magazine_cover_12_january_19.jpg

Tolly Interview

চৈতী ঘোষালের সাক্ষাৎকার

chite-gshal-big
কেরিয়ার থেকে জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে মুখ খুললেন চৈতী ঘোষাল। শুনলেন জয়াশিস ঘোষ

 

আপনার সাম্প্রতিক ছবি ‘কলের গান’। এই কলের গান নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত কোনও অভিজ্ঞতা যদি বলেন…

সে ভাবে বলতে গেলে ‘কলের গান’ নিয়ে আমার তেমন কোনও অভিজ্ঞতা নেই। তবে একটা কথা মনে আছে, আমার তখন পাঁচ কি সাড়ে পাঁচ বছর বয়স। তখন আমি ‘ডাকঘর’ নাটকে অমলের চরিত্রটা করতাম। সেটা ছিল আমার জীবনের প্রথম কাজ। সেই সময় তৃপ্তি মিত্রর বাড়িতে একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। সেই রেকর্ড প্লেয়ারে আমি অনেক পুরনো-পুরনো গান শুনেছি। সেটাই ছিল আমার রেকর্ডে গান শোনার প্রথম অভিজ্ঞতা।

 

আপনার রুপোলি পরদার জার্নিটা শুরু হয় কীভাবে?

সেটা খুব ইন্টারেস্টিং একটা ঘটনা। আমার প্রথম ছবি ছিল অপর্ণা সেনের ‘পরমা’। যেহেতু আমার বাবা শ্যামল ঘোষাল একজন অভিনেতা ছিলেন, তাই ছোট থেকেই বেশ কিছু ছোটখাটো ভূমিকায় অভিনয় করার সুযোগ আমি পেয়েছিলাম। যদিও বাবা আমাকে সেগুলোর কোনওটাই করতে দেননি। তখন আমি স্কুলে পড়ি। একদিন স্কুলেরই এক বন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি বাড়ির সামনে একটা গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামলেন অপর্ণা সেন। আমাদের বাড়িটা হল লিনেমার বাড়ি, সেখানে অপর্ণা সেন আসাটা তেমন কোনও বড় ব্যাপার নয়। আমি কিছুই জানি না, মা খালি বললেন, আমায় সাড়ে আটটার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হবে। আমি তো সেটা কিছুতেই মেনে নেব না, সেই নিয়ে মা’র সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটিও চলছে… শেষপর্যন্ত আমি সেই জন্মদিনের পার্টিতে চলে যাই। এর দু’তিনদিন পর একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় খেতে বসেছি, মা বললেন, আমি নাকি খুব রোগা, আমার আরও ভাল করে খাওয়া-দাওয়া করা দরকার। আমি তো এই কথা শুনে অবাক! জিজ্ঞেস করাতে মা বললেন, রীনাদি নাকি ‘পরমা’তে একটা ইন্টারেস্টিং চরিত্রে আমাকে নেওয়ার কথা ভাবছিলেন, কিন্তু আমি খুব রোগা বলে উনি এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। মায়ের বক্তব্য, আমি সিনেমায় অভিনয় করি বা না-করি, আমি রোগা, এই কথাটা যেন মাকে কারও কাছ থেকে শুনতে না হয়! এখন ভাবি, মা যদি জানতেন যে রোগা থাকাটাই আসল ব্যাপার…(হাসি)। শেষপর্যন্ত অবশ্য আমি ‘পরমা’র জন্য নির্বাচিত হই। তখন ক্লাস এইটে পড়ি। এরপর গৌতম ঘোষের সঙ্গে ‘কুয়াশায়’ বলে একটা শর্টফিল্ম করি। তারপর ওঁর সঙ্গেই ‘এক ঘাট কি কাহানি’ বলে একটা কাজ করি। ততদিনে আমি টুয়েলভ পাশ করে গিয়েছি। এরপর নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করেছি। টুকটাক থিয়েটারও করছিলাম। এরপর যখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি, তখন দূরদর্শনে রণজিৎ রায়ের সঙ্গে ‘চেনা অচেনা’ বলে একটা সিরিয়ালে কাজ করি। ওই কাজটা করে আমি তখনকার সময়ের প্রায় সব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম। এভাবেই আমার পথচলার শুরু…

 

এতবছর ইন্ডাস্ট্রিতে থাকার পর আজ কি কোনওভাবে মনে হয় যে ইন্ডাস্ট্রি আপনাকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারল না?

