magazine_cover_12_january_17.jpg

Music Interview

ছোটবেলায় থালা-বাটি পেটানো থেকে শুরু করে বিবিসির চার্টবাস্টার…পারকাশনিস্ট অভিষেক বসুর জার্নি নিয়ে কথা বললেন ধৃতিমান গঙ্গোপাধ্যায়

Abhishek-interview

প্র: সম্প্রতি কলকাতায় একটি শো হয়ে গেল। সাইক্যাচডেলিক ভিশুয়াল প্রোজেকশন, বডি পেন্টিং এবং এরই সঙ্গে ‘ইজ়ম’ এবং ‘ভেদাট্রনিক্স’-এর পারফরম্যান্স। শেষের দু’টি নামই দু’টি মিউজ়িক প্রোজেক্টের। আর দু’টিতেই প্রধান মুখ, পারকশনিস্ট অভিষেক বসুর। তাঁর প্রথম ওয়র্ল্ড মিউজ়িক প্রোজেক্টের ১০ বছর বয়স হয়ে গেল……

কিন্তু এসবের শুরু তো বিক্রম ঘোষের হাতে? আমি বলতে চাইছি, আপনার শিক্ষাগুরু তো বিক্রম ঘোষই…
উ: আমি আসলে বিক্রমদার বাবা, পণ্ডিত শঙ্কর ঘোষের ছাত্র। মানে মা ওঁর কাছেই শিখতে দিয়েছিলেন। সেসময় গুরুজি ‘ড্রামস অফ ইন্ডিয়া’ নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত, ফলে আমার হাতেখড়ি হয় বিক্রমদার হাতেই। গুরুজি (শঙ্কর ঘোষ) টুর শেষ করে ফিরে এলে, তাঁর কাছে শিখতে শুরু করি। সেসময় একদিন গুরুজির ক্লাসে আমায় দেখে বিক্রমদা বলে ওঠেন, “আরে, তুমি এখানে? আমি তো ভাবলাম তুমি তবলা ছেড়ে দিয়েছ! বাবা, তুমি আমার ছাত্র নিয়ে নিলে?” ওঁদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা একেবারে অন্যরকম। আবেগের সম্পর্ক, প্রাণের সম্পর্ক।

 

প্র: কিন্তু আপনার মধ্যে তবলার এই ‘পোকা’টি আবিষ্কার করলেন কে?
উ:এই উত্তরটা মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। তখন আমি খুব ছোট, ফলে শোনা কথাই বলতে হবে। মায়ের কাছে শুনেছি, আমি নাকি হাতের কাছে থালা-বাটি-গ্লাস পেলেই সেগুলি বাজিয়ে বাড়ি মাথায় করতাম। আমাদের মুদিয়ালির বাড়ির খুব কাছেই শঙ্কর ঘোষ থাকতেন। একরকম উত্‌পাত দূর করতেই শঙ্কর ঘোষের কাছে মা আমায় নিয়ে যান। তখন আমার বয়স পাঁচ। এই থেকেই শুরু। এখনও কিন্তু আমি শিখছি। শেখার কোনও শেষ হয় না।

 

প্র: আপনার প্রথম ব্রেক…
উ:আমার প্রথম পাবলিক পারফরম্যান্স আট বছর বয়সে। গুরুজিই সেটার ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৫-১৬ বছর বয়সে আমি ক্লাসিক্যাল সঙ্গত করতে শুরু করি। এই সময়, প্রতিযোগীতা জিতে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ পুরস্কার পেয়েছিলাম। সেখানেই আমার নম্বর নেন পণ্ডিত তরুণ ভট্টাচার্য, আমায় যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে আমি তরুণদার সঙ্গে বাজাই। এরপরই উনি মাকে ফোন করে বলেন, “আপনার ছেলেকে আমার চার মাসের জন্য চাই!” তারপর, তরুণদার সঙ্গেই, ১৭ বছর বয়সে আমার প্রথম আমেরিকা টুর। এটাকেই আমি জীবনের সবচেয়ে বড় ব্রেক বলে মনে করি। কারণ এখান থেকেই জীবনটা পাল্টায়।

 

