Category Archives: review detail

কঙ্গনার জন্য হাঁড়িকাঠে…

সিমরন
simran-still

অভিনয়: কঙ্গনা রানাওয়াত, সোহম শাহ, হিতেনকুমার
পরিচালনা: হনসল মেহতা
……

পছন্দের অভিনেতাকে অনেকেই শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে থাকেন। ‘সিমরন’ ছবিটি দেখলে মনে হয়, এটি কঙ্গনা রানাওয়াতের প্রতি পরিচালক হনসল মেহতার শ্রদ্ধার্ঘ্য। একটু খোলসা করে বলি, এই ছবির প্রতিটি ফ্রেমের নির্মাণের একমাত্র উদ্দেশ্য যেন কঙ্গনার অভিনয়ক্ষমতা প্রদর্শন। অ্যাটলান্টানিবাসী গুজরাতি মেয়ে প্রফুল পটেল (কঙ্গনা) হিলটন হোটেলের হাউজ় কিপিং স্টাফ। তিরিশোর্ধ প্রফুল ডিভোর্সি (তার জন্য দিনরাত রক্ষণশীল মা-বাবার কাছ থেকে গঞ্জনাও কম জোটে না), নিষ্ঠা ভরে নিজের কাজ করে আর মাইনরিটি হাউজ়িংয়ে নিজের জন্য একটি আলাদা বাসস্থান কেনার পয়সা জমায়। কিন্তু জুয়া খেলায় নিজের সমস্ত সঞ্চয় হেরে নিজেই সেই স্বপ্নের শেষকৃত্য সারে সে। তেজারতির কারবারির কাছে গলা অবধি দেনায় ডোবা প্রফুল পাকেচক্রে চুরির রাস্তা নেয়। সন্দীপ কউর নামে এক নার্স, যার নামে কমপালসিভ রবারির অভিযোগ, এই প্রফুল চরিত্রটির অনুপ্রেরণা। কিন্তু দু’মাসে কী-কী অনন্য উপায়ে সন্দীপ ব্যাঙ্ক থেকে চুরি করেছিল, সেগুলো নিয়ে আর একটু রিসার্চ করলেও হয়তো ছবিটি আরও ইন্টারেস্টিং হত। কিন্তু এক্ষেত্রে, পরিচালক যেন দ্বিধায় ছিলেন যে, চরিত্রটিকে গ্লোরিফাই করবেন নাকি কটাক্ষ করবেন। এই ছবির স্ক্রিপ্ট অনেকটাই কঙ্গনার নিজের লেখা (যে কারণে স্ক্রিপ্ট রাইটার অপূর্ব আসরানির সঙ্গে কঙ্গনার বেজায় ঝামেলা। কারণ তিনি চাননি কো-রাইটার হিসেবে কঙ্গনার নাম উঠে আসুক। আর দু’জন স্ক্রিক্ট রাইটারের অন্তর্দ্বন্দ্বটাও স্ক্রিপ্টে স্পষ্ট। কারণ দু’টি অর্ধে ছবির বক্তব্য দু’রকম। একদিকে যেমন ছবিটি একটি সিরিয়াস বিষয়কে লঘুভাবে পরিবেশন করার চেষ্টা করে, অন্যদিকে প্রফুলকে ভিকটিম হিসেবে দেখানোর চেষ্টাও চলেছে নিরন্তর। আর খুব সামান্য কিছু স্মার্ট ডায়লগ বাদে বেশিরভাগ ডায়লগই বেশ গ্যাদগেদে। তবে ৯/১১-এর ওয়র্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের পর আমেরিকানদের সাউথ এশিয়ার লোক এবং নাশকতার প্রতি বোকা-বোকা ভীতিটিকে স্যাটায়ারের মোড়কে তুলে ধরার জন্য পরিচালককে বাহবা জানাতে হয়। কঙ্গনার অভিনয় নিয়ে নতুন করে আর কিছুই বলার নেই। কিন্তু এবার বোধহয় কঙ্গনার উচিত ‘কুইন’-এর ‘রানি’র চরিত্র থেকে বেরোনোর। প্রফুলের চরিত্রটি যেন ‘রানি’ এবং ব্যক্তি কঙ্গনার মিশেল। ‘রানি’র সারল্যও রয়েছে, আবার রয়েছে কঙ্গনার অফস্ক্রিন বোল্ডনেসও। কিন্তু ছবির প্রতিটি ফ্রেমজুড়ে এত কঙ্গনা দেখলে একঘেয়েমি আসতে বাধ্য। কিছু-কিছু দৃশ্য দেখলে তো মনে হয়, কঙ্গনাকে অভিনয়ের জায়গা করে দেওয়া ছাড়া ছবির জন্য দৃশ্যগুলি নিষ্প্রয়োজন। দু’-তিনটি গানও ঢুকিয়েছেন, যা ছবির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় না। এই ছবির শক্তি যদি কঙ্গনা হন, তবে দুর্বলতাও তিনিই।

দুর্বল চিত্রনাট্যের শিকার!

