magazine_cover_12_decemberr_18.jpg

Anandalok Review

বাস্তব ও ম্যাজ়িকের মিশেল

praktan-still
প্রাক্তন
পরিচালক: নন্দিতা রায়, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
অভিনয়: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, প্রসেনজিত্ চট্টোপাধ্যায়, অপরাজিতা আঢ্য

‘প্রাক্তন’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগে, বলা যায়, এই ছবির শুটিং শুরু হওয়ার আগে থেকেই যে খবরটি এই ছবিটির ইউএসপি ছিল তা হল, দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর প্রসেনজিত্-ঋতুপর্ণা জুটির কামব্যাক। প্রসেনজিত্-ঋতুপর্ণা এবং শিবপ্রসাদ-নন্দিতা, এই চারজনের মেলবন্ধনে একটি মনোগ্রাহী ছবি তৈরি হবে, এই কথাটি ভাবা যেতেই পারে।

দুটো মানুষ, উজান (প্রসেনজিত্) ও সুদীপা (ঋতুপর্ণা)। উজান টুরিস্ট গাইড। কলকাতায় আসা টুরিস্টদের নিয়ে কখনও হেঁটে, কখনও ট্রামে চড়ে কলকাতার ঐতিহ্যের সঙ্গে পর্যটকদের পরিচয় করায় সে। এই রকম এক হেরিটেজ ওয়াকে মুম্বইয়ের আর্কিটেক্ট সুদীপার সঙ্গে আলাপ হয় উজানের। উজানের টানে সুদীপা ভেসে যায়। উজানের মধ্যবিত্ত পরিবারে বউ হয়ে আসে সে। তার পরেই শুরু হয় বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত। পরিণতি বিবাহবিচ্ছেদ। এর প্রায় দশ বছর পরে মুম্বই থেকে কলকাতায় ফেরার পথে ট্রেনের কামরায় সুদীপার সঙ্গে আলাপ হয় মালিনী ও তার মেয়ে পুতুলের। কথাপ্রসঙ্গে সুদীপা জানতে পারে, মালিনী উজানের দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রী এবং পুতুল তাদের একমাত্র কন্যা। স্ত্রী মালিনীর জন্মদিনে তাকে চমকে দিতে নাগপুর থেকে ট্রেনে উঠে উজান, কিন্তু নিজেই চমকে যায় এক কামরায় সুদীপাকে দেখে। ছবির গল্প বারবার ভবিষ্যত্ থেকে অতীতে নিয়ে গিয়েছে দর্শককে। ফ্ল্যাশব্যাকে উজান আর সুদীপার প্রেম-অপ্রেমের গল্পের সঙ্গে দর্শক নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে। praktan3 ঋতুপর্ণা-প্রসেনজিত্, বাংলা ছবির এই রোম্যান্টির জুটি বহু বছর পর আবার পরদায় ফিরে এলেন, তাই পরদায় ওঁদের ভালবাসার কেমিস্ট্রিটা বেশি দেখতে মন চাইবে বইকি। কিন্তু উজান-সুদীপার প্রেমের চেয়ে মনোমালিন্যের গল্পই যেন ছবির অনেকটা পরিসর নিয়ে ফেলেছে। ট্রেনের দৃশ্যে ঋতুপর্ণাকে বেশ এলিগেন্ট লেগেছে। ট্রেনে অন্য সহযাত্রীদের গল্পের মধ্যে মানালি ও বিশ্বনাথের চরিত্র দুটি কমিক রিলিফ। কিন্তু কিছু জায়গায় একটু এডিটিং হলে মন্দ হত না। এতদিন পর সৌমিত্র ও সাবিত্রীর মতো জুটিকে হাতে পেয়ে আরও কিছুটা ব্যবহার করতে পারতেন পরিচালকদ্বয়। যে দুই-আড়াই দৃশ্যে তাঁরা ছিলেন সেই দৃশ্যগুলিই মনে থেকে যায়। সৌমিত্রর গলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হঠাত্ দেখা’ কবিতার পাঠ বা সাবিত্রীর হিন্দিতে ট্রেনের অ্যাটেনডেন্টকে বকুনি দেওয়ার দৃশ্য অসাধারণ। অনুপম, উপল, অনিন্দ্য ও সুরজিত্-এই চার সঙ্গীতশিল্পীর উপস্থিতি উপরি পাওনা। একটি দৃশ্যে উপল, অন্য সহযাত্রীদের ডাকছে গানের লড়াই খেলার জন্য। দৃশ্যটা যদি এমন হত, অন্য কোনও যাত্রী এই চার মিউজ়িশিয়ানকে একসঙ্গে পেয়ে গান গাওয়ার আবদার করছে, তা হলে হয়তো দৃশ্যটা হয়তো আরও বিশ্বাসযোগ্য মনে হত। তবে অনিন্দ্য ও সুরজিতের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ‘ভূমি’ ব্র্যান্ডটির ভাঙন ও সেটা জোড়া লাগানোর প্রচেষ্টার প্রসঙ্গটি টেনে আনায় অনেকেই খুশি, অন্তত ‘ভূমি’ প্রেমিকরা তো বটেই। এই ছবিতে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি গান অনবদ্য। অভিনয়ের নিরিখে বাউন্ডারি মেরে দিয়েছেন অপরাজিতা আঢ্য। মালিনীকে উদ্দেশ্য করে সুদীপার একটি সংলাপ ছিল, “চিপ ও ইরিটেটিং’। একজন চিপ ও ইরিটেটিং মহিলায় ভূমিকায় অপরাজিতা দুদার্ন্ত ব্যাটিং করেছেন। তিনি যে সুঅভিনেত্রী তা আবার প্রমাণ করলেন মালিনীর মধ্য দিয়ে। তবে উজানকে কীভাবে মালিনী বদলে দিল সেটার ব্যাখ্যা ছবিতে দেখতে পেলে ভাল হত। একেবারে শেষ দৃশ্যে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের উপস্থিতি সকলকেই চমকে দেয়। শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ছবিতে এর আগে এতো ল্যান্ডস্কেপের দৃশ্য ব্যবহৃত হয়নি। দৃশ্যগুলি বেশ সুন্দর। শুধু ল্যান্ডস্কেপ নয়, কলকাতাকেও বেশ পরিপাটি করে দেখিয়েছেন পরিচালকদ্বয়। বাস্তব ঘটনা যে বেশ সহজভাবে পরদায় ফুটিয়ে তোলা যায়, ‘প্রাক্তন’-এর মাধ্যমে তা আরও একবার প্রমাণ করলেন নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

পৃথা রায়, শ্যামবাজার