প্র: ‘ইজ়ম’ কি এরপরই শুরু?
উ:বলতে পারেন, ইউ এস-এ গিয়ে আইডিয়াটা তৈরি হয়। দেখুন, তবলা-সঙ্গত করতে গিয়ে তো নিজস্ব কম্পোজ়িশন ইত্যাদি দেখানোর অতটা সুযোগ হয় না। এদিকে গুরুজির বক্তব্য ছিল, “আগে কানসেন হও, তারপর তানসেন”। ছোটবেলা থেকেই সারাক্ষণ বিভিন্ন রকমের মিউজ়িক শুনতাম। এতে কী হয়, বিটের একটা স্বাভাবিক ধারণা তৈরি হয়ে যায়। তাল, বা বিট, তা তো আসলে শরীরের মধ্যেই! আমেরিকায় গিয়ে বিভিন্ন মিউজ়িশিয়ানদের সঙ্গে মেলামেশা হয়। যে কম্পোজ়িশনের আইডিয়াগুলো ছিল, সেগুলো আরও দানা বাঁধতে থাকে। অবশেষে, ২০০৫-এ ‘ইজ়ম’ তৈরি হয়। ফিউশন বলব না, ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল-জ্যাজ়-অ্যাফ্রো-কিউবান…নানাধরনের সঙ্গিত নিয়ে তৈরি করা ওয়র্ল্ড মিউজ়িক প্রেজ়েন্ট করে ‘ইজ়ম’। অবশ্য ইতিমধ্যে আমার বেশ কিছু সোলো অ্যালবাম বেরিয়েছে।

 

প্র: তবলা থেকে ওয়েস্টার্ন ড্রামস, জার্নিটা খুব সহজ? আলাদা করে শিখতে হয়েছিল?
উ:আসলে ক্লাসিক্যাল তবলাশিক্ষায় এতরকমের ইন্ট্রিকেসি আছে, এতরকমের ফিঙ্গারিং আছে যে আলাদা করে আর অন্যরকমের ড্রামস বাজানো শিখতে হয় না। তবলাটা ভাল করে শিখলেই আত্মবিশ্বাসটা তৈরি হয়ে যায়। আর আমার বিরাট সৌভাগ্য যে আমি শঙ্কর ঘোষের কাছে তবলা শিখেছি। ওঁর কম্পোজ়িশনের ভাণ্ডার এত বড়, এতরকমের ফিঙ্গারিং স্টাইল যে আমার কোনওরকম অসুবিধে হয়নি। সে আফ্রিকান ড্রামসই বাজাই বা লাতিন আমেরিকান। জানেন, অনেকসময় ওয়েস্টার্ন ড্রামাররাই আমায় জিজ্ঞাসা করেছেন, “তুমি কীভাবে এত সহজে এই ধরনের ফিঙ্গারিংয়ে বাজাচ্ছ! আমাদেরও তো সমস্যা হয়!”

 

প্র: আপনার ট্র্যাক নাকি ম্যাডোনাকে পিছনে ফেলে দিয়েছিল!
উ:হ্যঁা, আসলে ২০০৮-০৯ সালে ‘জ্যাম্বিনেশন’ নামে একটা ইন্দো-আমেরিকান জ্যাজ় প্রোজেক্ট তৈরি করি। ভারতে মিউজ়িকের ইন্টারন্যাশনাল সেকশনে অ্যাডেল এবং ম্যাডোনাকে পিছনে ফেলে এক নম্বরে পৌঁছয় ‘জ্যাম্বিনেশন’। এই সূত্রে আরেকটা কথা বলি, আমার অ্যালবাম ‘সার্চিং ফর নির্বাণা’র দুটো ট্র্যাক বিবিসির টপ টেন চার্টবাস্টারে গিয়েছিল। পৃথিবীর তাবড়-তাবড় জ্যাজ় প্লেয়াররা বিবিসির শোয়ে এই ট্র্যাক বাজিয়েছেন। এই অ্যালবামেই আমি প্রথমবার মোনালিকে (ঠাকুর) দিয়ে গাইয়েছিলাম।

 

প্র: আর ‘ভেদাট্রনিক্স’?
উ:একটি আমেরিকান টুরের সময়, বল্টিমোরে থাকা কিছু মিউজ়িশিয়ানের সঙ্গে আমার দেখা হয়। এঁরা প্রত্যেকেই ভারতীয় সংস্কৃতির দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত। সঙ্গিত ছাড়াও, ওঁরা ভিশুয়াল নিয়ে অনেক কাজ করেন। যেমন, ভিশনারি পেন্টিং…মানে, আপনি কী ভাবছেন, ওঁরা এঁকে দেবেন! এই ব্যাপারটাই ভেদাট্রনিক্সে আমি আনি। কলকাতায় এই প্রোজেক্টটার জন্যই মূলত এই শো-টা করা। বেসিক্যালি প্রোজেক্টটা এই প্রজন্মের সবার জন্য। মিউজ়িকের সঙ্গে বডি পেন্টিং, ডাবস্টেপ নিউ এজ মিউজ়িক, মন্ত্র, ইন্ডিয়ান ভোকাল…এই হচ্ছে ভেদাট্রনিক্সের ফিউশন কনসেপ্ট। শিবমন্ত্র আর ভিশুয়াল দিয়ে একটা মন্দিরের মতো আবহাওয়া তৈরি করা হয়। এফেক্টটা আরও বাড়াতে আমার ছাত্র, যে শিরিডি শ্মশানমন্দিরে পূজারী, সেও পারফর্ম করে। ‘ভেদাট্রনিক্স’ এই দেশের নবীন প্রজন্মর খুব পছন্দ হবে বলেই আমার বিশ্বাস।

