Category Archives: review detail

বড্ড খুঁতখুঁত লাগছে যে!

আসছে আবার শবর
Shabar-big

অভিনয়: শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, অরুণিমা ঘোষ, গৌরব চক্রবর্তী, শুভ্রজিৎ দত্ত
পরিচালনা: অরিন্দম শীল
……

এ শবর অন্যরকম, এ শবর আলাদা। তবে ভাল কিন্তু বলতে পারছি না। কোথাও গিয়ে আগের শবরকে মন খোঁজে। কলকাতা শহরে হঠাৎ-ই খুন হয় কয়েকজন তরুণী। তদন্তে নামে কলকাতা গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার শবর দাশগুপ্ত (শাশ্বত)। এরপর গল্প ঘোরে অন্যদিকে। চন্দননগরের বড়লোক বাড়ির মেয়ে রিঙ্কু (দিতি) ভালবাসে তার চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী বিজয়কে (ইন্দ্রনীল)। এদিকে পাড়ার লোক, রিঙ্কুর পরিবারের লোক একেবারেই পছন্দ করে না বিজয়কে। ফুলশয্যার রাতে অস্বাভাবিক আচরণের জন্য বিজয়ের স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায়। হঠাৎ খুন হয়ে যায় রিঙ্কু। দোষী সাব্যস্ত হয় বিজয়। জোড়া তদন্তের ভার পড়ে শবরের উপর। তদন্তে নেমে উঠে আসে আরও কিছু অন্ধকার তথ্য। শাশ্বতর অভিনয় নিয়ে কথা বলা অপ্রয়োজনীয়। তিনি খারাপ করলে না হয় দুছত্র বলতাম। মেদহীন অভিনয় কী, তা আবার দেখিয়ে দিলেন তিনি। যোগ্য সঙ্গত করেছেন শুভ্রজিৎ। দিতি, অনিন্দ্যও বেশ ভাল। এক কথায় বলতে গেলে অঞ্জনা বসু ছাড়া সকলেই নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। অঞ্জনা খামোকা ওভার অ্যাক্টিং কেন করতে গেলেন বুঝলাম না! সবই ভাল ছিল। কিন্তু তাল যে কাটল পরিচালনার দোষে! ঝকঝকে সেট, ক্যামেরার কাজ এবং বিক্রম ঘোষের অনবদ্য সঙ্গীতও সেই খুঁত ঢাকতে পারেনি। এই যেমন, শবর এবং তার দুই সঙ্গী খুনিকে ধরতে সকাল থেকে সন্ধে দৌড়ে গেল (ম্যারাথনেও এত দৌড়তে হয় কি?)। সিনেমার শেষে শবর হঠাৎ জ্ঞানবৃদ্ধ হয়ে একরাশ জ্ঞান দিতে গেল কেন, সেটা বোঝা গেল না। শবরের মতো মানুষের কাছে এটা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। আবেগপ্রবণ দৃশ্যে শবরের সংযত থাকাটাই তো তার ইউএসপি। আবার যেমন বোঝা গেল না নীপু নিজেকে গরিব বলে দাবি করলেও দামি বাইকে, পোশাকে, আচরণে টাকার অভাব চোখে পড়ে না। এবং সবশেষে অভিনেতা বাছাইয়ের সময় পরিচালকের আরও একটু যত্মশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল। থ্রিলারের মানে তো শেষ মুহূর্ত অবধি খুনিকে চেনা যাবে না। কিন্তু সেটা যদি গায়ের রঙের কারণে মাঝেই বোঝা যায়, তাহলে সাসপেন্স মাঠে মারা যাওয়ার জোগাড় হয় যে। কোথাও গিয়ে একটু হতাশ হলাম কিন্তু।

হালকা চালের বিনোদন

ইনস্পেক্টর নটি কে
notty-k-big

অভিনয়: জিৎ, নুসরত ফারিয়া, সুপ্রিয় দত্ত, সুভদ্রা চক্রবর্তী, খরাজ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ
পরিচালনা: অশোক পতি
……

