magazine_cover_27_june_17.jpg

Anandalok Interior

আমি সাংঘাতিক অগোছালো: অনুরাগ বসু

anuraag
বিকেল পাঁচটা মানেই এই বাড়িতে মুড়ি নিয়ে মহাভোজ! সঙ্গে কখনও বাড়িতে তৈরি তেলেভাজা, কখনও বা শশা, পেঁয়াজ, চানাচুর…চা তো আছেই। মুড়ি-তেলেভাজার কথা শুনেই উত্তর কলকাতা মনে হচ্ছে তো! না, এই বাড়ি উত্তর কলকাতাতে তো নয়ই, জিওগ্রাফিক্যাল লোকেশন মানলে, কলকাতা থেকে প্রায় দেড়-দু’হাজার কিলোমিটার দূরে! মুম্বইতে। তবু, এ যেন এক টুকরো কলকাতাই। বাঙালিআনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বাড়ির আনাচে-কানাচে। কবিগুরু থেকে সুনীল-শীর্ষেন্দু, ঘটি-বাঙালের লড়াই থেকে ফুটবল-ক্রিকেট নিয়ে ধুন্ধুমার তর্ক, কী নেই এখানে! বাড়ির মালিকের নাম, অনুরাগ বসু।

anuraag_2গোরেগাঁওয়ের ‘বসন্ত গ্যালাক্সি’র ৩,০০০ স্কোয়্যার ফুটের এই ফ্ল্যাটে অনুরাগ থাকেন সপরিবারে। বায়োলজিক্যালি অনুরাগ ‘হম দো, হমারে দো’ স্লোগান মেনে চলেন বটে, কিন্তু বসন্ত গ্যালাক্সির ফ্ল্যাটে তাঁর ‘পরিবার’ বেশ বড়। কারণ, এখানেই থাকেন তাঁর মা, ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী আর তাঁদের ছোট্ট মেয়ে।
বাড়ি জমজমাট না হলে আড্ডাটা কি আর জমাটি হয়!
অনুরাগের সংসারের ছবি তুলতে যখন গোরেগাঁওয়ের ফ্ল্যাটে হাজির হলাম, তখন বিকেল পাঁচটা দশ। রুটিনমাফিক বসে গিয়েছে মুড়ির আসর। সঙ্গে কাপ নয়, ঢাউস মগে চা এবং দেদার আড্ডা। আড্ডার মধ্যমণি অবশ্যই অনুরাগ। আমরা আসায়, কোনও বাড়তি ফর্মালিটিজ় নয়, সটান মুড়ির বাটি এগিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন অনুরাগ, “নেবেন নাকি একমুঠো?” এই না হলে বাঙালির আতিথেয়তা, আন্তরিকতা! রোজ এই সময় বাড়িতে থাকেন নাকি? একমুঠো মুড়ি মুখে ফেলে চিবোতে-চিবোতে অনুরাগ বললেন, “শুধু এই সময় কেন? কাজ না থাকলে বেশিরভাগ সময় আমাকে বাড়িতেই পাবেন। আমি একটু ঘেতো টাইপ কিনা!”
মুখে নিজেকে ‘ঘেতো’ বললেন বটে, কিন্তু বাড়িতে থাকলে তিনি সাংঘাতিক অ্যাক্টিভ! এতটাই যে, স্ত্রী তানির অনেক কাজ তিনি নিজেই করে দেন! বিশেষ করে রান্না। এমনিতে অনুরাগ রাঁধতে খুব ভালবাসেন, খেতেও। নিজের ইচ্ছেমতো রান্না তিনি প্রায়শই করে থাকেন। এর উপর আছে স্পেশ্যাল অর্ডার! “তানি, মা, প্রায়ই আমার কাছে ভিন্ন-ভিন্ন পদ ডিম্যান্ড করে। এই সপ্তাহে মেক্সিকান, তো পরের সপ্তাহে ইতালিয়ান। আসলে, কনটিনেন্টালটা আমি বেশি ভাল রাঁধি,” বললেন অনুরাগ। পাশে বসেছিলেন তানি, স্বামীর পিঠ চাপড়ে বললেন, “শুক্তোটাও তুমি খারাপ রাঁধ না। এই দেখো, বলতে গিয়ে মনে পড়ল, ওটা কিন্তু বহুদিন খাওয়াওনি!” বিদেশে যখন যেখানে যান, সেখান আর কিছু কিনুন বা না-ই কিনুন, অনুরাগ মশলা কিনবেনই। এক্কেবারে দেড়-দু বছরের স্টক তুলে আনেন! না হলে বউয়ের পিঠ চাপড়ানি আর জুটবে কী করে!