হ্যাঁ, আমার এটা অবশ্যই মনে হয়। আমার আসলে আত্মসম্মানবোধটা একটু বেশি, আর আমার মনে হয় যে-কোনও অভিনেতা-অভিনেত্রীরই সেটা থাকা প্রয়োজন। এই ‘আত্মসম্মান’ ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্যজনক একটা ব্যাপার। কেরিয়ারের পথে এটা মাঝে-মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, আবার এটার জন্যই অনেক বড় হওয়াও যায়। সত্যি কথা বলতে, আমার দর্শকরা আমায় বলেন যে তাঁরা কেন বড়পরদায় আমাকে দেখতে পান না। ছোটপরদা নিয়ে আমার কোনও অভিযোগ নেই, কারণ টেলিভিশনে আমি নানারকমের চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছি। আর তার জন্য দর্শকদের কাছ থেকে যথেষ্ট প্রশংসাও পেয়েছি। এর জন্য আমি তাঁদের কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ। থিয়েটার কম করলেও বেশ কিছু ভাল-ভাল চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছি। সেদিক থেকে আমার মনে হয়, সিনেমা আমাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। পরিচালকরা সকলেই জানেন আমি কেমন অভিনয় করি… কেউ বলবেন না যে আমি দেখতে খারাপ কিংবা আমার কোনও গ্ল্যামার নেই। তবুও তাঁরা কী কারণে যে আমায় কাস্ট করতে চান না, আমি জানি না! এর ফলে আমার অনেকগুলো ভাল চরিত্র করা হল না। এটা ঠিক যে, আমি একটু বাছা-বাছা ছবি করি। ছবির সংখ্যা বাড়ানোর জন্য অনেকেই এক মিনিট-দু’মিনিটের রোলে অভিনয় করলেও আমি তা করি না। জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য কিংবা টাকা রোজগারের জন্য ও’রকম চরিত্রে অভিনয় না করলেও আমার চলবে। কিন্তু যে রোলে অভিনয় করলে আমার অনেক কিছু দেওয়ার জায়গা থাকবে, সেই চরিত্র করতে আমি সবসময়েই আগ্রহী।

 

ভবিষ্যতে ক্যামেরার পিছনে কাজ করার কোনও পরিকল্পনা আছে?

আমার ইচ্ছে আছে। আগে ছিল না, কিন্তু এখন হয়েছে। তবে কীভাবে কাজ করব, সেটা এখনও কিছু ভাবিনি।

 

এখন তো আপনি একজন তরুণ অভিনেতার মা-ও বটে। তাঁকে কীভাবে মোটিভেট করেন?

(হাসতে হাসতে) তাকে মোটিভেট করার কিছু নেই। সে নিজেই যথেষ্ট মোটিভেটেড। সে বরং আমাকে মোটিভেট করে। সকলের মতো আমার জীবনেও অনেক পাওয়া-না পাওয়া রয়েছে। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিটা হল আমার ছেলে অমর্ত্য রায়। যার জন্য আমার জীবনের খুশিগুলো আরও অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছে। আমার ভাল লাগা, রাগ হওয়া— সবই ওর জন্য। ওর জীবনে আমি শুধু ওর মা নই, বন্ধুও। আমার সব কাজের উপরেই ওর সতর্ক নজর থাকে। ওকে আলাদা করে কিছু বলতে হয় না। শুধু বলেছি ধীর-স্থির থাকতে, নিজের মাথাটা ঠিক রাখতে। এটা মনে রাখতে হবে যে, ও সেরা নয়, ওর থেকেও ভাল অনেকে আছে।

 

তার মানে ও-ই আপনাকে অনেকটা কন্ট্রোল করে…

ওকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো স্বীকার করবে না, কিন্তু আমি বলব যে হ্যাঁ, ও আমাকে অনেকটাই কন্ট্রেোল করে।

 

যদি নতুন করে সবকিছু শুরু করার সুযোগ আসে, কোনও কিছু কি পালটাতে চান?

না, আসলে এরকম একটা জীবন দেওয়ার জন্য আমি ভগবানের কাছে খুব কৃতজ্ঞ। এটকু বলতে পারি যে, কোনওরকম আপস না করে আমার মতো কেরিয়ার খুব কমজনই করতে পেরেছে! আর আমি দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ আমাকে এভাবে গ্রহণ করার জন্য।

 

যদি জীবনের একটা আক্ষেপের কথা বলতে বলা হয়…

একটা! ভুরি-ভুরি আক্ষেপ রয়েছে। তবে আরও ভাল-ভাল কিছু ছবিতে অভিনয় না করতে পারার আক্ষেপ তো রয়েছেই। তা ছাড়া জীবনে বেশ কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, যেগুলো আজও মেটানো হয়নি…এই আক্ষেপটাও রয়ে গিয়েছে।