বিলু রাক্ষস
bilu-rakkhosh-still2

অভিনয়: জয় সেনগুপ্ত, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, চান্দ্রেয়ী ঘোষ
পরিচালনা: ইন্দ্রাশিস আচার্য
……

একা একজন মানুষ। একাকীত্বে জর্জরিত। অভিভাবক প্রয়াত, স্ত্রী ছেড়ে চলেছেন। কেন? কারণ তাঁর মধ্যে রাক্ষস বাস করে। চাকরির জাঁতাকলে পড়ে গানবাজনা করতে না পেরে, সেই রাক্ষস বেরিয়ে জীবনের অনেক ক্ষতি করেছে… ছবির এই বিষয়টি আগ্রহ জাগানোর পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু আশা আর বাস্তব তো এক না-ও হতে পারে। বিলু রাক্ষস-এর ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। ছবির শুরুতে বিলুর (জয়) একাকীত্বকে যেভাবে নির্মাণ করেছিলেন পরিচালক, তার রেশ শেষ পর্যন্ত থাকে না। সংসারে শাশুড়ি-বউমা বা স্ত্রীর সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে যে টানাপোড়েনের মধ্যে তাঁকে পড়তে হয়, তার সঙ্গে কেন জানা নেই, দর্শক একাত্ম বোধ করতে পারেন না। হতে পারে, অভিনয় এর জন্য দায়ী, হয়তো বা দুর্বল স্ক্রিপ্টও। কিন্তু সত্যি এটাই, প্রথম ছবি হিসেবে বিষয়টা ভাল বেছেছিলেন পরিচালক। কিন্তু ট্রিটমেন্টের গলদ থেকে গেল। ছবির ন্যারেটিভ স্টাইল ভাল ছিল। অতীত এবং বর্তমানের অনায়াস চলনে বিলুর জীবনের গল্প ভাল করেই ফুটে উঠছিল। কিন্তু যেটা বোঝা গেল না, তা হল হতভাগ্যের কারণগুলো। যে গানকে ভালবেসে বিলুর জীবনের এই ক্রাইসিস, সেই গানকে তো কখনও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিতে দেখা গেল না বিলুকে! জয় সেনগুপ্তর অভিনয় সাধারণ। স্ত্রী সোহিনীর চরিত্রে কনিনীকা ভাল শুরু করলেও, পরে একটু অতিনাটকীয় লেগেছে। চান্দ্রেয়ী বা বাকিরা দুর্বল চিত্রনাট্যের শিকার। আসলে চরিত্রের উত্থান-পতনটা দর্শকদের মধ্যে জারিত করতে পারেননি পরিচালক। বহুরকমের প্লট-সাবপ্লট এসেছে। তাতে ছবির ফোকাস খানিকটা হলেও সরে গিয়েছে। আর সেটাই এই ছবির দুর্বলতা। শেষের দিকে মামাবাড়িতে গিয়ে বিলুর ইলিউশনটা বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে। ছবির আবহসঙ্গীত ভাল। ক্যামেরার কাজও ভাল। কিন্তু এডিটিংয়ের জোরে ছবিটাকে আর একটু ছোট করা যেত।

শুভ মঙ্গল সাবধান

পরিচালক:আর এস প্রসন্ন
অভিনয়: আয়ুষ্মান খুরানা, ভূমি পদনেকর, সীমা পাওয়া, বিজেন্দ্র কালা