তবে শুধু প্রশংসা নয়, স্বামীর কড়া সমালোচনাও শোনা গেল তানির মুখ থেকে, “আলটিমেট অগছালো বলতে যা বোঝায়, অনুরাগ ঠিক তাই! ফার্স্ট জানুয়ারি ও পয়লা বৈশাখ, প্রতি বছর এই দিনগুলোতে ঘটা করে রেজ়লিউশন নেয়, ‘এবার থেকে আর অগোছালো থাকব না’, কিন্তু দিন-দুই যেতে না-যেতেই, কোথায় রেজ়লিউশন আর কোথায় ও নিজে! ঘর গোছানোর কাজে ভুলেও হাত লাগায় না। মায়, নিজের জামাকাপড়টা পর্যন্ত ঠিক জায়গায় রাখে না। ভেজা তোয়ালেটা তো হাজার বারণ করা সত্ত্বেও খাটের উপরই রাখবে!”
anuraag_3এই বিষয়ে কী বক্তব্য অনুরাগের? “স্ত্রীর অভিযোগ মুখ বুজে মেনে নেওয়া ছাড়া স্বামীদের আর কী-ই বা বলার থাকতে পারে!” গলার সুর নরম করে জবাব দিলেন পরিচালক। বোঝা গেল, তানি-অনুরাগের সম্পর্কটা ঠিক কতটা টক-ঝাল-মিষ্টি। অনুরাগের পরের খোঁচাটায় সেটা আরও পরিষ্কার হল, “আসলে প্রথম জীবনে ও তো আমার বস ছিল। ওর আন্ডারেই একটা এনজিওতে প্রথম প্রজেক্ট করেছিলাম। সেই থেকে, বসিং টেন্ডেনসিটা আর ছাড়তে পারেনি!”
তানি অনুরাগের প্রথম আলাপ ১৯৯৮ সালে। আর বিয়ে? ২০০৩-এ এসে। বলাই বাহুল্য, লাভ স্টোরি। কিন্তু অনুরাগের কথায়, “বিয়ের আগে আমাদের কম করে ছ’ থেকে সাতবার ব্রেক আপ হয়েছে!” নিজেদের ভিতরের এই ছোটখাটো ঝামেলাগুলো কি কখনও উঠে এসেছে সিনেমার পর্দায়? ‘না’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন অনুরাগ, কিন্তু প্রশ্নটা প্রায় লুফে নিয়ে তানি বললেন, “তা আবার থাকবে না! ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’য় কে কে মেনন ও শিল্পা শেট্টির এসএমএস নিয়ে ঝামেলার সিনটা মনে আছে? ওটা আমাদেরই গল্প! সময়ে-অসময়ে অনুরাগের কত এসএমস যে আমার কাছে ধরা পড়েছে!”
রান্না-বান্না ছাড়া অনুরাগের ফেভারিট পাস টাইম তানির পিছনে লাগা! অভিযোগের সুর গলায় নিয়েই তানি বললেন, “আগে ও একা আমার পিছনে লাগত। এখন মেয়েদের নিয়ে দল পাকিয়েছে। সবাই মিলে আমাকে যে কী জ্বালাতন করে, কী বলব!”
