magazine_cover_12_June_19.jpg

Tolly Interview

বাংলা সিনেমায় ভাল লেখকের খুব অভাব: হিরণ চট্টোপাধ্যায়

hiran-big নতুন ছবি ‘জামাই বদল’ এবং সিনেমা সম্পর্কে নিজের ধ্যানধারণা নিয়ে আনন্দলোকের সঙ্গে কথা বললেন অভিনেতা হিরণ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর মুখোমুখি তিতাস চট্টোপাধ্যায়

 

২০১৭-এ ‘জিও পাগলা’। তারপর ২০১৯-এ ‘জামাই বদল’। আবারও পরিচালক রবি কিনাগি। কেমন লাগছে?

খুব ভাল লাগছে। রবি কিনাগির সঙ্গে এর আগে ‘ভালবাসা ভালবাসা’, ‘জামাই ৪২০’, ‘জিও পাগলা’ করেছি। এখন ‘জামাই বদল’ করলাম। তো… এটা চার নম্বর ছবি রবিজীর সঙ্গে। ওঁর সঙ্গে কাজ করতে পারাটা সৌভাগ্য। চারটে ছবি করে অনেক কিছু শিখলাম, জানলাম। আজকে আমি যা, তার অনেক কিছুই রবিজীর জন্য। উনি আমার জীবনে একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।

 

২০১৫-র ‘জামাই ৪২০’ সিনেমাটার সঙ্গে কোনও লিঙ্ক রয়েছে কি?

না, কোথাও কোনও মিল নেই। সম্পূর্ণ আলাদা প্লট। তবে ওটাতেও সোহম ছিল, এখানেও সোহম আছে! এটাই মিল! (হাসি)

 

হিরণ্ময় থেকে হিরণ— জার্নিটা কেমন ছিল? নাম বদল করলেন যে?

আমার নাম তো হিরণ্ময় ছিল, এখনও আছে। কিন্তু হরদা ‘নবাবনন্দিনী’ করার সময় বলেছিলেন, “হিরণ্ময় নামটা তো একটু বড়, তো নামটাকে একটু ছোট করব? তোর কোনও আপত্তি আছে?” আমি বলেছিলাম, ‘‘না না, কোনও আপত্তি নেই।’’ হরদা অনেক নাম খুঁজেছিলেন। কোয়েলও আমাকে অনেক নাম মেসেজ করে পাঠিয়েছিল। কিন্তু তারপর হরদা বললেন, “না রে, বরং ‘ময়’-টা বাদ দিয়ে হিরণটা রাখি। সেটাই বরং ভাল হবে।” ব্যস, সেই থেকে এটাই চলছে।

 

কলেজে পড়াকালীন এন টি ওয়ান স্টুডিয়োতে দেখা করার সময় তরুণ মজুমদার আপনাকে বলেছিলেন— “ফিল্ম কেরিয়ারটা খুব আনসার্টেন”! ১২ বছর পার করে ফেলেছেন ইন্ডাস্ট্রিতে। এখন আপনার কী মনে হয়?

হ্যাঁ, ওই মুহূর্তে আমার খুবই খারাপ লেগেছিল। কষ্টও পেয়েছিলাম। পরে বিষয়টা বুঝেছিলাম। উনি বলেছিলেন, “তোমার বাড়িতে কে আছে?” তখন তো আমার বাবা-মা দু’জনেই মারা গিয়েছেন। আমি সুকিয়া স্ট্রিটের একটা অনাথ আশ্রমে থাকি। সেটা জেনে উনি বলেছিলেন, “তোমার তো নিজের থাকা-খাওয়ারই কোনও ঠিক নেই। সিনেমালাইনটা কিন্তু পুরো অনিশ্চিত ইন্ডাস্ট্রি। এখানে তুমি কী করবে? এখানে একটা ব্যাক-আপ লাগে।” আমি ইংরেজি অনার্সের ছাত্র। উনি বললেন, “আগে ভাল করে পড়াশোনাটা শেষ করো। চাকরি-বাকরি করো। তারপরে একবার ট্রাই করো, তোমার যদি লাক থাকে ডেফিনিটলি ইউ ডু সামথিং।” পরে ২০০৮-তে যখন ‘ভালবাসা ভালবাসা’ সিনেমার জন্য রামোজি ফিল্ম সিটিতে শুট করছিলাম, তখন ওখানে তরুণবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ওঁকে বলেছিলাম , ‘‘স্যার মনে আছে?’’ বললেন, “হ্যাঁ,হ্যাঁ মনে পড়েছে। বাহ্! খুব ভাল লাগল!”

