magazine_cover_12_March_19.jpg

Tolly Interview

পয়সার জন্য সবকিছু করব, এটা যেন কখনও না হয়: ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত

 
নিজেকে বলেন স্পষ্টবক্তা। সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে গিয়ে মনে হল ভুল বলেন না। ছবি, গান, জীবন নিয়ে বড্ড স্পষ্ট বক্তব্য ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর। শুনলেন ইন্দ্রাণী ঘোষ।
indradeep-dasgupta-big

 

পরপর এত কাজ একসঙ্গে করছেন, আবার সব কাজই তো আলাদা-আলাদা। নিজেকে পালটান কীভাবে?

এটাই তো আমার কাজ। এটাই তো প্রফেশনালিজ়ম, শিক্ষা, ছোটবেলা থেকে নানারকম সঙ্গীত শোনার উপকারিতা। এই শিফটটা যে সবাই করতে পারে, তা কিন্তু নয়। আমি এর জন্য ভগবানকে ধন্যবাদ জানাই যে আমার মধ্যে এই শিফট করার ক্ষমতাটা দিয়েছেন। আর আমি শিফটটা করতে পারি এই কারণে যে, আমি সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কোনও ব্যাগেজ নিয়ে চলি না। আই ডোন্ট বিহেভ লাইক আ মিউজ়িশিয়ান, গানের ফর্ম নিয়ে আমার আলাদা কোনও ছুতমার্গও নেই। এটা যদিও বলতে পারব না যে সবরকম জীবনযাত্রার সঙ্গে আমি
অভ্যস্ত, তবে সবরকম জীবনযাত্রাকে স্বীকৃতি দিই। দেখুন, একট-একটা গানের ফর্ম তো এক-একটা জীবনযাত্রা থেকে আসে। আমার বন্ধুরা রিকশাওয়ালা বা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হতে পারে, কিন্তু আমি যখন তাদের সঙ্গে মিশি, তখন তাদের মতো করেই মিশি। মানুষ হিসেবে আমার যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সেটাই আমার গানে ফুটে ওঠে।

 

আপনার প্রিয় গায়ক কে? কাকে দিয়ে গান গাওয়াতে চান?

এখনকার অরিজিৎ, আর অতীতে কিশোরকুমার, লতা মঙ্গেশকর।

 

সৃজিত মুখোপাধ্যায় থেকে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়… আপনার কাজ করার লিস্টে বড়-বড় অনেক পরিচালকই আছেন। কার সঙ্গে কাজ করতে ভাল লাগে বেশি? কে বেশি স্বাধীনতা দেন?

কৌশিকদা। সৃজিতের পুরো জিনিস ছকা থাকে এবং সেই অনুযায়ীই করতে হয়। বেশি ডানদিক-বাঁদিক নড়া যায় না। আসলে সৃজিতের মাথায় যে সুরটা থাকে, সেটাই করতে হবে, অন্য কোনও জিনিস ও নেবে না।

 

এই নিয়ে কখনও ঝামেলা হয় না?

নাহ। এই নিয়ে কোনও ঝামেলা হয় না। আসলে সকলেরই তো বয়স হয়ে গিয়েছে। এটা ওর কাজ করার পদ্ধতি। কৌশিকদার কাজ করার পদ্ধতি অন্য। কৌশিকদা আমাকে ছেড়ে দেয়।

 

একটা বিজ্ঞাপনকে ঘিরে তো কিছুদিন আগে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন…বিতর্কও হয়েছিল… সেখানেই আপনি মন্তব্য করেছেন, দেখলাম ‘পয়সা’র জন্যই সেই শিল্পীরা নাকি এমন কাজ করেছেন … এই ব্যাপারটা নিয়ে আপনি কী বলবেন?