 

প্র: তাহলে তিনটে প্রোজেক্টে একসঙ্গে কাজ?
উ:তিনটে? না! এই মুহূর্তে ছ’টি প্রোজেক্টে একসঙ্গে কাজ করছি। ইজ়ম, জ্যাম্বিনেশন, ভেদাট্রনিক্সের কথা বলেইছি। এছাড়াও একটা ফোক ফিউশন প্রোজেক্ট আছে, চাতক। ইলা মা গান করেন আমার সঙ্গে। আর আছে, সুফিজ়ম এবং অ্যাকাওস্ট্রিকাল। প্রথমটা সুফি ফিউশন, আর পরেরটা ইনস্ট্রুমেন্টাল।

 

প্র: সঙ্গিতের এই পথে আপনার অনুপ্রেরণা কে?
উ:বেসিক্যালি, তবলা প্লেয়ার নয়, আমি প্রতিষ্ঠা পেতে চাই একজন কমপ্লিট মিউজ়িশিয়ান হিসেবে। আর এই পথে অনুপ্রেরণা বলতে, গুরুজি ছাড়া প্রথমে নাম আসে শ্রীলোক গুট্টুর। অনেকেই ওঁর নাম জানেন না, কিন্তু শ্রীলোকজি কিন্তু অসাধারণ মিউজ়িশিয়ান। আফ্রিকার জঙ্গলে গিয়ে আদিবাসিদের নিয়ে মাস কয়েকের মধ্যে অ্যালবাম তৈরি করে ফেলেছিলেন। এই যে এখন গালবাদ্য বাজান অনেকে, এটা কিন্তু আসলে আফ্রিকান স্টাইল। শ্রীলোকজি এবং জ়াকির হুসেনই এদেশে এই জিনিস প্রথমবার আনেন।

 

প্র: আপনার অন্যান্য কাজের ব্যাপারে কিছু বলুন।
উ:আমি এই মুহূর্তে মুম্বইয়ের বিখ্যাত পোস্ট-প্রোডাকশন কোম্পানি ‘ফিউচারওয়র্কস’-এর সঙ্গে কাজ করছি। সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার লোগো মিউজ়িকটিও আমার কম্পোজ়িশন। অনেকগুলো বড় ব্র্যান্ডের জিঙ্গল তৈরি করেছি আমি। কয়েকটা বাংলা ছবিতে কাজ করার কথা চলছে। দু’টি ছবিতে কাজও করেছি। আরেকটি হাইলাইট, বিদেশে থাকাকালীন ওয়ার্নার ব্রাদার্সের প্রধান সম্পাদকের সঙ্গে জিমি হেন্ড্রিক্সকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারিতে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। মিউজ়িক অ্যারেঞ্জার হিসেবে।

 

প্র: তাহলে গ্লোবালাইজ়েশনের বাজারে আপনিও চান ক্লাসিক্যালকে ‘আধুনিক’ করতে?
উ:একেবারেই না। গ্লোবালাইজ়েশন নিজের জায়গায় থাকবেই। কিন্তু প্রথমেই যেটা দরকার, তা হল প্রত্যেক স্কুল-কলেজে মিউজ়িক ক্লাস চালু করার। বিশেষ করে ভারতীয় সঙ্গীত। ছোটদের অনুপ্রেরণা জোগাতে হবে যাতে তারা কিবোর্ড বা গিটার না শিখে সেতার বা সরোদ শেখে। তাদের বোঝাতে হবে, ক্লাসিক্যাল মিউজ়িক এত ‘রিচ’ বলেই বিদেশীরা এভাবে আমাদের সঙ্গিতকে আঁকড়ে ধরেছে। আরও বলার, ছোটরা যেন গুরুর কাছে গিয়ে ভালভাবে শেখে এবং অন্তত পাঁচ-ছ বছর না কেটে গেলে যেন পারফর্ম করতে না আসে। আমাদের সময় একটা ভয় ছিল…গুরুজি সামনে বসে আছেন, বকাবকি করবেন…এই ব্যাপারটা কিন্তু এখন একেবারেই নেই। এই জিনিসটা ঠিক করতেই হবে।