দরকার ছিল। তাই ‘দৃষ্টিকোণ’-এ প্রেম শেষপর্যন্ত থ্রিলারকে ছাপিয়ে গেলেও, খানিকটা গতিহীনতার দোষে দুষ্ট হয়ে থেকে যায়।