magazine_cover_12_september_17.jpg

Tolly Interview

লোকটা উন্মাদ নাকি যে, দু’ পয়সার থিয়েটারের জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছে: দেবশঙ্কর হালদার

deb4থিয়েটার সব সময়ই তাঁর প্রথম পছন্দ। এটি নিয়েই তিনি বাঁচেন। দেবশঙ্কর হালদার খুললেন মনের দরজা। সাক্ষী থাকলেন সায়ক বসু

 

‘মুক্তধারা’ থেকে ‘অ্যাক্সিডেন্ট’ হয়ে ‘অলীক সুখ’, শিবপ্রসাদ-নন্দিতার সঙ্গে দেবশঙ্করের জুটির কাজের হ্যাটট্রিক হয়েই গেল তা হলে?
(হাসি) ভাল বলেছেন। হুম, তা হল। আসলে ‘হ্যাটট্রিক’ শব্দটার মধ্যে একটা আনন্দ-উচ্ছাস আছে তো। ফলে শুনতে খারাপ লাগে না। যদিও আমি ব্যাপারটাকে ঠিক ওভাবে দেখি না। ছবি তো এর আগেও করেছি, কিন্তু শিবু-নন্দিতার সঙ্গে আমার একটা সৃষ্টিশীল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আর সেই সৃষ্টিশীলতার জায়গা থেকে বলতে পারেন, একটা দায়বদ্ধতাও তৈরি হয়েছে। ফলে কাজ করতে ভাল তো লাগেই, সুবিধেও হয়।

 

এই সম্পর্ক কি অন্য পরিচালকদের সঙ্গে তৈরি হয়নি? লোকে বলে, আপনার কাছে নাকি প্রচুর সিনেমার অফার আসে। কিন্তু আপনি নাকি সটান ‘না’ বলে দেন!
ঠিকই বলে। কিন্তু ব্যাপারটা সম্পর্ক তৈরি হয়নি বলে নয়, আমি থিয়েটার বেশি করি, তাই। ২৭-২৮ বছর ধরে এই শিল্পের সঙ্গেই লেগে আছি, তাই এটাই আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি। নাটককে অবহেলা করে ছবি করার কথা কখনওই মনে হয়নি। তবে সিনেমা করার ইচ্ছে যে নেই, তা নয়। বলতে লজ্জা হয় আবার ভালও লাগে, এই মুহূর্তে বাজারে আমার করা অন্তত ২০টি নাটক চলছে! জানি না, এটি বিশ্বের অন্য কোনও থিয়েটার শিল্পীর ক্ষেত্রে হয়েছে কিনা! এখনও আমার সব শো-ই প্রায় হাউজ়ফুল হয়। মানুষের এই ভালবাসা তো অস্বীকার করতে পারি না। আসলে কী জানেন, কোনও ছবি করলে তার জন্য টানা দু’ মাস শুটিং করতে হবে। তার সঙ্গে নাটকের ডেট ক্ল্যাশ করলে, ‘আমাকে ছেড়ে দিন, ওদিন পারব না, শো আছে’ টাইপের বায়নাও করতে হবে। সেটা পারব না। সিনেমার লোকেরা হয়তো ভাবতে পারেন, ‘লোকটা উন্মাদ নাকি যে, দু’ পয়সার থিয়েটারের জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছে!’ কিন্তু কী করব বলুন, নাটক যে আমার রক্তে মিশে গিয়েছে! এটা নিয়েই তো বাঁচি। এখন যদি এমন হয় যে, আমার হাতে এক মাস কোনও থিয়েটারের কাজ নেই, সেই সময় কোনও ভাল ছবি এল, নিশ্চয়ই করব। কিন্তু এটাও ঠিক, থিয়েটারে আমি ফিরবই। অনেকেই ভাবেন, থিয়েটার শিল্পীরা সিনেমায় চলে গেলে আর ফিরে আসেন না বুঝি। কিন্তু আমি বলতে চাই, নাটক সারা জীবন আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটিই থাকবে। অনেক সময় ভেবেছি, অনেক নাটক কালের নিয়মে হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা হয়নি। যেমন ধরুন, ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ প্রায় ১০-১২ বছর ধরে চলছে! এখনও লোকে দেখতে ভিড় করে। এসব ছেড়ে যাই-ই কী করে? থিয়েটার করে রাতে এসেও ছবির শুটিং করা যায়। শিবু-নন্দিতার ক্ষেত্রেই সেটা করেছি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, সেটা সকলের ক্ষেত্রে পারব না। একে আবার আমার অহঙ্কার বলে ভাববেন না যেন!