হ্যাঁ, আমার বক্তব্য এটাই ছিল যে, এখানে যারা-যারা কাজ করেছে, তারা তো এমন নয় যে কেউ খেতে পায় না! তাদের প্রত্যেকের বাড়ি-গাড়ি সবই আছে। আমাদের জীবনে কিছু-কিছু জিনিস আছে, যেগুলো আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, যেগুলো মায়ের মতো! সে আপনি ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ই হোক বা ‘কারার ওই লৌহকপাট’, ‘আগুনের পরশমণি’… এগুলোকে যখন আবার ব্যবহার করা হয়, তখন তাকে যদি সঠিক মর্যাদা না দেওয়া হয়, তখন খুব খারাপ লাগে। সেই খারাপ লাগার জায়গাটা থেকেই আমি ধিক্কার জানিয়েছিলাম। এটা যে ওরা না করলেই পারত, এটা আমি এখনও বলব। তাছাড়া তার জন্য বিজ্ঞাপনটা তো এখন অফ এয়ারও হয়ে গিয়েছে। পয়সার জন্য সবকিছু করব, এটা যেন কখনও না হয়।

 

আপনিই তো নিজে একটা সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলেন যে, পয়সা পেলে আপনি অনেক কিছু করতে পারেন…

কোন সাক্ষাৎকার? এরকম কোনও সাক্ষাৎকারে বলিনি যে আমি পয়সা পেলে সব কিছু করতে পারি। বলেছিলাম, আমি পয়সা পেলে সবরকম ছবির গানই করতে পারি। তবে সবরকম ছবির গান আর এরকম একটা গানকে নিয়ে বাজে প্যারডি তৈরি করা… দুটোর মধ্যে তফাৎ আছে। আমি পয়সা পেলে ‘লুঙ্গি ডান্স’ও বানাতে পারি। কিন্তু ‘লুঙ্গি ডান্স’ তো কারওর গান নয়, এটায় আমি কারওর সেন্টিমেন্টে আঘাতও দিচ্ছি না। কিন্তু আমি তো ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ বা ‘আগুনের পরশমণি’ নিয়ে যা খুশি করতে পারি না। ‘আমার এই ফ্ল্যাটখানি তুলে ধরো’… এগুলো তো আর করছি না। এটাই আমার বক্তব্য ছিল।

 

আপনার তো বদনাম আছে স্পষ্টবক্তা, ঠোঁটকাটা বলে… এটা আপনি কীভাবে দেখেন?

এটাই আমার স্বভাব। আর দেখার আছেটাই বা কী? জীবনে সবকিছু দেখতে পেলে তো অনেক কিছুই হয়ে যেত! অনেকে বলেওছেন যে স্বভাবটা ঠিক কর। আর এখন তো বয়স হচ্ছে, শান্ত হচ্ছি। তাছাড়া আমি তো ঠোঁটকাটা নয়, স্পষ্টবক্তা। আর আমার সম্পর্কে তো এটাও শোনা যায় যে আমি কথাই কম বলি! আমি যে মুখচোরা, সেটা নিয়ে তো কেউ কিছু বলে না! আমাকে তো কোথাও দেখাও যায় না, সেটা নিয়েও তো কাউকে কিছু বলতে শোনা যায় না! আমি তো পাবলিসিটিতে যাই না কোথাও! তা হলে? যে লোকটা এসব করতেই চায় না, সে লোকটা যখন বলবে, তখন তার মনের কথাই নিশ্চয়ই বলবে!

 

তার মানে কী এটাই যে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত পাবলিসিটিতে বিশ্বাস করেন না?

অবিশ্বাসও করি না। কিন্তু আমি খুব একটা ভিড়ে মুখ দেখাতে অভ্যস্ত নই, স্বচ্ছন্দ্যও বোধ করি না। এটা আমার ইচ্ছের মধ্যে পড়ে। আর নিজের কাজ যদি ভাল হয়, সে ঢাক আপনিই পিটে যাবে। আমার সন্তান যদি ভাল হয়, সে একদিন ঠিক জীবনের কোথাও পৌঁছে যাবে। তা হলে রিকশাওয়ালার ছেলে আই এ এস হত না। সন্তান যদি ভাল না হয়, তা হলে শত ঢাক পিটিয়েও কিছু হবে না।

 

তা হলে আপনি বলুন, এই মুহূর্তে ইন্ডাস্ট্রিতে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের প্রতিযোগিতাটা কার সঙ্গে?

