magazine_cover_12_october_17.jpg

Anandalok Review

৫০ বছরের প্রবহমানতাকে ছুঁয়ে দেখা

ডবল ফেলুদা
FELUDA-still
পরিচালক: সন্দীপ রায়
অভিনয়: সব্যসাচী চক্রবর্তী, সাহেব ভট্টাচার্য, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়

কয়েক বছর ধরে বাঙালির বড়দিনে হাজির হচ্ছে ফেলুদা। তবে প্রতি বছর নয়। মাঝে-মাঝে বাদ পড়েছে। তবে শীত এলেই বড়দিনের কেকের মাঝে মন উসখুস করে ফেলুদার ছবির জন্য। এবছর যেহেতু ফেলুদা প্রকাশের ৫০ বছর, তাই এবারের ফেলুদা নিয়ে বাড়তি উত্তেজনা ছিল। সেই জন্য ‘ডবল ফেলুদা’। দুটো ফেলুদা কাহিনি নিয়ে ‘ডবল ফেলুদা’ তৈরি করেছেন সন্দীপ রায়। প্রথমার্ধে ‘সমাদ্দারের চাবি’, দ্বিতীয়ার্ধে ‘গোলকধাম রহস্য’। তিন-চারটে ছোট গল্প নিয়ে সন্দীপ এই ধরনের ছবি আগেও করেছেন। ফেলুদার বেলায় এই প্রথম। তবে ছবির অভিনবত্ব এখানেই শেষ হয়নি। ‘ডবল ফেলুদা’য় আবার ফেলুদার ভূমিকায় ফিরে এসেছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। তোপসের চরিত্রে সাহেব ভট্টাচার্য। কাহিনিতে যেহেতু জটায়ু নেই, তাই বিভু ভট্টাচার্যের কোনও উত্তরসূরিকে দেখা গেল না। এছাড়া ফেলুদার অর্ধশতাব্দী পূর্তি নিয়েও রয়েছে নানা আয়োজন।
ছবিটি তৈরির সময় সন্দীপ কথা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, গল্পদুটো সত্যজিতের বড় প্রিয় ছিল। কেন, তা বোঝার জন্য ফেলু মিত্তিরের প্রয়োজন হয় না। এত কম পরিসরে এমন ধারালো রহস্য গল্প খুব কমই লেখা হয়েছে। শারদীয়া সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম কাহিনি ‘সমাদ্দারের চাবি’ই যেমন। বাদ্যযন্ত্র সংগ্রাহক রাধারমণ সমাদ্দার নিজের বামুনগাছির বাড়িতে আচমকা হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়ার সময়ে শুধু বলতে পেরেছিলেন, ‘আমার…নামে…চাবি…চাবি…’। আর এইটুকু সূত্র নিয়েই রাধারমণের ভাইপো মণিমোহন এক দুপুরে হাজির ফেলুদার বাড়িতে। মণিমোহনের অনুমান, তার কৃপণ কাকা ওই কথায় নিজের ‘বিস্তর টাকা’ কোথায় রেখেছেন, তার হদিশ দিয়ে গিয়েছেন। অতএব ওইটুকু সূত্রের ভরসায় ফেলুদা তদন্ত করতে লাগল। তারপর কীভাবে সেই রহস্যের সমাধান হল, তা আপামর বাঙালি জানেন।
‘সমাদ্দারের চাবি’তে মণিমোহনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ব্রাত্য বসু। প্রতিবেশী অবনী সেনের ভূমিকায় শুভ্রজিৎ দত্ত। আর সুরজিৎ দাশগুপ্ত এবং ধরণীধর সমাদ্দারের চরিত্রে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। প্রত্যেকেই ভাল অভিনয় করেছেন বিশেষ ভাবে বলতে হয় ব্রাত্য বসুর কথা। কথা, চোখের অভিব্যক্তি, হাসির ফাঁকে তিনি মণিমোহনের লুকনো অভিসন্ধি ভালই ফুটিয়ে তুলেছেন। তুলনায় সুরজিতের চরিত্রে শাশ্বতকে কিছুটা কৃত্রিম মনে হয়। পরিচালক গোড়া থেকে অদ্ভুত গতি এনেছেন কাহিনির চলনে। পাশাপাশি ছিল ভাল অভিনয় এবং সুরের বিভিন্ন খুঁটিনাটি এক বিশেষ টেকনিকের মাধ্যমে তুলে ধরা।