না কাব্য করা আমার উদ্দেশ্য নয়, আমি স্রেফ এক লাইনে ‘শুভ মঙ্গল সাবধান’ ছবিটার মানে বোঝাতে চাইছি। এই ছবিটাও যে আমাদের সমাজের একটি কঠিন বিষয়কে, সহজ করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। ভারতীয় মধ্যবিত্ত সমাজের ‘সেক্স’ শব্দটি নিয়ে ছুৎমার্গের কথাটাই হাসি ঠাট্টার মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন পরিচালক মশাই। দিল্লির ছেলে মুদিত শর্মা (আয়ুষ্মান) প্রেমে পড়ে সুগন্ধার (ভূমি)। কিন্তু কথা বলার সাহস যোগাড় করতে না পেরে একেবারে মাট্রিমনিয়াল সাইটের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। জড়িয়ে পড়ে দুই পরিবার। বিয়ের দিন ঠিক হয়ে যায়। তারপরই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত এসে পড়ে এক সমস্যা। মুদিতের ভাষায় ‘জেন্টস প্রবলেম’। সোজা বাংলায়, বিয়ের আগে দু’জনে ঘনিষ্ঠ হতে গেলে পারফরম্যান্স প্রেশারে পড়ে যায় মুদিত। স্ট্রেসের কারণে মুদিত পিছিয়ে আসে। জানাজানি হয়ে গেলে একদিকে পাত্রপক্ষ চেষ্টা করে পাত্রীর ঘাড়ে দোষ দিতে, অন্যদিকে সমাজের তোয়াক্কা না করে পাত্রীর বাবা তাকে পরামর্শ দেয় পালিয়ে যাওয়ার। বিষয়ভাবনায় অভিনবত্ব আপনাকে মুগ্ধ করবে। দেখতে পাবেন, মধ্যবিত্ত ভারতীয় সমাজের মায়েরা কী সাংঘাতিক দক্ষতায় ‘সেক্স’ কথাটি উচ্চারণ না করেই এর পাঠ বিবাহযোগ্য মেয়েদের দেন। ‘আলিবাবা’, ‘গুফা’, নতুন-নতুন শব্দও শিখতে পারবেন বইকী। ছবির সংলাপ এক কথায় দুর্দান্ত। ছোট্ট-ছোট্ট পান আপনাকে অবাক করে দেবে। হাসতে বাধ্য করবে। সংলাপকে আরও রসালো বানিয়েছেন অভিনেতারা। আয়ুষ্মান আর ভূমি খুব ভাল। ‘দম লাগাতে…’ জমজমাট কেমিস্ট্রি এখানেও চোখে পড়ে। গার্ল নেক্সট ডোরের ভূমিকায় ভূমি একদম পারফেক্ট। কিন্তু ভয় হচ্ছে, পরপর একই ধরণের চরিত্র করতে-করতে টাইপকাস্ট না হয়ে যান তিনি। আয়ুষ্মানও সেই দোষে দোষী হতে পারেন। ‘ভিকি ডোনর’ পর থেকেই আর দিল্লির পঞ্জাবি ছেলের চরিত্রটি ছেড়ে বেরতে পারছেন না। আর হ্যাঁ, ছবি হিসেবে ‘দম লাগাতে…’কেই এগিয়ে রাখতে হবে। তবে সুগন্ধার মায়ের ভূমিকায় সীমা পাওয়া অনবদ্য। কয়েকটি দৃশ্যে তো জাস্ট ফাটাফাটি। দারুণ অভিনয় করেছেন সুগন্ধার বাবার ভূমিকায় বিজেন্দ্র কালা। আনন্দ এল রাই ঘরানার এই ছবিতেও সেট থেকে অভিনয়, কোথাও কৃত্রিমতা চোখে পড়ে না। পরিচালক আর এস প্রসন্নও যথাযথ চেষ্টা করেছেন ছবিটিকে একদম আলাদা রূপ দিতে (প্রসঙ্গত, এই ছবিটি ২০১৩-এর তামিল ছবি ‘কল্যাণ সাময়ল সাদহম’ রিমেক। অরিজিনাল ছবিটির পরিচালক ছিলেন প্রসন্ন)। সব মিলিয়ে বেশ ভালই এগোচ্ছিল ছবিটি। হইহই করে কেটে গেলে প্রথম হাফ। কিন্তু ঝামেলা বাধল শেষ দশ মিনিটে। পরিচালক মশাইয়ের হঠাৎ-ই মনে হল, এবার সিনেমা শেষ করা দরকার। ফল, তাড়াহুড়ো এবং অযত্মে ভরা ক্লাইম্যাক্স। এমনকী, জিমি শেরগিলের দৃশ্যটিরও কোনও মানে পাওয়া গেল না। তাই যা হওয়ার তাই হল, ‘সিনেমাটি ভাল হতে পারত’, এই লাইনেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তাও এমন প্রচেষ্টাকে হাততালি না দিয়েও পারছি না।

বাদশাহো

baadshaho-still

পরিচালক: মিলন লুথারিয়া
অভিনয়: অজয় দেবগন, ইলিয়ানা ডি’ক্রুজ়, ইমরান হাশমি, সঞ্জয় মিশ্র, এশা গুপ্ত, বিদ্যুৎ জামওয়াল

যাত্রাপথে সম্পদ চুরি। এই থিমনির্ভর ছবি নেহাত কম হয়নি। সেই তালিকায় নতুন সংযোজন পরিচালক মিলন লুথারিয়ার ‘বাদশাহো’। এই ধরনের ছবির ক্ষেত্রে চুরির কায়দাটি কতটা অভিনব উপায়ে পেশ করতে পারছেন পরিচালক, মূলত তার উপরেই নির্ভর করে সিনেমার সাফল্য। সময়কাল হিসেবে পরিচালক বেছে নিয়েছেন এমার্জেন্সি পিরিয়ড অর্থাৎ ১৯৭৫ এর প্রেক্ষাপট। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রথমেই নিজের হাত-পা বেঁধে ফেলেছেন পরিচালক। তাই পুরো ব্যাপারটি যে একটু গোদা হবে, তাতে সন্দেহ নেই। তা-ও যথাসাধ্য করেছেন তিনি। কিন্তু স্যার, রাজস্থানকে তো আরও একটু সুন্দর করে ব্যবহার করতে পারতেন!
রানি গীতাঞ্জলির (ইলিয়ানা) পৈত্রিক ধন-সম্পদ সরকার বাহাদুরের নাম করে আপন করে ফেলতে চায় এক পলিটিশিয়ান। সেই কাজে সে লাগায় আর্মির এক উচ্চপদস্থ অফিসারকে। জেলে বন্দি করা হয় গীতাঞ্জলিকে এবং এই বিপুল ধন-সম্পদ (মূলত সোনা) একটি বিশেষ ট্রাকে করে ( যেটি সময় মতো হতে পারে বাঙ্কারও) দিল্লি পৌঁছনোর দায় বর্তায় আর্মি অফিসার সেহরের (বিদ্যুৎ) উপর, যে আবার গীতাঞ্জলির গোপন প্রেমিক! অন্যদিকে, গীতাঞ্জলি নিজের বিশ্বস্ত দেহরক্ষী ভবানীকে (অজয়, যার সঙ্গেও গীতাঞ্জলির একটি প্রেমের সম্পর্ক আছে!) দায়িত্ব দেয় সেই ট্রাকের সম্পদ যেন দিল্লি না পৌঁছয়, সেই ব্যবস্থা করতে। ভবানী তার গুরুজি (সঞ্জয়), ডালিয়া (ইমরান) ও সঞ্জনাকে (এশা) সঙ্গে নিয়ে নেমে পড়ে অভিযানে। তারপর যা হয়, ট্রাকের দখল কে পায়, সোনা কার ভাগ্যে জোটে, তা নিয়েই আড়াই ঘণ্টার টানাপোড়েন। তবে গল্পের শেষে রয়েছে একটি মোক্ষম চমক। সেটা প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখলেই ভাল।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুলিয়েছেন ইলিয়ানা। মাহারানি সুলভ কোনও কিছুই তিনি আয়ত্ত্ব করতে পারেননি। মিলনের প্রস্তাবে ঐশ্বর্যা রাজি হলে গীতাঞ্জলির চরিত্রটি হয়তো অনেকটা প্রাণ পেত। অজয় দেবগনও যে ঢুলু ঢুলু চোখে সারাক্ষণ কোন অ্যাটিটিউড ধরে রাখতে চাইলেন, কে জানে! ইমরান-এশা মন্দের ভাল। তবে সবচেয়ে ভাল অবশ্যই সঞ্জয় মিশ্র। ভাল লাগে বিদ্যুৎ জামওয়ালকেও। ইমারানের সঙ্গে চেজ় সিকোয়েন্সে তিনি দুরন্ত। তবে সানি লিওনের আইটেমে ঝাঁঝ নেহাতই কম। আর হ্যাঁ, ক্লাইম্যাক্সে মারামারির পর্বটা আর একটু ছোট করলেই ভাল হত। কিছু না হোক, ৯০ কোটি থেকে কিছু টাকা তো বাঁচানো যেত!