 

অভিনয় করার এই নেশাটা কবে থেকে পেয়ে বসল? কোনও ইন্সপিরেশন?

উত্তমকুমার আর মিঠুন চক্রবর্তী। এই দু’জনের অভিনয় আমাকে ইন্সপায়ার করত। এঁদের জীবন ও স্ট্রাগল সম্পর্কে পড়েছিলাম। সেটা আমাকে খুব তাড়া করে বেড়াত। আমার নিজের জীবনের মা-বাবা না-থাকার একটা যন্ত্রণা ছিল। চাকরি জয়েন করার পর মনে হল জীবনের অনেক কিছু পেয়ে গিয়েছি, এখন তো কিছু হারানোর নেই। সুতরাং, রিস্ক নিয়ে চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। তাই কী হবে ভাবিনি। কোয়েলও বারবার বলেছিল সিনেমা না চললে ডিপ্রেসড না হতে। ‘নবাবনন্দিনী’ ক্লিক না করলে, দ্বিতীয় ছবি পেতামও না।

 

মুম্বইতেই চাকরি করতেন। বলিউডে ট্রাই করলেন না কেন?

বলিউড খুব কঠিন ঠাঁই। আমি যে-সময়টা ওখানে ছিলাম (২০০৩-২০০৭), তখন তো কাস্টিং এজেন্সি ছিল না। পরিচালক-প্রযোজকের সঙ্গে পরিচয় থাকতে হত। এখন কাস্টিং ডিরেক্টর এসেছে। কাস্টিং এজেন্সি হয়েছে। শাহরুখ খান বাদে আমির খান-সলমন খান-সঞ্জয় দত্ত সকলেরই পরিবার বলিউড ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এখনও রণবীর কপূরের পারিবারিক সাপোর্ট রয়েছে। আর একটা ব্যাপার, টাকাটা খুব বড় ব্যাপার। একজন অজানা ছেলে, তার উপরে টাকা ঢেলে দেওয়াটা খুব চাপের। যেমন, আমি ‘মেহের আলি’ প্রোডিউস করেছি। সেখানে আমিও কিন্তু ভেবেছি একটা নতুন কোনও ছেলের জন্য টাকা ইনভেস্ট করব কি না। তার চেয়ে মনে হয়েছে, আমার নিজের জন্য টাকা লাগাই। লাগল ভাল, না হলে আমার নিজের জন্য পয়সা যাবে, ঠিক আছে।

 

‘মেহের আলি’র পর কি আপনার আরও প্রোডাকশনে যাওয়ার ইচ্ছে রয়েছে?

আসলে আমার মনে হয় বাংলা সিনেমায় ভাল লেখকের সবচেয়ে বড় অভাব। আমি তো বহুদিন ধরে অনেক লেখকদের সঙ্গে কথা বলি। বেশ কিছু ভাল গল্প, উপন্যাস পড়ছি। স্মরণজিৎ (স্মরণজিৎ চক্রবর্তী) আমার বন্ধু, ওঁর একটা উপন্যাস আমাকে দিয়েছে। সায়ন্তনী পূততুন্ডও আমার খুবই ভাল বন্ধু, ওঁর সঙ্গেও এ নিয়ে প্রায়ই কথা হয়। গল্প পেলে আমি পরের ছবিটার স্ক্রিপ্ট নিয়ে ভাবব।

 

তার মানে আপনি কি সাহিত্যনির্ভর ছবি বানানোর কথা বলছেন?

না, কন্টেন্ট দরকার। সাহিত্য নয়। কনটেন্ট না-হলে আজকে মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা কঠিন। এখানে প্রেম করছি আর ব্যাংককে গিয়ে গান করতে গেলাম… এসব কনটেন্ট মানুষ আর নিচ্ছে না।

 

তা হলে আপনাকে আমরা অন্যধারার ছবিতে পাচ্ছি না কেন?

না, আমি তো ‘মেহের আলি’ করলাম। আগে ‘জ্যাকপট’ করেছি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। আমি নিজে অন্যরকম ছবি করার প্ল্যান করছি। ভাল গল্প পেলে সেটা সম্ভব হবে।

 

দর্শক কি বদলে যাচ্ছে? বিশেষত কলকাতার দর্শক?