নিজের সঙ্গে।

 

কীসের প্রতিযোগিতা?

আরও ভাল কাজ করার তো বটেই। তাছাড়া আমি এখন ছবি বানাচ্ছি, সেটার জন্যও… আর এবার সিলেক্টিভ মিউজ়িক করতে চাই।

 

‘বিসর্জন’-এর সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন কালিকাপ্রসাদ। ‘বিজয়া’র সঙ্গীত নিয়ে কাজ করার সময় কোনও চাপ ছিল?

দেখুন এখানে ২৩ বছর কাটিয়ে ফেললাম তো, এখন আর চাপ মনে হয় না। এখন শুধু পরিষ্কার মনে, সততার সঙ্গে কাজ করতে চাই। প্রত্যেকটা ছবির ক্ষেত্রে সেই সৎ প্রয়াসটা দিলে বাকিটা তো সময়ই ঠিক করে নেবে। আর সৎ প্রচেষ্টার কিন্তু কোনও বিকল্প নেই। কালিকা করে গিয়েছে, আমাকে ওরটা ছাপিয়ে যেতে হবে, এই চাপ নিয়ে যদি আমি নামি, তা হলে তো প্রথমেই হেরে গেলাম! কালিকার সঙ্গে প্রতিযোগিতার তো আমার কোনও দরকার নেই! কালিকা তার কাজ করে গিয়েছে এবং সেই কাজ মানুষের কাছে পৌঁছেও গিয়েছে। সেটাকে তো আর আমি নামাতে পারি না। আমি বরং তার পাশে একটা রাখার চেষ্টা করব। তা হলে প্রতিযোগিতাটা কোথায়? তার থেকে ভাল হতে পারে, খারাপও হতে পারে, তার আশপাশেও হতে পারে। এটা আমার সম্পূর্ণ স্বাধীন একটা চেষ্টা, এখানে তো প্রতিযোগিতা আসার দরকার নেই!

 

আচ্ছা, এখন বাংলা গানের অবস্থাটা ঠিক কীরকম?

আমার মনে হয়, বাংলা গানে শেষ দশ বছরে যে সিনেমার গানের আধিক্যটা চলছে, সেটা এখনও চলবে, কারণ সিনেমাতেই পয়সা, প্রোমোশন। তবে নন-ফিল্ম মিউজ়িকের আর একটু উঠে আসা দরকার। আমরা বিদেশেও দেখেছি, এদেশেও দেখেছি, নন-ফিল্ম মিউজ়িকেই কিন্তু আসল পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সিনেমার গানে কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষাটা করা যায় না! সেখানে চাহিদা অনুযায়ী গান বানাতে হয়। নন-ফিল্ম মিউজ়িক খুব ওপেন, অনেকটা ওপেন ফোরামের মতো। আর সবাই তো রহমানের জায়গা থেকে আসেন না যে সিনেমার গানেও এক্সপেরিমেন্ট করতে পারবেন! নন-ফিল্ম মিউজ়িক বাংলা গানে আরও বেশি করে উঠে আসা উচিত। সেটা আমরা যারা সিনেমার গান বানাই, একটা জায়গায় গিয়েছি, তাদেরই আর একটু ঠেলা দেওয়া উচিত।

 

এ বিষয়ে আপনি কী করছেন?

চেষ্টা করছি যারা নতুন তাদের সাপোর্ট করার। কথা বলার চেষ্টা করছি। আর্টিস্টরা নিজেরা কম্পোজ় করার চেষ্টা করছি আর সেটা বিনা পারিশ্রমিকে করার চেষ্টা করছি।

 

নিজের ছবি ‘কেদারা’ বানানোর অভিজ্ঞতা কেমন?