সিনেমা নয়, ডকুমেন্টারি

চিলেকোঠা
chilekotha-still2

অভিনয়: ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু, ঋত্বিক চক্রবর্তী
পরিচালনা: প্রেমাংশু রায়
……

ছায়াছবি এবং ডকুমেন্টারির মধ্যে যে ফারাক, তা অস্পষ্ট হয়ে যায় ‘চিলেকোঠা’ ছবিটি দেখলে। ছবির শুরুতে বৃদ্ধ, নিঃসঙ্গে অমিমেষ চট্টোপাধ্যায়ের (ধৃতিমান) মুখোমুখি হয় এক যুবক (ঋত্বিক)। অল্টার ইগোর মোড়কে সেটাকে সুন্দরভাবে পরিবেশন করা যেত। যাতে ফিকশনের রূপটি প্রকাশ পায়। কিন্তু পরিচালক সরলীকরণে বিশ্বাসী। অতএব প্রথমেই পরিষ্কার হয়ে গেল, সেই যুবক আদতে যৌবনের অনিমেষ। সে হাত ধরে বৃদ্ধ অনিমেষকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল তার দু’বছর বয়সে, বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দুর্ভিক্ষের বাংলায়, চট্টোপাধ্যায়দের যৌথ পরিবারে। সে পরিবারে প্রত্যেকে অস্থির সামাজিক চিত্র চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তবে অনির জীবনে পরিবর্তন আসে, যখন বঙ্গভঙ্গের পর তার ফুলকাকা (ব্রাত্য) কলকাতায় তাদের সঙ্গে থাকতে আসে। এই ফুলকাকা তার মধ্যে ফুটবল, সিনেমা, নাটকের বীজ বপন করে, হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। কিন্তু সমস্যাটা হয় অন্য জায়গায়। টাইমস্কেপগুলোকে দলিল হিসেবে ধরে রাখার জন্য পরিচালক কিছু তথ্য গুঁজে দিয়েছেন মাত্র। যাতে দর্শকের সঙ্গে গল্পের কোনও আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয় না। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের ঝগড়া যেমন স্থূল লাগে, তেমনই অন্তঃসারশূন্য মনে হয় অনিমেষের নকশাল আন্দোলন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার কারণটি। ঘটনাগুলো পরপর ঘটে যায়, কোনও ঘটনার সঙ্গে অন্য ঘটনার যোগসূত্র তৈরি হয় না। অভিনয়ে ব্রাত্য বসু এবং ঋত্বিক অনবদ্য। বিশেষত ব্রাত্যর বাঙাল ভাষা এবং বাচনভঙ্গি খাঁটি বলে মনে হয়। কিন্তু অন্য চরিত্রাভিনেতাদের অতিঅভিনয় নজর এড়ায় না। কারণ মোটামুটি সব দৃশ্যেই গোটা পরিবারকে একসঙ্গে দেখানো হয়। ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষ কিছু করার নেই শুরু এবং শেষের দৃশ্য বাদ দিলে। বর্তমান থেকে অতীতে যাওয়া এবং ফিরে আসার দৃশ্যগুলোতে চিত্রগ্রহণ বেশ কাঁচা মনে হয়। আর শেষের দৃশ্যটি বড়ই হাস্যকর। অনলাইন ভিডিয়ো চ্যাটে দাদুকে মরতে দেখে দাদুর মুখে চ্যাটের ওপার থেকে জল দিচ্ছে নাতি এবং পিছনেই সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মৃত আত্মীয়দের আত্মা… খুব বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না কি? ‘চিলেকোঠা’ হতে পারত এক জ্বলন্ত সময়ের সুন্দর চিত্র। কিন্তু নিছক একটি কাঁচা ডকুমেন্টারি হয়েই রয়ে গেল।

বন্দুকের গুলিই সার!

