magazine_cover_12_august_18.jpg

Anandalok Review

সিনেমা ফেরিওয়ালা

বায়োস্কোপওয়ালা
bioscopewala-big

পরিচালক: দেব মেধেকর
অভিনয়: ড্যানি ডেনজ়োঙ্গপা, গীতাঞ্জলি থাপা, আদিল হুসেন

দেব মেধেকর পরিচালিত ‘বায়োস্কোপওয়ালা’ সিনেমাটিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জনপ্রিয় ছোটগল্প ‘কাবুলিওয়ালা’র আধুনিক একটি রূপান্তর বলা চলে। ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পে উনিশ শতকের কলকাতা এবং সমকালীন সমাজ-জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। একইরকমভাবে এই ছবিতে নয়ের দশকের কলকাতাকে তুলে ধরা হয়েছে। নব্বইয়ের কলকাতা, কলকাতার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, ধর্মীয় জটিলতা সব বিষয়ই সূক্ষ্মতার সঙ্গে সিনেমাতে বর্তমান।

‘কাবুলিওয়ালা’র প্লট অবলম্বন করে পরিচালক নব্বইয়ের কলকাতাকে সিনেমাতে তুলে এনেছেন, সেখানে কাবুলিওয়ালা নেই। রয়েছে বায়োস্কোপওয়ালা। এক সময় কলকাতার বিনোদন সংস্কৃতিতে এই বায়োস্কোপওয়ালাদের অন্যরকম ভূমিকা ছিল বলা চলে। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে সিনেমা দেখিয়ে বেড়াত তারা। সিনেমায় ‘বায়োস্কোপওয়ালা’ রহমত খান (ড্যানি) আফগানিস্তান থেকে কলকাতায় আসে জীবিকার সন্ধানে। কারণ সিনেমা তাঁর নেশা এবং পেশা। আফগানিস্তানে এই পেশাকেই সমাজ বদলের মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছিল সে। কিন্তু সমাজ বদলের এই স্বপ্ন আফগান তালিবানদের চোখে অধর্মীয় বিষয়, তাই রহমত দেশ ছেড়ে কলকাতায় আসে। কলকাতাতেও বায়োস্কোপওয়ালা হিসাবে নিজের পেশা চালাতে থাকে, পেশার সূত্রে আলাপ হয় কলকাতার জনপ্রিয় ফোটোগ্রাফার রবি বাসু (আদিল হুসেন)-র মেয়ে মিনি বাসু (গীতাঞ্জলি থাপা)-র সঙ্গে। রহমতের কাছেই মিনি গল্প-ন্যারেটোলজি কিংবা সিনেমার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

তারপর কী হয়, তা সিনেমার পরদার জন্যই তোলা থাক। এই সিনেমাতে রয়েছে অনেকগুলি স্তর। বাবার ইচ্ছাপূরণে একজন মেয়ের প্রচেষ্টাকে সিনেমাতে তুলে ধরা হয়েছে, মিনির প্রতি রহমতের অপত্য-স্নেহও গল্পে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। ঘটনা প্রসঙ্গে কাহিনিতে স্থান পেয়েছে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত আফগানের ছবি, এসেছে ধর্মীয় জটিলাবর্ত, উদ্বাস্তু সমস্যা…এই সবের বাইরেও মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক জটিল ধর্মীয় সংস্কারে বন্ধ থাকে না, মানবিকতার ছোট ছোট ঘটনা উল্লেখ কাহিনিতে রয়েছে।

চিত্রনাট্য যথেষ্ট কমপ্যাক্ট, ফ্ল্যাশব্যাকে অতীতের ঘটনাকে ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে। আফগান শহরের যুদ্ধ-বিধ্বস্ত পরিস্থিতিকে চিত্রনাট্যে যে ভাবে তুলে ধরা হয়েছে তাতে কোথাও না কোথাও দর্শকও এই প্রতিকূল পরিবেশের সামনে মিনির মতোই থমকে দাঁড়ায়। নয়ের দশকের দাঙ্গা-বিক্ষোভ পরিবেশ আরও একবার অতীতকে জাগিয়ে দেয় কিন্তু এই সবের মধ্যেও রহমতের ছোট মিনিকে বাঁচানোর চেষ্টা দর্শককে মুগ্ধ করে। ছবিতে বাবা-মেয়ের সম্পর্ক যতটা না রবি আর মিনির সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে সেইভাবে প্রকাশ না পেলেও রহমত আর মিনির সম্পর্কের মিষ্টতা ছবিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। রহমত জেল থেকে ছাড়া পেতেই মিনিকে দেখবে বলে ছুটে আসার মধ্যেই এই স্নেহের টান খুঁজে পাওয়া যায়।

তবে কাহিনিতে অতীতের রহস্যস্তর ভেদ করতে গিয়ে মিনির যে ক্লুগুলো খুঁজে পেয়েছে সবগুলিই বড় তাৎক্ষণিক, ফলে গল্পের প্লট অনেকাংশেই একরৈখিক হয়ে পড়েছে। ফেলা আসা অতীতের অনেক বিষয়ই অত্যন্ত সুস্থিত সংরক্ষণের নজির মেলে, যা কাহিনি সাপেক্ষে মেনে নেওয়া যায় না-রহমত যে সময়ে আফগান দেশ ছাড়ে এবং অনেক বছর পরে মিনির সেই দেশে ফিরে, সেই ধ্বংসচিহ্ণগুলি অবিকৃত অবস্থায় দেখে পাওয়াটাই আশ্চর্য লাগে।

তবে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয় যথাযথ, খুব বেশি মেলোড্রামাটিক কোনও অংশকেই করে তোলা হয়নি। মোটের উপর স্বল্প সময়ে কলকাতার নস্টালজিয়া সিনেমাতে প্রত্যক্ষ করা যায়। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের একটি ক্ল্যাসিক গল্পের এই প্রকার রূপান্তর দর্শকে অন্য এক ভাবনার দিকে নিয়ে যাবে।

এখন আপনার রিভিউ প্রকাশিত হতে পারে আনন্দলোক-এ। সিনেমা দেখে
চটপট লিখে ফেলুন রিভিউ আর ইমেল করুন

anandalok.magazine[email protected]