magazine_cover_12_august_17.jpg

Music Interview

‘ইন্ডি মিউজ়িক’ শব্দটিকে ভারতে তাঁরাই হয়তো প্রথম এনেছিলেন। যদি বা না এনে থাকেন, সবচেয়ে লম্বা সময় যে ধরে রেখেছেন, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তাঁরা ‘ইন্ডিয়ান ওশন’। নয়ের দশকের গোড়া থেকে এখনও অবধি যাঁরা অমলিন। কখনও শুকিয়ে যায়নি তাঁদের সৃষ্টিশীলতা। ঢেউ বেড়েছে-কমেছে মাত্র। ব্যান্ডটি সম্প্রতি এসেছিল কলকাতায়, একটি রেডিয়ো স্টেশন আয়োজিত ‘মিউজ়িকম’ অনুষ্ঠানে। মঞ্চে ওঠার আগে, ব্যাকস্টেজে ব্যান্ডের সদস্যরা (রাহুল রাম, অমিত কিলাম, হিমাংশু যোশী, তুহিন চক্রবর্তী এবং নিখিল রাও) সঙ্গীতের আজ-কাল নিয়ে আড্ডা দিলেন ধৃতিমান গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে

এতদিন ধরে একটা ব্যান্ড একইভাবে টিকিয়ে রাখা তো চাট্টিখানি কথা নয়। সেটার রহস্য কী?
তুহিন: আমরা সবাই খুব খেতে ভালবাসি তো… তাই! বিশেষ করে বিরিয়ানি!
হিমাংশু: অ্যাই, সিরিয়াস হ’। এটা অমিতই সবচেয়ে ভাল বলবে। সবচেয়ে বেশি সময় ও-ই আছে ব্যান্ডের সঙ্গে। অতএব…

(অমিতের প্রতি) অতএব?
অমিত: অনেকগুলি ফ্যাক্টর আছে। মেম্বারদের স্বাস্থ্য, সৃষ্টিশীলতা, ভালবাসা… যে গান তৈরি করছি, তা নিজের পছন্দ হচ্ছে কি না… অনেকসময় আমাদেরই হয় যে, অনেকদিন ভাল কিছু করা হল না। কখনও ক্রিয়েটিভিটি খুব বেশি থাকে, একের পর এক কাজ করে ফেলি। ২০-২৫ বছর এইটাই কাজ করে গিয়েছে। ভালবাসা যেদিন থাকবে না, সেদিন আর মিউজ়িক তৈরি করে লাভ নেই। তাছাড়া ভাগ্য খুব বড় ব্যাপার। আমাদের ভাগ্য ভাল, আমরা ঠিক সময়ে ব্রেকগুলি পেয়েছি। তারপর সুযোগগুলি কাজেও লাগিয়েছি। লম্বা কেরিয়ার হলে আর একটা ব্যাপার আছে। অনেক খারাপ কাজ মুছেও ফেলতে পেরেছি! দেখুন কিছু গান ‘স্টেপল ডায়েট’-এর মতো বাজাতেই হয় সব জায়গায়। তবে এর বাইরে নতুন গান তো শোনাতে হবে?
হিমাংশু: ব্যান্ডের ভাঙনের ক্ষেত্রে যেটা সবচেয়ে বড় কারণ, তা হল ইগো। শিল্পীরা এমনিতেই খামখেয়ালি, একলষেঁড়ে হয়। তাদের ইগো বড্ড বেশি। সেই ইগোটা যদি তাকে তুলে রাখা যায়, এমনিতেই ব্যান্ডের বেশিদিন টেকার চান্স বেড়ে যায় অনেকটা। এটা আমরা করতে পেরেছি, বৃহত্তর পরিবারের মতো হয়ে গিয়েছি।
নিখিল: দেখুন, পৃথিবীতে বহু পুরনো ব্যান্ডই কিন্তু এখনও পারফর্ম করে। ধরুন ‘ডিপ পার্পল’, প্রায় ৫০ বছর হতে চলল। কিন্তু এরা সবাই পুরনো গানের উপর নির্ভর করেই বেঁচে আছে। সম্প্রতি আমি ‘লিনার্ড স্কিনার্ড’-এর পারফরম্যান্স দেখতে গিয়েছিলাম। ওদের বিখ্যাত গান ‘সুইট হোম আ্যালাবামা’র যে গিটার রিফ্‌ট ওরা ৪০ বছর আগে রেকর্ডিংয়ে বাজিয়েছিল, ঠিক সেটাই বাজাল। এর একটা স্টেডি অডিয়েন্স আছে, ফলে এটা চলতেই থাকে, ঠিক ওই ‘স্টেপল ডায়েট’-এর মতো। এই ব্যান্ডগুলির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা প্রায় কেউই নেই এখন। কিন্তু এইভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ? শিল্পীসত্তার জন্য তো এটা খুব ভাল বিজ্ঞাপন নয়। অন্তত ৫০ শতাংশ গান তো নতুন হবে? ‘ইন্ডিয়ান ওশন’ এখনও এটা ধরে রাখতে পেরেছে, এটাই কাজের কথা। আমরা চাই না সময়ের মধ্যে ফসিল হয়ে যেতে।