বাবুমশাই বন্দুকবাজ়
Babumoshai-Bandookbaaz-still

অভিনয়: নওয়াজ়উদ্দিন সিদ্দিকী, বিদিতা বাগ, যতীন গোস্বামী, দিব্যা দত্ত প্রমুখ
পরিচালনা: কুশন নন্দী
……

উত্তরপ্রদেশের রুক্ষ ভূমি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নৃশংস হত্যালীলা, যখন-তখন বন্দুকের গর্জে ওঠা, রক্ত, উদ্দাম গ্রাম্য যৌনতা, দুর্নীতি, গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব… ঠিক যেন ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর পটভূমিকা, না? আর কেন্দ্রীয় চরিত্রে নওয়াজ়উদ্দিন সিদ্দিকী থাকলে তো সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়ে যায়। সেরকমই একটি একটি ডার্ক ছবি তৈরির চেষ্টায় ছিলেন পরিচালক কুশন নন্দী। কিন্তু ওয়াসিপুরে পৌঁছনোর জন্য যে রাস্তাটা তিনি তৈরি করলেন, তা খানা-খন্দে ভরা! বাবু বিহারী (নওয়াজ়) দুই রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত কনট্র্যাক্ট কিলার। তার সাফল্যের হার ১০০ শতাংশ, যা কিনা তাবড় নেতাদেরও ভয়ের উদ্রেক করে কারণ বাবুকে লাগাম পরানো সম্ভব নয়। কিন্তু এই বাবুও চিন্তায় পড়ে যায়, যখন আর এক তরুণ শুটার বাঁকে বিহারীও (যতীন) তার রাস্তায় চলে আসে। এই বাঁকে বিহারী গুরু মানে নওয়াজ়কে আর গুরুকে চ্যালেঞ্জ করে তারই জীবিকায়। বাবুর ব্যাক্তিগতজীবনের অপর একটি প্লটও রয়েছে যেখানে ফুলওয়া (বিদিতা) নামের এক মুচির সঙ্গে তার প্রেম (বা বলা ভাল, যৌনতা) হয় এবং তার জন্য খুনও করে বসে বাবু। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়, যখন বাবু-বাঁকে-ফুলওয়ার মধ্যে একটা ত্রিকোণ প্রেমের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর ফলে বাবুর জীবন ওলট-পালট হয়ে যায়। গল্প একটি আটবছরের লাফ মারে। রাজনীতির নোংরামো, পিছন থেকে ছুরিকাঘাত, প্রেম, বঞ্চনা, সবই রয়েছে এই ছবির গল্পে। কিন্তু স্ক্রিপ্টের বুনট এতই আলগা যে প্রত্যেকটি প্লটকেই ছন্নছাড়া মনে হয়। ঠিক যেন টিভি সিরিজ়কে চলচ্চিত্রে পরিণত করার প্রচেষ্টা। ব্যর্থ প্রচেষ্টা। ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর মতো সমস্ত উপাদানই এখানে মজুত, তবে সেই উপাদানগুলোকে কীভাবে ছবির গল্পে ঢোকাবেন, তা নিয়ে বোধহয় পরিচালকও দ্বিধান্বিত। ফলে উপাদানগুলো আলাদা-আলাদাভাবে চোখে পড়ে কিন্তু গল্পে সম্পৃক্ত হয় না। কে কাকে কেন মারার চেষ্টা করছে, বৃথা এত গুলি চলছে কেন, সেই প্রশ্ন মাথায় জট পাকিয়ে যায়। কখনও মনে হয় ছবিটি রিভেঞ্জ ড্রামা, কখনও মনে হয় জ্বলন্ত একটি সামাজিক দলিলমাত্র। নওয়াজ়উদ্দিন এমন অভিনেতা, যিনি আসবাবের ভূমিকাও স্বচ্ছন্দে পালন করতে পারেন। কিন্তু সম্প্রতি নওয়াজ় অভিনীত দুর্বলতম চরিত্র ‘বাবুমশাই’। বিদিতা বাগ প্রথম ছবিতেই বেশ সাবলীল, ভাল লাগে যতীন গোস্বামীকেও। কিন্তু দিব্যা দত্ত অভিনীত সুমিত্রাদেবী চরিত্রটি খলচরিত্রের ক্যারিকেচার হয়ে থেকে যায়। প্রশ্ন ওঠে, বাবু বিহারীকে ‘বাবুমশাই’ নামে গোটা ছবিতে কোথাও সম্বোধন করা হয় না, করার কারণও নেই। তাহলে ছবির এহেন শীর্ষক কেন? সবমিলিয়ে ‘বাবুমশাই বন্দুকবাজ়’-এর বন্দুকের গুলি নিশানায় লাগে না।