তানিকে মাঝেমধ্যে চমকে দিতে বড্ড ভালবাসেন অনুরাগ। তানি নিজেও সেটা বেশ উপভোগ করেন। না, দামি গিফ্ট দিয়ে চমকে দেওয়া নয়, নিজের আচমকা আগমনই এক্ষেত্রে অনুরাগের হাতিয়ার। তানি বলছিলেন, “ও তো খুব ট্র্যাভেল করে। মরিশাস থেকে হয়তো সকালেই আমাকে ফোন করে বলল, ‘অনেক চেষ্টা করে দেখলাম, পরশু রাতের আগে কিছুতেই ফিরতে পারছি না গো!’ স্বভাবতই আমি মন খারাপ করে বসে রইলাম। ও মা, রাত সাড়ে এগারোটায় দেখি কলিং বেল বাজাচ্ছে! একবার তো আমাদের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারির দিনেও এমনটাই করেছিল! সত্যি বলছি, গিফ্টের চেয়ে এই ধরনের সারপ্রাইজ় আমার অনেক বেশি পছন্দের।”
ঈশানা-অহনার (অনুরাগের দুই মেয়ে) সঙ্গে খুনসুটি করে দিনের অনেকটা সময় কাটে ‘কাইটস’-এর পরিচালকের। ইশানার বয়স এখন ছ’ বছর, অহনার সাড়ে তিন বছর। মেয়েদের হোমওয়র্ক করান না বটে, তবে রোজ স্কুলের বাসে তুলতে অনুরাগ নিজেই যান! মেয়েদের বকাবকির কোনও বালাই নেই, বরং শুনলে অবাক হবেন, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মেয়েদের উত্‌সাহ দেন দেওয়ালে আঁকিবুকি কাটতে! আর বাবার আশকারা পেলে যা হয়। বাড়ির কোনও নির্দিষ্ট দেওয়াল নয়, সারা বাড়ি জুড়েই চোখে পড়ে ইশানা-অহনার শিল্পকর্ম! শুধু একটা ব্যাপারে অনুরাগ মোটেই অগোছালো নন। নিজের কাজের জিনিসগুলো মেয়েদের দুরন্তপনার পাল্লায় পড়ে বেপাত্তা না হয়, সেই দিকটা বরবরই নজরে থাকে তাঁর। “আসলে অনুরাগ খুব কনশাস বাবা। বাচ্চাদের সঙ্গে টাইম স্পেন্ড করে খুব কনশাস ওয়েতে। ওরা কখন কী ধরনের বিষয়ে আনন্দ পায়, সেটা খেয়াল রাখে সব সময়,” স্বামীকে ‘ভাল বাবা’র দরাজ সার্টিফিকেট দিলেন তানি।
এর বাইরে সিনেমা দেখতে যাওয়া, দেদার শপিং, বছরে অন্তত একটা পারিবারিক ট্রিপ…সেসব তো আছেই। গোরেগাঁওয়ের ফ্ল্যাট ছাড়া অনুরাগের আরও একটা আস্তানা আছে। মালাডে। ওপেন টেরেস সহ একটা দু’ কামরার ফ্ল্যাট। আদতে ওটা অনুরাগের অফিস, কিন্তু বন্ধুবান্ধব নিয়ে জমাট আড্ডার আসর মূলত ওখানেই বসে। সঙ্গীত পরিচালক প্রিতমসহ অনুরাগের কাছের বন্ধুরা সময় পেলেই চলে আসেন এখানে। কাজের সঙ্গে গান, গানের সঙ্গে আড্ডা, আড্ডার সঙ্গে ভরপুর খাওয়া-দাওয়া…সব মিলিয়ে এক মজাদার ককটেল। শুধু অনুরাগ নন, ওঁর পুরো ফ্রেন্ড সার্কলটাই ফুডি। অনুরাগ তো বলেই দিলেন, “আমার ইউনিটে নতুন কোনও ছেলে কাজ করতে এলে আগে দেখে নিই খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে তার ইন্টারেস্ট আছে কিনা। যদি না থাকে, ১০ নম্বর ওখানেই কাটা গেল!”
ওপেন টেরেসে নিজের হাতে একটা ছোট্ট বাগানও বানিয়েছেন অনুরাগ। রোজ নিয়ম করে এসে জল দেন, শুকনো পাতা ফেলে গাছের পরিচর্যা করেন, প্রবল হাওয়ার ঠেলায় ভেঙে যাওয়া টব সরিয়ে গাছগুলোকে দেন নতুন আস্তানা… ঠিক যেমন করে স্ট্রাগলের দিনগুলিতে আগলে রাখতেন নিজের ইচ্ছেগুলোকে!