আজ থেকে সাত-আট বছর আগে, আপনাদের পারফর্ম করতে দেখেছি কলেজে। এইভাবেই প্রজন্মর পর প্রজন্ম বড় হতে দেখেছেন আপনারা। ভারতীয় দর্শক কতটা ইভল্‌ভ করেছে বলে মনে হয়?
রাহুল: এখন অরিজিনাল মিউজ়িকের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। ধরুন আমি যখন কলেজজীবনে রক মিউজ়িক বাজানো শুরু করি, আমরা সময়ের থেকে অন্তত দশ বছর এগিয়ে ছিলাম। মঞ্চে অরিজিনাল বাজাতে ভয় পেতাম। যদি শ্রোতারা না নেয়? তাই অরিজিনাল কিছু বাজালে আমরা ঘোষণা করতাম না। হাততালি পেলে, তখন চোরের মতো মুখ করে, ‘হেঁ হেঁ, এটা অরিজিনাল ছিল’ বলতাম। এরপর ‘ইন্ডিয়ান ওশন’ তৈরি হল। তা ধরুন, আরও দশ বছর পর। বেশিরভাগ শুভানুধ্যায়ীই বললেন, ‘‘অরিজিনাল মিউজ়িক কে শুনবে রে?’’ প্রথম ক’বছর মনে হচ্ছিল, ঠিকই বলেছেন ওঁরা। পাঁচ বছরে মাত্র সাতটা শো করেছিলাম আমরা। আস্তে-আস্তে সব পালটাল। রক কম্পিটিশনে নিয়ম হল, ব্যান্ডকে অন্তত একটা অরিজিনাল বাজাতেই হবে। এটা কিন্তু একটা বিরাট বিবর্তন।
হিমাংশু: এখন কিন্তু উলটো হয়েছে।
নিখিল: হ্যাঁ, এখন ‘কভার’ বাজালে লোকে বলবে, ‘‘এটা কী করছে? খালি অন্যের গান টুকলি…’’
রাহুল: তাছাড়া, অনেক ধরনের সঙ্গীত শোনার জন্যও দর্শকের কান এখন তৈরি। মিউজ়িক ইন্ডাস্ট্রিটাই তো একেবারে পালটে গিয়েছে। এখন বলিউডের গানেও অনেকাংশে ইডিএম (ইলেকট্রনিক ডান্স মিউজ়িক), র‌্যাপ ইত্যাদি ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে মানুষ তৈরি হচ্ছে।
হিমাংশু: আর একটা জিনিস হচ্ছে, রিজিয়নাল কাজ খুব বেশি করে শোনা যাচ্ছে। বাঙালিরা মরাঠি সঙ্গীত শুনছেন, পঞ্জাবিরা শুনছেন তেলুগু… এগুলি তো আগে ছিল না।
অমিত: এতে অরিজিনাল মিউজ়িকের সুবিধে হয়েছে… প্রতিটা প্রান্তের অল্পবয়সী মিউজ়িশিয়ানরা উঠে আসছে, নিজেদের প্রান্তের সঙ্গীত মাথায় রেখে, নতুন-নতুন কাজ করছে। খুব কসমোপলিটান এখন পুরো মিউজ়িক্যাল স্পেসটা। তবে আরও একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। সবাই তো ভালবেসে মিউজ়িকে আসে না। জাস্ট প্রফেশন ভেবেও অনেকে আসে। এটা আবার এই সময়ের একটা খারাপ দিক। আয় করার সুযোগ আছে বলেই তো এটা হচ্ছে।
তুহিন: আসলে সঙ্গীত এখন এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যে অনেকেই ভেবে নিচ্ছেন যে অ্যাভারেজ ট্যালেন্ট থাকলেও কিচু একটা করে নেওয়া যাবে। ভাগ্যের ব্যাপারটা কমে গিয়েছে অনেকটা। মানুষ নতুন ধরনের গান শুনতে চান। ফলে আগে এক লাখে একজন সুযোগ পেত, সেটা এখন এক হাজারে একজন পায় হয়তো।