সুর খোঁজে মুক্তিপথ

কয়েদি ব্যান্ড
Qaidi-Band-still

অভিনয়: আদর জৈন, অন্যা সিংহ, শচিন পিলগাঁওকর
পরিচালনা: হাবিব ফয়জ়ল
……

বিচারাধীন। শব্দটি আপাতনির্দোষ, কারণ বিচারাধীন মানুষ অপরাধী নয়। কিন্তু ভারতীয় বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রীতায় শব্দটি কালান্তক। ৫৪ বছর জেল কাস্টডিতে কাটিয়ে দিয়ে, শেষ জীবনে নির্দোষ সাব্যস্ত হয়েছেন, এমন উদাহরণও আছে এ দেশে। এই নিয়েই হাবিব ফয়জ়লের ছবি। বেশ নতুন ধরনের থিম, ছবির শুরুটা হয়েছেও বেশ ইন্টারেস্টিং ভাবে। সঞ্জু (আদর) এবং বিন্দিয়ার (অন্যা) মাধ্যমে বেশ শ্লেষের সঙ্গে জেলের ভিতরের বাস্তব অবস্থাটি দেখানো হয়। বিচারাধীন কয়েদিরা আসলে ‘না ঘরকা না ঘাটকা’, তাদের তো অপরাধীদের সম্মানও নেই। অনেকে অপরাধ মেনে নিতে তৈরি, কিন্তু তবু সাজা তো হয় না। যা শাস্তি হওয়ার কথা, তার চেয়ে বেশি সময় জেলে এমনিতেই কাটিয়ে ফেলেছে। আছে শুধু মামলার তারিখের একটা আশা এবং তারপর আবার নতুন তারিখের মধ্যবর্তী নিরাশা। এরই মাঝে জেলে আয় করার কোনও উপায় খোঁজা, পরিবারের মতো হয়ে ওঠা। এরইমধ্যে জেলারের ঘোষণা, ১৫ অগস্ট জেলে অনুষ্ঠানের জন্য একটি ব্যান্ড তৈরি হবে। তাতে গান করার জন্যই এক হয় সঞ্জু-বিন্দিয়া-রুফি-ওগি-মসকিনরা। বিখ্যাত হয়ে যায় তাদের গান। কিন্তু সেই গানের জন্যই তাদের বন্দিদশা বেড়ে যায় আরও। আবার সেই গানই হয়ে ওঠে তাদের মুক্তি পাওয়ার পথ। কাহিনির দিক থেকে ছবি খারাপ নয়। তবে ছবির প্রথমার্ধ বেশ ধীর। দ্বিতীয়ার্ধ খারাপ লাগে না। অভিনয়ে নবাগত আদর এবং অন্যা অসাধারণ। জেলারের ভুমিকায় দারুণ লেগেছে শচিনকে। তবে ছবিতে বাস্তবতার যথেষ্ট অভাব। দুঃখর কথা বলা হচ্ছে বটে, কিন্তু কয়েদিদের আনন্দ দেখে তা বোঝা কঠিন। কয়েদিদের গিটার বা সিন্থ বাজানো দেখে যেমন আশ্চর্য লাগে, তেমনই আশ্চর্য লাগে হঠাৎই সঞ্জু-বিন্দিয়ার প্রেম দেখে। এ ছবির প্রধান নায়ক, অরিজিৎ সিংহর গলায় গানগুলি, যাতে যোগ্য সঙ্গত করেছেন যশিতা যশপাল শর্মা। সুরগুলি বিশেষ মনে থাকবে না, কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে পা নড়বে নিজের ছন্দে। মোটের উপর, ‘কয়েদি ব্যান্ড’ একটি ফ্রেশ, অন্যরকম ছবি।

ভিলেন বাজেট

যকের ধন
joker-dhon-still

অভিনয়: সব্যসাচী চক্রবর্তী, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক সেন, রাহুল, প্রিয়ঙ্কা সরকার
পরিচালনা: সায়ন্তন ঘোষাল
……

প্রথমেই সাধুবাদ পরিচালককে। নিজের প্রথম ছবিতেই সাহস করে হেমেন্দ্রকুমার রায়ের ‘যকের ধন’-কে আধুনিক সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের মতো করে রূপ দেওয়ার জন্য। বলতে বাধা নেই, এই ছবিতে মূল সাহিত্য থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসেছেন পরিচালক। স্মার্টফোন আছে, ডিমনিটাইজ়েশন আছে, তুখোড় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে হেঁয়ালির সমাধান আছে কিন্তু তাতে মূল গল্পের কখনও রসভঙ্গ হয়নি। গল্পটা ছোট করে বলতে গেলে, কুমার (রাহুল) হঠাৎ করে উত্তরাধিকারসূত্রে তার বড় ঠাকুরদার কাছ থেকে একটি বাক্স পায়। তার মধ্যে একটি তিব্বতি খুলি, মাথায় বাংলা সংখ্যা বসানো। গবেষক বন্ধু বিমলের (পরমব্রত) সাহায্য নেয় সে। অন্যদিকে করালি (সব্যসাচী) নামে এক ভদ্রলোক শুরু করেন আরও বহুপ্রাচীন কিছু হরফের রহস্যভেদ। এই দুইয়ের মধ্যে কি কোনও যোগসূত্র আছে? খুব ছোট পরিসরে বেশ সুন্দর একটি স্ক্রিপ্ট লিখেছেন সায়ন্তন। বিশেষ করে যেভাবে অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশের রহস্য ভেদ করা হয়, তা দেখতে ভাল লাগে। সকলের অভিনয়ই বেশ ভাল। তা সে পরমব্রতই হোন, রাহুল বা সব্যসাচী। কৌশিক সেনের কথা আলাদা করে বলতে হয়। তাঁর সারল্যমিশ্রিত বুদ্ধি মনকাড়া। কিন্তু কিডন্যাপড হওয়ার পরও তাঁর চোখেমুখে তেমন টেনশন ধরা পড়ে না কেন? নেওড়া ভ্যালির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গেই গল্পে মিশিয়েছেন পরিচালক। তা-ও কিছু খারাপ লাগা… ক্লাইম্যাক্সের দৃশ্যে যেভাবে মন্দির ভেঙে পড়া দেখিয়েছেন পরিচালক, তাতে বাজেটের কমতি খুব বেশি করে চোখে পড়ে। এরকম একটা ছবির প্রয়োগের জন্য বাজেট যে কতটা দরকারি, সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। পরিচালক স্রেফ ক্যামেরা কাঁপিয়ে একটা অসাধ্যসাধনের চেষ্টা করেছেন। ছবিতে সত্যজিৎ, সুকুমারের রেফারেন্সের ছ়ড়াছড়ি। সেখােন প্রিয়ঙ্কার মাধ্যমে ‘শোলে’র বাসন্তীর রেফারেন্স টানা ছবির গভীরতাকে আঘাত করেছে। ‘যকের ধন’ মোটেই সর্বাঙ্গসুন্দর ছবি নয়, কিন্তু পরিচালক যে তা-ও একটা দুর্দান্ত চেষ্টা চালিয়েছেন, তার জন্য ধন্যবাদ।