না, আমরা ভাল ছবি দিতে পারছি না। ভাল গল্প দিতে পারছি না। ‘বধাই হো’, ‘অন্ধাধুন’ এই ধরনের ছবি হচ্ছে বম্বেতে! ‘অন্ধাধুন’-এর লেখক অরিজিতদা আমার খুব ভাল বন্ধু। ওর সঙ্গেও আলোচনা করি। অরিজিতদা বলেন, শ্রীরাম রাঘবন বলেই দিয়েছিলেন, ভাল গল্প না-হলে ছবি শুরু করবেন না। এতদিন পরে একটা ছবি করলেন। সুজিতদার (সুজিত সরকার) সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। ‘ভিকি ডোনার’, ‘স্ত্রী’— এই ছবিগুলোর বাজেট কত? খুবই সামান্য! একটা ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম, একটা বাড়ি, কয়েকটা মাত্র চরিত্র। কিন্তু গল্প এমন জায়গায় নিয়ে চলে যাচ্ছে, এক-একটা কনটেন্ট মানুষকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। তার চেয়েও বড় ব্যাপার, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে আ়ঞ্চলিক ছবি চলে প্রাইমটাইমে। আমাদের এখানে তো হিন্দি ছবি এলে, সেটাকেই প্রাইমটাইমে চালানো হয়।

 

একসময় বলেছিলেন ইন্ডাস্ট্রিতে একমাত্র বন্ধু ‘হিট’। এখন কী বলবেন?

নিশ্চয়ই। হিট না হলে সত্যিই পাশে কেউ থাকে না। সেটা যে-কোনও পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রেই সত্যি। তবে আমার মনে হয় না, কোনও অভিনেতার একার ক্ষমতা আছে সিনেমা হিট করানোর। সিনেমায় একাধিক স্টার থাকলেও, কনটেন্ট ভাল না হলে সিনেমা চলবে না। অমিতাভ-আমিরের বড় ব্যানারের ছবি, ট্রেলার দেখেই মনে হচ্ছিল ছবিটা চলবে না। এবং সত্যিই ছবিটা চলেনি। ডিরেক্টর আসলে গল্পটাই বলতে পারেননি।

 

পরিচালনায় আসার ইচ্ছে রয়েছে?

এখনও ভাবিনি। যদি কোনও গল্পের সঙ্গে কানেক্ট করতে পারি, যদি মনে হয় গল্পটা আমি ভাল বলতে পারব, তা হলে করতেও পারি। শেখর কপূর যখন প্রথম সিনেমা ‘মাসুম’ করেছিলেন, তখন তিনি রাইট-লেফ্‌ট, ক্যামেরার পজ়িটিভ-নেগেটিভ জানতেন না। কিন্তু তিনি বলেছিলেন “আমি একটা গল্প বলতে জানি”। ওঁকে সকলেই ক্রিটিসাই‌জ় করেছিল সিনেমার বেসিক, এডিটিং না জেনে সিনেমা করার জন্য। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি গল্প বলতে জানাটা আসল। আমি যদি সেরকম কোনও গল্প পাই, নিশ্চয়ই পরিচালনায় আসব।

 

সাম্প্রতিককালের কোনও ভাল লাগা বাংলা ছবি?

(একটু ভেবে) এই মুহূর্তে আমার রাজের ছবিটা খুব ভাল লেগেছে। ‘অ্যাডভেঞ্চারস অফ জোজো।’ রাজ আমাকে যখন ওঁর ট্রেলারটি দেখিয়েছিল, তখনই আমি বলেছিলাম “বস, এটা অন্যধরনের ট্রেলার। খুব ইম্প্যাক্টফুল। পুরো ছবিটা যদি এইরকম হয়, তা হলে এটা মানুষ কানেক্ট করবে, মানুষ দেখবে।” আর দর্শকদের খুব ভাল লেগেছে ছবিটা।

 

নিজের বিবাহিত জীবনেকে মানুষের কাছে থেকে দীর্ঘদিন লুকিয়ে রাখার কারণ কী ছিল?

আসলে আমি বিশ্বাস করি অভিনয়টা আমার প্রফেশন। যাঁরা অন্য প্রফেশনের, তাঁরা ঠিক যেভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ওয়র্ক স্পেসে আনতে চান না, আমিও ঠিক তাই। তাই ব্যক্তিগত যেটা, সেটা ব্যক্তিগতই থাক! (হাসি)