 

একথা বলা হয় যে, নাট্য ব্যক্তিত্বরা বড় পর্দায় অভিনয় করলে, তাতে আদতে সিনেমারই উন্নতি হয়। বিজন ভট্টাচার্য থেকে উত্পল দত্ত, চন্দন সেন থেকে কৌশিক সেন, সকলে তা-ই করেছেন! আপনার কখনও মনে হয় না যে, বাংলা ছবির উন্নতির জন্য আপনার আরও বেশি ছবি করা উচিত?
এই রে, এত বড় দায় নেওয়ার যোগ্যতা আমার আছে কিনা, কে জানে! আমি ছবিতে কাজ করলে নিজের জন্যই করব। আসলে দুটোই তো অভিনয়। ফলে অন্য কিছু চেনার জন্য, সেটাকে বোঝার জন্য, তা করাই যায়। কিন্তু অনেক সময় এমন সব আজগুবি ছবির অফার আসে যে, বুঝতে পারি না, কী করব! আসলে ছবির ভাল-মন্দ তো আমরা বুঝি না। কিন্তু মিডিয়ামটার একটা আকর্ষণ আছে। ‘অলীক সুখ’-এর কথাই ধরুন না। যে ডাক্তারের চরিত্রে আমি অভিনয় করছি, সেটা তো আমার চেয়ে একেবারে অন্যরকম! কিন্তু অফারটি পেয়ে মনে হয়েছিল, দেখি না, কীভাবে ‘ডাক্তার’কে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারি। আর বলতে বাধা নেই, শিবু-নন্দিতার তরফ থেকে নিজের মতো করে অভিনয় করার পূর্ণ আশ্বাস পেয়েছি।

 

‘দেবশঙ্কর হালদার’ নামটা যেন বর্তমানে বাংলা থিয়েটারে ‘লিভিং লেজেন্ড’-এর পর্যায়ে পৌঁছেছে। একসঙ্গে ২০টি নাটক, সাত-দশ দিন ধরে আপনার নামে ‘নাট্য উত্সব’, দুপুরের একটা নাটকে একটা চরিত্র, তো বিকেলে সম্পূর্ণ বিপরীত একটি চরিত্র…সামলাচ্ছেন কী করে?
কমিটমেন্ট দিয়ে। আসলে নাটক ব্যাপারটা চূড়ান্ত ভালবাসি তো, ফলে সেটাও আমায় এই সম্মান ফেরত দেয়। আর একসঙ্গে অনেকগুলো নাটক করার কথা বলছেন? এগুলো তো তৈরি হয়েই আছে। আমি আসলে একটাই নাটক করছি। আর সেটা জীবনবোধের নাটক। একজন মানুষ যখন বাড়ি থেকে বেরোন, তারপর যখন দুর্ঘটনার মুখে পড়ে, তখন তো পরিস্থিতি অনুযায়ী রিঅ্যাক্ট করেন। আমার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়। যখন আবহসঙ্গীত বাজে, মেকআপ করি, লাঠি হাতে নিই বা মুকুট পরি, তখন ভিতর থেকেই যেন হয়ে ঠিক হয়ে যায়, আমি কোন চরিত্র! সঠিক রিঅ্যাকশনটা বেরিয়ে আসে।

 