চেনা রাস্তার সফর

জব হ্যারি মেট সেজল
Jab-Harry-met-Sejal-big

অভিনয়: শাহরুখ খান, অনুষ্কা শর্মা প্রমুখ
পরিচালনা: ইমতিয়াজ় আলি
……

ইমতিয়াজ় আলির ছবি মানেই নন-লিনিয়ার স্টোরি টেলিং, সুফি-প্রেম এবং শিকড়ের খোঁজ। নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ ছাড়া বাকি দু’টি উপকরণই মজুত ‘জব হ্যারি মেট সেজল’ ছবিতে। তবে কেন্দ্রীয় চরিত্র শাহরুখ খান এবং গল্পের জঁর প্রেম হলে যে তাতে ‘শাহরুখিজ়ম’ ভরপুর থাকবে, তা তো জানা কথা। হরিন্দর নেহরা ওরফে হ্যারি (শাহরুখ), ইউরোপের টুর গাইড, যে মহিলাঘটিত সমস্যায় জর্জরিত। নিজের ক্লায়েন্টদের সঙ্গে প্রায়শই জড়িয়ে পড়ে এবং চাকরি হারায়। কিছু ফ্ল্যামবয়েন্স বাদ দিলে খুব একটা ভাল লাগার মতো চরিত্র একেবারেই নয়। অন্যদিকে সেজল জ়াভেরি (অনুষ্কা), বিত্তশালী হিরে ব্যবসায়ীর নাক উঁচু মেয়ে, যে কিনা ‘সুইট এবং সিস্টার টাইপ’! বোকাসোকা মেয়ে, গুজরাতি অ্যাকসেন্টে ইংরেজি বলে, দুনিয়াদারি জানে না, নিজেকে ‘সেক্সি’ প্রমাণ করতে মরিয়া এবং পয়সা চেনে (স্বাভাবিকভাবেই!)। এনগেজমেন্ট রিং খুঁজতে সে একরকম জবরদস্তি জাঁকিয়েই বসে হ্যারির জীবনে। এরপর কী হয়, সেটা না বলাই ভাল। তবে না বললেও, গল্পের ভবিতব্য প্রথমার্ধ থেকেই দর্শক বুঝতে পারবেন। এতটাই চেনা রাস্তায় হাঁটে স্ক্রিপ্ট। প্রথমার্ধে ছবিটি রোম্যান্টিক কমেডি, যাতে বেশ সিচুয়েশনাল হাস্যরস এবং ভাল সংলাপ রয়েছে। রয়েছে কিছু মন ভাল করে দেওয়া প্রেমের দৃশ্য। ইমতিয়াজ় আলির ঘরানার ভিন্নধর্মী রোম্যান্স এবং শাহরুখের রোম্যান্স একসঙ্গে মিশলে যে ধরনের প্রেমের দৃশ্য হওয়া উচিত, ঠিক তেমনই। গোলমাল বাধে দ্বিতীয়ার্ধে। শাহরুখকে নিয়ে ছবি করছেন বলেই কি ইমতিয়াজ় আলি হঠাৎ করে ঠুসে-ঠুসে বলিউড মশলা গুঁজলেন? হঠাৎ করে একটি বিয়ের সিচুয়েশন তৈরি, সেখান থেকে অদ্ভুতভাবে দু’জনের প্রেমের উপলব্ধি, চিরাচরিত এয়ারপোর্ট ড্রামা… কী দরকার ছিল! চেনা গল্পকে বেশ তো স্মার্ট মেকিং দিয়ে ঢাকছিলেন! হিন্দি-পঞ্জাবি মেশানো গান ছাড়া এনআরআই টার্গেট অডিয়েন্সকে কি ছোঁয়া যায় না? এ ছবিতে আরও কয়েক প্যাকেট ইমতিয়াজ় আলি রয়েছে। হ্যারিও ‘তমাশা’র ‘বেদ’ বা ‘লভ আজ কল’-এর ‘জয়’-এর মতো শিকড় খোঁজে। সমাজের মূলস্রোতে ঢুকতে জোর করে এমন কাজ করে, যা জীবনবোধ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অন্যদিকে সেজল অপাপবিদ্ধ, একরকম তার রক্ষণাবেক্ষণই (পড়ুন বেবি সিটিং) করতে হয় হ্যারিকে। তথাকথিত ‘ভাল মেয়ে’র (এখনও আমাদের সমাজে একটু বোকাসোকা, শরীর নিয়ে ছুঁৎমার্গ থাকা মহিলাদেরই ‘ভাল’ বলা হয় কিনা!) বেপরোয়া হয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা তার প্রতিটা আচরণে। একটি আদ্যন্ত রম-কম দ্বিতীয়ার্ধে হয়ে যায় প্যাচপেচে প্রেম বা বলা ভাল রোম্যান্স-ওভারডোজ়। ফলে মাঝেমধ্যে অ্যান্টাসিডের প্রয়োজন বোধ হয়। জমেনি ক্লাইম্যাক্সটিও। শাহরুখ এবং অনুষ্কার অভিনয় এ ছবির প্রাপ্তি। তবে দু’টি চরিত্রকে ঘাড় ধরে গুজরাতি এবং পঞ্জাবি বানানোর চেষ্টাটা বড্ড চোখে লাগে। মোটের উপর ছবিটি বিনোদন দিতে সক্ষম হলেও, না শাহরুখোচিত রোম্যান্স হয়ে উঠতে পেরেছে, না ইমতিয়াজ় আলির ভিন্নধর্মী অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরতে পেরেছে।