নটবর খাঁড়া (জিৎ) চমকাইতলার বিখ্যাত খাঁড়া পরিবারের ছেলে, যে পরিবারের সব পুরুষই পুলিশের খোচর হয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছে। কিন্তু সে চায় ইনস্পেক্টর হতে। তাই ইতালি গিয়ে পুলিশ সুপারের ব্যক্তিগত কাজ করে দিয়ে সে ইনস্পেক্টর হওয়ার ফন্দি আঁটে। কিন্তু প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে! ইতালি গিয়ে সে প্রেমে পড়ে সত্যিকারের পুলিশ সমীরার (ফারিয়া)। নটির সমীরার ভালবাসা পাওয়া এবং ইনস্পেক্টর হওয়া নিয়েই ছবির গল্প। জিতের ছবি থেকে বরাবরই দর্শকের প্রত্যাশা থাকে প্রচুর। মিউজ়িকে আজকাল পুরনো গানকে রিক্রিয়েট করার একটা ট্রেন্ড এসেছে। এই ছবিটি দেখলেও ঠিক তেমনই মনে হবে। ওই আট-নয়ের দশকের স্ল্যাপস্টিক কমেডি ছবির মতো মেকিং ছবিটির। গ্রামের সরল ছেলে, শহরের ডাকসাইটে মেয়ে ফ্যাক্টরটিও রয়েছে। অভিনয়ে জিৎ এবং ফারিয়া, দু’জনেই বেশ ভাল। জিতের কমিক টাইমিং যথাযথ। আর ফারিয়ার ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক ছবিতে বেশ উজ্জ্বল বলেই মনে হয়। গল্পের প্রচুর ফাঁকফোঁকর রয়েছে, যেগুলো এখনকারদিনে মেনে নেওয়া যায় না। তবে ওই যে বললাম, আটের দশকের ছবির আদলে তৈরি ছবিটি! ফলে ওসব অসঙ্গতির দিকে নজর না দেওয়াই ভাল। সবমিলিয়ে ‘ইনস্পেক্টর নটি কে’ বিনোদন কোশেন্টের মন্দ নয়।

কিছু-কিছু অপূর্ণতা

আমি জয় চ্যাটার্জি
amijoychaterje-still

অভিনয়: আবির চট্টোপাধ্যায়, জয়া আহসান, শতাফ ফিগার
পরিচালনা: মনোজ মিশিগান
……

মনোজ মিশিগানের এই ছবিটির কথা বলতে গেলে শুরুতেই বলতে হয়, এর সমস্ত শক্তি নিহিত এর ভাবনায়। যে নামই দিই না কেন, সাধারণ ভাবে এই কাহিনি ‘এক্সটাসি’-র। অথবা নিজেকে খোঁজার একটা প্রবল প্রচেষ্টা… নতুন করে খুঁজে নেওয়া নিজের পবিত্রতা। কাহিনি বেশি বলব না, জয় চ্যাটার্জি (আবির) একজন সফল ও স্বার্থপর ব্যবসায়ী। তার প্রেমিকা অদিতি (জয়া) আর সে বেড়াতে যায়। তারপরই জয় মিসিং! অথচ জয় আছে ঠিকই… প্রেডিক্টবল হলেও কাহিনিতে জোর আছে। তবে বাকি ছবিতে যত্ন ও বাজেটের অভাব স্পষ্ট। এর বাইরে আত্মার স্থূল শরীর এবং উত্তরবঙ্গ ও কলকাতার দূরত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে। ‘মিত্রা’, ‘দত্তা’ জাতীয় উচারণগুলি খুব খারাপ। অভিনয়ে আবির চলনসই। জয়া বেশ উচ্চকিত। শতাফ যথাযথ। ছোট চরিত্রগুলিতে অপেশাদার অভিনেতারা কাজ করেছেন বলে মনে হল, যা ভাল লাগল না পর্দায়। ডাবিংয়েও সমস্যা আছে। মোটের উপর, ছবিটি চলনসই। তবে তা, গল্পের জন্যই।

রূপকথা নয়

মুক্কাবাজ়
Mukkabaaz-still

অভিনয়: বিনীতকুমার সিংহ, জ়োয়া হুসেন, জিমি শেরগিল, রবিকিষন
পরিচালনা: অনুরাগ কাশ্যপ
……