‘গোলকধাম রহস্য’ একেবারে অন্যধরনের কাহিনি। ‘সমাদ্দারের চাবি’র কয়েক বছর বাদে এই ফেলুকাহিনি সন্দেশ পত্রিকাতেই লিখেছেন সত্যজিৎ। প্রথম কাহিনিটি যদি হয় মগজাস্ত্র দিয়ে ধাঁধার সমাধান তবে ‘গোলকধাম রহস্য’-তে মনস্তাত্বিক জটিলতা বড় জায়গা করে নিয়েছে। এই কাহিনির পটভূমি গোলকধাম নামে একটি বাড়ি। সেই বাড়িতে এক রাতে চোর আসায় ফেলুদার কাছে এলেন সুবীর দত্ত, ওই বাড়ির ছোট ছেলে। চোর ধরার তদন্ত করতেই ওই বাড়িতে গেল ফেলুদা। পরিচয় হল সুবীরের দাদা দৃষ্টিহীন নীহার দত্তর সঙ্গে। এককালে আমেরিকার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এক দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারান নীহারবাবু। ফেলুদা ওই বাড়িতে পা দিয়েই দেখতে পেল চুরি গিয়েছে নীহারবাবুর অসমাপ্ত গবেষণার মূল্যবান কাগজপত্র। পরদিন খবর আসে ওই বাড়ির নীচের তলায় ভাড়াটে মিঃ দস্তুর খুন হয়েছে। রহস্য এবার আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে।

‘গোরস্থানে সাবধান’-এর পর ফেলুদার এই ছবিতে আবার দেখা গেল ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়কে। নীহার দত্তর জীবনের হতাশা, দ্বন্দ্ব, টানাপোড়েন চমৎকার বের করে এনেছেন তিনি। এছাড়া ছোট ছোট চরিত্রে সুন্দর অভিনয় করেছেন রাজেশ শর্মা, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, জ্যাক, ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। সিধু জ্যাঠার ভূমিকায় পাওয়া গেল পরান বন্দ্যোপাধ্যায়কে।

সব্যসাচী চক্রবর্তীর চেহারায় বয়সের ছাপ থাকলেও হাঁটাচলা, চোখের চাহনি, কণ্ঠস্বরের প্রয়োগ দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন এখনও ফেলুদা হিসেবে তার আবেদন ফুরোয়নি। সাহেবও যথাযথ।

পরিচালক সন্দীপ রায় কাহিনি থেকে না সরেও গত শতাব্দীর সাতের দশকের গল্পকে এনেছেন আজকের পটভূমিতে। তাতে অবশ্য ছবির তাল কাটেনি। বরং এই প্রবন্ধের পক্ষে ফেলুদার সঙ্গে নিজেদের জুড়ে দিতে সুবিধেই হবে।

‘ডবল ফেলুদা’র বিশেষ প্রাপ্তি হল, ফেলুদার ৫০ বছর উপলক্ষে শেষে নাম দেখানোর সময়ে দেখানো দৃশ্যগুলো। অন্য ছবির এই দৃশ্য পরদায় ভাসলেই দর্শকেরা আবাগে অন্ধকারে হুড়মুড়িয়ে বেরনোর চেষ্টা করে। কিন্তু এই ছবি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও দর্শকেরা পরদার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে দেখতে থাকল ফেলুদার পাণ্ডুলিপির পাতা, দুষ্প্রাপ্য ইলাস্ট্রেশন, ফেলুদার শুটিংয়ের বিরল ফোটোগুলোর দিকে। সেই সঙ্গে সবাই শুনল সিদ্ধার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কুশল চক্রবর্তী, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, বাদল বসু, সুবীর মিত্র কী বলেছেন ফেলুদা এবং সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে।

তাই হল থেকে বরতে-বেরতে মনে হল, এই ছবি নিছক সিনেমা নয়, বরং অর্ধেক শতাব্দী ধরে ফেলু কাহিনির যে প্রবহমানতায় আচ্ছন্ন বাঙালি, তাকে ছুঁয়ে দেখা।