পুনশ্চ: বঙ্গভাষী বিদেশী গুন্ডার বাংলা-বাংলা ইংরেজি এবং পঞ্জাবি পরে কিডন্যাপ করতে যাওয়ার ব্যাপারটাও বেশ ‘পুদিন হরা’ টাইপ হয়ে গেল (#প্রাদেশিকতা-অ্যালার্ট!)। ইমতিয়াজ় আলি যেখানে চরিত্রায়ণের সূক্ষ্মতার জন্য বিখ্যাত, সেখানে এমন মোটা দাগের স্টিরিয়োটাইপ সত্যিই গ্রহণযোগ্য নয়।

চেনা গল্প, ফ্রেশ ট্রিটমেন্ট

নবাব
nabab-still

অভিনয়: শাকিব খান, শুভশ্রী, অপরাজিতা আঢ্য, রজতাভ দত্ত, সব্যসাচী চক্রবর্তী, খরাজ মুখোপাধ্যায়, সাগ্নিক চট্টোপাধ্যায়, অমিত হসন, বিশ্বনাথ বসু
পরিচালনা: জয়দীপ মুখোপাধ্যায়
……

এই ছবি বাংলাদেশে রেকর্ড ব্যবসা করেছে। কলকাতাতেও একই ফলাফল হবে কী না তা সময়ই বলবে, তবে এটুকু বলাই যায় যে, হালফিলে কমর্শিয়াল বাংলা ছবির নিরিখে, এই ছবি বেশ ভাল। বিশেষ করে জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনার প্রশংসা করতেই হয়। তাঁর দক্ষ পরিচালনার জন্য ছবিটি দেখতে মন্দ লাগে না। তবে ছবির গল্প বেশ চেনা এবং একাধিক ছবির গল্পের সঙ্গে মিলেও যায়। বিশেষ করে ছবির ক্লাইম্যাক্স, শাহরুখ খান-টুইঙ্কল খন্না অভিনীত ‘বাদশা’ ছবির কথা মনে করায়। ছবির গল্প কলকাতা শহরে সন্ত্রাস দমন নিয়ে। এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে একটি স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়। দিল্লি থেকে আসা ইন্টেলিজেন্স এজেন্ট নবাব ওরফে রাজীব চৌধুরীও (শাকিব) এই টাস্ক ফোর্সের সদস্য। কলকাতায় এসে সন্ত্রাস দমনের পাশাপাশি ক্রাইম রিপোর্টার দিয়ার (শুভশ্রী) সঙ্গে প্রেমপর্বও ভালই চালান নবাব। শেষে গিয়ে দুষ্টের দমন ও হ্যাপি এন্ডিং। অভিনয়ের ক্ষেত্রে শাকিব বেশ ভাল। বিশেষ করে তাঁর অ্যাকশন দৃশ্য, ডায়ালগ ডেলিভারি এবং শরীরীভাষা প্রশংসনীয়। শুভশ্রীকেও দেখতে ভাল লাগে। অন্যান্য চরিত্রে সব্যসাচী, খরাজ, রজতাভ, বিশ্বনাথ, অপরাজিতা যথাযথ। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় সাগ্নিকের নজরকাড়া অভিনয়ের কথা। স্যাভির মিউজ়িকও মন্দ নয়। সবমিলিয়ে, চেনা গল্প হলেও, ফ্রেশ ট্রিটমেন্ট এবং সকলের অভিনয় এই ছবিটিকে উপভোগ্য করে তোলে।