অভিনয়ের ক্ষেত্রে আপনার রোল মডেল কেউ আছেন?
আমি হঠাত্ করে থিয়েটারে এসে পড়েছি। বলতে পারেন, আসার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। ফলে সেভাবে কোনও রোল মডেল নেই। সারা জীবনে প্রচুর গুণী মানুষের থিয়েটার দেখেছি। আর তাঁদের ভালটা নিয়েছি। বিশাল কিছু করে ফেলেছি, এমনটা নয়। কিন্তু এটা মানি যে, এঁরা আমার জন্য জমি ঊর্বর করেছেন, আমি তাতে ফসল ফলাচ্ছি মাত্র।

 

‘হঠাত্’ করে কেন?
জানেন, আমার জীবনে প্রচুর বাঁক আছে। আমার বাবা অভয় হালদার যাত্রা করতেন বলেই বোধ হয়, অভিনয়ের প্রতি আমার তেমন কোনও আকর্ষণই ছিল না। ছোটবেলায় ফুটবল খেলতাম। ভাবতাম, শ্যাম থাপা হব! তারপর যখন হায়ার সেকেন্ডারি পড়ি, তখন বন্ধুদের সঙ্গে লিট্ল ম্যাগাজ়িন বের করতাম। তারপর দেখলাম, তাতেও খিদে যেন মিটছে না! স্কটিশ চার্চ কলেজে ছাত্র রাজনীতি করতাম। জি এসও হয়েছিলাম। কিন্তু কলেজ ছাড়ার পর যেন একটু অন্যরকমই লাগতে শুরু করেছিল। চাকরি কোনওদিনই করতে চাইনি। একদিন ‘নান্দীকার’ নাট্যদলের একটি ওয়র্কশপের বিজ্ঞাপন দেখে সেখানে চলে যাই এবং ঘটনাক্রমে চান্সও পেয়ে যাই! তারপর তো এত দিন কেটে গেল নাটক করেই। তবে নাটক করছি মানে, এটাই আমার বার্ধক্যের বারাণসী, এমন ভাববেন না কিন্তু! আমি এখন আনন্দ পাচ্ছি বলে করছি। যেদিন পাব না, সেদিন জমিতে ধান বুনব বা ট্যাক্সি চালাব!

 

‘নান্দীকার’-এ থাকলে নাকি অন্য কোনও দলে নাটক করা যায় না? কিন্তু আপনি তো সেখানকার সম্পাদক হয়েও দিব্যি বিভিন্ন দলের হয়ে নাটক করছেন! সমস্যা হয় না?
আগে সব দলেই এরকম নিয়ম ছিল বটে। কিন্তু এখন অনেক শিথিল হয়েছে। খেয়াল করলে দেখবেন, অনেক আগে ‘নান্দীকার’ ছাড়াও অনেক বড় দলই, বাইরে থেকে আর্টিস্ট এনে নাটক করাত। ফলে এটা নতুন কিছু নয়। হ্যাঁ, আমি ঘটনাচক্রে ব্যাপারটা শুরু করেছি বটে, কিন্তু তারপর তো অনেকেই করছেন! তবে এটা বলতে পারি, ‘নান্দীকার’ এখনও আমার দল এবং তারাই আমার প্রথম এবং প্রধান পছন্দ।

 

অন্য প্রসঙ্গে যাই। দেবশঙ্কর বাড়িতে থাকলে কী করেন?
আরে, বাড়িতে থাকার তেমন সময়ই তো পাই না। থাকলে, স্ত্রী এবং ছেলের সঙ্গে গল্প করতে চেষ্টা করি, যদি তাঁরা করতে চান, তা হলে (হাসি)! এছাড়া খুব গান শুনি আর কবিতা পড়ি। আর খেলাধুলো করি। উত্তর কলকাতায় যে পাড়াটায় আমি থাকি, সেটা অসাধারণ। এখনও খেলাধুলো হয়, আড্ডা হয়। ঝগড়াঝাঁটি থেকে শুরু করে বিপদে দৌড়ে যাওয়া…সব পাবেন!

 

আপনার স্বপ্নের চরিত্র….
একটা কথা আমি খুব বিশ্বাস করি। স্বপ্ন যেখানে আছে বলে ভাবছেন, সেখানে আসলে স্বপ্ন নেই! আছে সেখান থেকে আধ বিঘত দূরে! আর স্বপ্ন হঠাত্ করেই পূরণ হয়।