খুবই ভাল একটা অভিজ্ঞতা। একদম অন্য একটা চোখে দেখা…

 

এরপরে আরও সিনেমা বানাবেন?

হ্যাঁ। কথাবার্তাও চলছে। পরের ছবি ফেব্রুয়ারিতে শুট হবে। ২০১৯-এ দুটো ছবির শুট হবে। একটা ‘অপু’, আর একটা এখনও ঠিক হয়নি। ‘অপু’ একটা প্রেমের গল্প।

 

হঠাৎ ছবি বানানো…

দেখুন, এটা তো ইচ্ছে তো ছিলই, সেটা আস্তে-আস্তে সাহস করে এই জায়গায় এসেছি। এত জায়গায় কাজ করেছি, সেখান থেকেই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে…

 

এরপরের পরিকল্পনা কী?

পরিকল্পনা এখন একটাই, দশ বছরের মধ্যে রিটায়ার করতে চাই। আর তখন যেন হাতে যথেষ্ট টাকা থাকে, যাতে শেষ জীবনটা ঠিক মতো চলে যায়। এছাড়া নতুন ট্যালেন্টদের সাহায্য করা, তাদের সঙ্গে ভাবনা বিনিময় করা… তাদের সঙ্গে কাজ করা, অভিজ্ঞতা বিনিময় করা, যাতে তারা উপরে আসতে পারে… নতুন-নতুন ছাত্র তৈরি করতে চাই। আর কোনও পরিকল্পনা আমার নেই। আগেও করিনি, এখনও করব না।

 

‘বিজয়া’য় সঙ্গীত পরিচালনার অভিজ্ঞতা কেমন?

দেখুন, আমি লোকসঙ্গীত নিয়ে খুব কম কাজ করেছি, তার মধ্যে আমার প্রথম জীবনের ‘মহুলবনির সেরেঙ’ ছিল। ইদানিং কালে ‘বিসর্জন’, তার পরে ‘বিজয়া’তে লোকসঙ্গীত গানের প্রাধান্য দেখা গিয়েছে। সেই জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে ভাল লাগে। এখানে নজ়রুলগীতি আছে, একটি প্রচলিত লোকসঙ্গীত গান আছে, তার সঙ্গে নতুন একটি গান আছে আর কালিকার একটা গান আছে… আর কৌশিকদার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তো সবসময়েই ভাল। একটু খুনসুটি, একটু… আর কৌশিকদাও তো লেখে… সব মিলিয়ে ব্যাপারটা বেশ ভাল।

 

মানে আপনাদের বন্ধুত্বটা বেশ জমে উঠেছে…

বন্ধুত্ব তো অনেকদিনই হল জমে উঠেছে। আমরা ইনফ্যাক্ট ভাল বন্ধু হওয়ার পরেই ‘অপুর পাঁচালি’ শুরু করি।

 

তা হলে এখন সিনেমা বানানোর কথা ভাবলেই কি গানের ক্ষেত্রে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় আপনার কথাই প্রথমে ভাবেন?

না, একেবারেই না! কৌশিকদার পরের ছবিতেই তো প্রবুদ্ধদা মিউজ়িক করছে। এরকম কোনও ব্যাপারই নেই। আমিই তো বলি যে, এই ছবিতে একে নাও। তবে কৌশিকদার সবচেয়ে বেশি ছবির গান যে করেছে, সেটা আমি। কিন্তু এরকম কোনও মানে নেই যে, সব ছবি আমাকেই করতে হবে!

 

আপনার অবসর মানেই কি গান?

আমার অবসর কাটে শুয়ে। আমার ছেলে ফিরনি, তার সঙ্গে খেলে, সিনেমা দেখে…

আর খেতে তো খুব ভালবাসেন…

চেহারা দেখে তো তাই মনে হয়…