এডিটিং সফ্‌টওয়্যার কি একটা কারণ?
অমিত: শুধু তা-ই নয়। মিডিয়া কভারেজ, ইন্টারনেট… ইন্টারনেট যে বিরাট স্বাধীনতা দিয়েছে, তা তো ভাবাই যায় না। তুমি তোমার গান গেয়ে সঙ্গে-সঙ্গে ইন্টারনেটে দিয়ে দিচ্ছ, কোনও মিউজ়িক কোম্পানির দ্বারস্থ হতে হচ্ছে না। তাছাড়া, লাইভ ভেনু। দিল্লি-মুম্বইতে ৫০-৬০টি এমন জায়গা আছে যেখানে কোনও ব্যান্ড পারফর্ম করতে পারে। এডিটিং সফ্‌টওয়্যারের কথা বলছিলেন না? বেশিরভাগ যন্ত্রাংশের দাম এখন অনেক কমে গিয়েছে। আর কোয়ালিটি বেড়েছে তাল মিলিয়ে। হয়তো এমন একটা ছোট ঘরে বসেই যথেষ্ট ভাল সঙ্গীত তৈরি করা যায়।
হিমাংশু: এত সত্ত্বেও, ‘অডিয়েন্স ড্রামস আর গিটার পছন্দ করে, দিয়ে দাও’ বললে কিন্তু হবে না। এযুগের শ্রোতারা সৃষ্টিশীল কাজই নেবেন। তবেই তা হিট হবে।
তুহিন: আর একটা জিনিস, আমরা বড় শহর নিয়ে খুব বেশি ভাবছি। ছোট শহরগুলির শ্রোতারা কিন্তু অনেক বেশি আবেগ নিয়ে গান শোনেন। তাঁদের কাছে কী হিট হবে তা নির্ভর করে সেই গান তাঁদের মধ্যে কী আবেগ তৈরি করল, তার উপর। সেখানে গলার টেক্সচার কী, তার খুব একটা প্রভাব নেই।

আচ্ছা, পাইরেসি নিয়ে আপনাদের কী মত?
অমিত: পাইরেসি এক্ষুনি বন্ধ হওয়া দরকার। সোমালিয়ার যত পাইরেট (জলদস্যু), সবাইকে ধরে জেলে পোরা উচিত! (অট্টহাসি) আরে যখন-তখন জাহাজ আটকে ফেলে! এই যে রাহুল, পাইরেসি নিয়ে কিছু বলো।
রাহুল: কী বলব?

দেখুন, বাংলার সঙ্গীতশিল্পীদের সঙ্গে কথা বললেই তাঁরা বলেন, পাইরেসি সঙ্গীতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শত্রু, মানে জনপ্রিয়তা…
রাহুল: অ্যাঁ!
তুহিন: এ কী! জনপ্রিয়তা তো বাড়বে!
রাহুল: না না, আমি ব্যাপারটা বলি? পাইরেসি শেষ। ওর কোনো রেলেভেন্স নেই এখন। কে সিডি শোনে বলুন তো? আমরা কি মিউজ়িক কিনে শুনি? গান ইন্টারনেটে যায়, দশ পয়সায় এমপিথ্রি ফাইল বিক্রি হয়। এতে কী পাবেন পাইরেসি করে?
নিখিল: আসলে ঠিক পাইরেসিটা এখানে ফ্যাক্টর নয়। কথা হল, কেউই টাকা দিয়ে কিছু কিনতে চান না এখনকার অনলাইন কালচারে। সিনেমা ফ্রি, গান ফ্রি… সব ফ্রি! এটা বদলানো দরকার…
অমিত: সে প্রসঙ্গ অন্য। আসল কথা, ভাল, ক্রিয়েটিভ মিউজ়িক তৈরি করে যান। একমাত্র তবেই আপনি টিকবেন। পাইরেসির জিগির তুলে লাভ নেই।