magazine_cover_12_october_17.jpg

 

Home review detail জীবনের দঙ্গল, দঙ্গলের জীবন

জীবনের দঙ্গল, দঙ্গলের জীবন

দঙ্গল
dangal-still
পরিচালক: নীতেশ তিওয়ারি
অভিনয়: আমির খান, সাক্ষী তনওয়ার, ফাতিমা শেখ, সানিয়া মলহোত্র, জ়ায়রা ওয়াসিম, সুহানি ভটনাগর প্রমুখ

এবছর ঈদে সলমন খানের ‘সুলতান’ বেরনোর পর অনেকেই ভেবেছিলেন, ‘দঙ্গল’ রিলিজ় করতে আমির হয়তো দেরি করে ফেললেন। রেসলিং এমন একটা খেলা, যা পঞ্জাব-হরিয়ানার বাইরে এখনও সেভাবে উন্মাদনা তৈরি করতে পারেনি। এবছরই অলিম্পক্সে ফোগত বোনেদের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা সাক্ষী মালিকের অবিশ্বাস্য পদকজয় দেখেছে দেশবাসী, ফোগত বোনেরা যতই মহিলা রেসলিংয়ের মুখ হয়ে উঠুন না কেন, সাধারণ মানুষের অ্যান্টেনায় তাঁদের কীর্তি অধরাই ছিল। আর সেই অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের গল্পই তুলে ধরলেন পরিচালক নীতেশ তিওয়ারি তাঁর ‘দঙ্গল’ ছবিতে, যে ছবি দেখে স্বয়ং সলমন খানও বলতে বাধ্য হলেন, ‘সুলতান’-এর চেয়ে ‘দঙ্গল’ অনেকটাই এগিয়ে।

dangal-still2

রেসলিংয়ের স্পিরিট, টেকনিক্যাল ডিটেলিং এছবিতে এতটাই নিখুঁতভাবে দেখানো হয়েছে যে রেসলিং সম্পর্কে কিচ্ছু না জানলেও পরবর্তীকালে টিভিতে ম্যাচ দেখলে নিয়মগুলো আপনিও বলতে পারবেন। স্পোর্টস মুভিতে রিসার্চের অভাব, টেকনিকের খুঁত যে ছবির মান কতটা নামিয়ে আনতে পারে, তা হালফিলের প্রচুর স্পোর্টস ফিল্ম বুঝিয়ে দিয়েছে। ‘দঙ্গল’ সেদিক থেকে যথাযথ। গীতা ফোগতের (ফাতিমা) প্রতিটা ঘুঁষি, রেসলিং ম্যাটে আঁছড়ে পড়া যেন দর্শকাসন থেকে অনুভব করা যায়। ‘দঙ্গল’-এর সবচেয়ে বড় পাওনা কিছু অনবদ্য পারফরম্যান্স। মহাবীর সিং ফোগতের স্ত্রীর চরিত্রে সাক্ষী তনওয়ার, ছোট গীতার ভূমিকায় জ়ায়রা ওয়াসিম এবং বিশেষত ছোট ববিতার ভূমিকায় সুহানি ভটনাগর প্রশংসনীয়। ছোট্ট গীতার লম্বা চুল কেটে নেওয়ার মুহূর্তে নিষ্ঠুর বাবার প্রতি তাঁর কাকুতি-মিনতির দৃশ্যে জ়ায়রার অভিনয় মনে রাখার মতো। গীতা-ববিতার জ্যাঠতুতো দাদা ওমকারের (যে কিনা গীতা-ববিতার বেড়ে ওঠার নিঃস্বার্থ গিনিপিগে পরিণত হয়) ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অনমোল চরণ (শৈশব) এবং অপারশক্তি খুরানা (যৌবন)। এই চরিত্রটিই ছবিতে কমিক রিলিফ এনেছে, যা এমন গুরুগম্ভীর ছবিতে খুবই প্রয়োজন ছিল। গীতা ফোগতের লড়াই বা দুই মেয়েকে নিয়ে মহাবীর সিংহের লড়াই কেবলমাত্র পুরুষদের খেলায় মেয়েদের প্রবেশাধিকার নিয়ে নয়। এ লড়াই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের মাথা উঁচু করে বাঁচার লড়াই, এ লড়াই পুত্রকামনায় লালায়িত মহাবীর সিংহের অন্তর্দ্বন্দ্বও বটে। আর সেই লড়াকু, জেদি, নিষ্ঠুর, অথচ কোমল হৃদয় বাবার ভূমিকায় আমির খান নিজের সেরাটুকু দিয়েছেন। তাঁর ওজন বাড়ানো-কমানো নিয়ে ইতিমধ্যে প্রচুর আলোচনা হয়েছে, তাঁর সেই ডেডিকেশন নিয়ে কোনও কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু তিনি যে আদতে ‘মহাবীর’-ই হয়ে উঠেছিলেন, তা পরদায় ফুটে ওঠে। আদরের কন্যা যখন ন্যাশনাল কোচের অধীনে গিয়ে বাবাকে অশ্রদ্ধা করে তখন সেই মেয়ের বিরুদ্ধেই দঙ্গলে নামেন বৃদ্ধ মহাবীর। আর সেই দৃশ্যে শারীরিকভাবে দুর্বল, মানসিক আঘাতে জর্জরিত আমির খানকে দেখলে একটা চাপা কষ্ট হয়। ছাদে পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন মহাবীর, বয়সের ভারে ন্যুব্জ, শুধু সেই দাঁড়ানোটাই অনেক যন্ত্রণার কথা বলে যায়। শেষ দৃশ্যে জাতীয় সঙ্গীত শুনে মেয়ের কমনওয়েল্থ স্বর্ণপদকজয়ের আশ্বাস পাওয়ার মুহূর্তে আমিরের চোখের জল, আপনার চোখেও জল নিয়ে আসতে পারে।

dangal-still1

খুঁত এছবিতে নেই বললে মিথ্যে বলা হবে। গীতার কোচের চরিত্রে গীরিশ কুলকর্নিকে বড্ড বেশি ভিলেন দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে কোচের সামনেই কমনওয়েল্থ-এর মতো মঞ্চে দর্শকাসন থেকে মহাবীরের গীতাকে নির্দেশ দেওয়াও কি খুব পেশাদারিত্বের পরিচয়? তবে এই ছোটখাটো খুঁতগুলো বড্ড জোর করে খুঁজে আনতে হয়, খালি চোখে ধরা পড়ে শুধু গীতাকে ঘিরে মহাবীরের আবেগ। আর দু’বছর ধরে একটিই ছবির পিছনে নিজের সর্বস্ব না দিলে যে ‘দঙ্গল’ জয় করা যেত না, তা প্রমাণ করে দিলেন আমির খান।