স্ট্যালন-সলমন-দেব-দের দুনিয়ায় মাঝে-মাঝে বিনীতকুমার সিংহরা চমকে দেন। সৌজন্যে, অনুরাগ কাশ্যপ। ‘মুক্কাবাজ়’ ছবিটিতে সাধারণ স্পোর্টসমুভির প্রেডিকটেবিলিটি নেই, নেই ‘এ তো জিতবেই’ জাতীয় রূপকথা। আসলে ঠিক স্পোর্টসমুভি তো নয় এ ছবি। ছবির প্রধান চরিত্র ‘মুক্কেবাজ়’ বা বক্সার নয়, ‘মুক্কাবাজ়’ বা যোদ্ধা। রিংয়ের লড়াই সে হেরে যেতে বাধ্য হয়। জিতে যায় ব্যক্তিগত যুদ্ধে। একটু কাহিনিতে আসি। ছবির শুরুতেই কাশ্যপ এনে ফেলেছেন গোমাংস, লিঞ্চিং ইত্যাদির ঘটনাগুলি। ‘ভারতমাতা কী জয়’ আওড়ানো সেই গুন্ডাদের পাণ্ডা, ভগবানদাস মিশ্র (জিমি শেরগিল) ঘোর ব্রাহ্মণ, ঘোর বাহুবলী! সে-ই আবার উত্তরপ্রদেশ বক্সিং ফেডারেশনের হর্তা-কর্তা-বিধাতা, বরেলি জেলার তো বটেই। তারই ছাত্র শ্রমণ সিংহ (নামটি লক্ষ করুন) গুরুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। সে একে ছোট জাত, তার উপর বিদ্রোহ, তার উপর সে গুরুর ভাইঝি সুনয়নার (জ়োয়া হুসেন) প্রেমে পাগল। সুনয়না আবার মূক। বুঝতেই পারছেন, সম্পূর্ণ ঘেঁটে ঘ হয়ে গিয়েছে ব্যাপারটা। শ্রমণ অসাধারণ বক্সার, কিন্তু তাকে জেলা-লেভেলেও নামতে দেয় না ভগবানদাস। সেখান থেকে অনুশীলন কঠোর করা, নতুন কোচ খোঁজা, অন্য জেলায় যাওয়া… শ্রমণের স্ট্রাগলটা খুব বাস্তব। সে একেবারেই টিপিক্যাল স্পোর্টসফিল্ম স্টাইলে ‘এলাম-দেখলাম-জয় করলাম’ কায়দায় এগোয়নি। অতঃপর বিয়ে, মধ্যান্তর… এবং সিনেমার ক্রূরতম রূপ। জাত-ধর্ম-জেন্ডার-রাজনীতি-স্পোর্টস নিয়ে অসাধারণ একটি খেলা খেলেছেন অনুরাগ। অনুরাগের ছবির প্রচণ্ড অন্ধকার চেহারা এ ছবির নেই। কিন্তু বাস্তবতার দিকটি খুব স্পষ্ট। নজর কেড়ে নিয়েছে এ ছবির সাবটেক্সট, অর্থাৎ বক্সিং। হ্যাঁ, বক্সিং এই ছবির সাবটেক্সটটি। কারণ চাকরি, সমাজ, জাত-পাত, প্রেম নিয়ে প্রধান চরিত্রর যে ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি তিনি তুলেছেন, তা বক্সিংয়ের চেয়ে অনেক বড়। বক্সার হিসেবে বিনীতকুমার সিংহ অনবদ্য। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে অনুশীলনের ছাপ স্পষ্ট। রিংয়ে সত্যিকারের বক্সাররা লড়েছেন এবং বিনীতকে তাঁদের মধ্যে একটুও বেমানান লাগেনি। তিনি যখন ঝড়ের গতিতে ঘুসিগুলি ঝেড়েছেন, তখন অসম্ভব লাগেনি মোটেই। তাঁর পেশিবহুল চেহারায় যাচ্ছিই না। তিনি যে কষ্ট, যে পরিশ্রমটি করেছেন, তা অনবদ্য। স্ত্রী হারানোর যন্ত্রনা, রাগ, হতাশা, সেই রাগকে রিংয়ে আনা, অসহায়তা… সবেতেই বিনীত জ্বলে উঠেছেন। তিনি মহাতারকা নন, হবেনও না। তাঁর শক্তি সত্যিকারের মেথড অ্যাকটিং। প্রতিটি ফ্রেমে তিনি নড়িয়ে দিয়েছেন। তার চেয়েও বেশি করে মন জয় করে নিয়েছেন নবাগতা জ়োয়া। মূক অথচ মানসিকভাবে প্রচণ্ড শক্তিশালী সুনয়নার চরিত্রে ছোট-ছোট অনুভূতিগুলি তিনি অসাধারণ সাবলীলতায় ধরেছেন। জিমি শেরগিল ভিলেন হিসেবে ভাল (যদিও তাঁর অসুস্থ চোখটি দেখতে কেমন একটা লাগে), তার চেয়েও ভাল রবিকিষন। তবে এ ছবিতে অভিনয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী, ছোট চরিত্রগুলি। প্রত্যেকের কাজ ফুল ফুটিয়েছে। ছবিটি একটু লম্বা, কিছু ক্ষেত্রে একটু অকারণে লঘু এবং মোলাড্রামাটিক। তবু, অনুরাগ যেভাবে কাহিনিটি এগিয়েছেন, যেভাবে ওয়ান-লাইনার সাজিয়েছেন, যেভাবে অনায়াসে এসেছে থ্রিল… তা সিট থেকে নড়তে দেয় না। তাঁকে অনেকটা সাহায্য করেছে একটি অসাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। শ্রবণের মুখে ভগবানের প্রতি ‘বহুত হুয়া সম্মান’ ভেঙেছে বিস্তর ইনস্টিটিউট। তার জন্য অনুরাগকে ধন্যবাদ। সমবেদনা না জাগিয়ে তিনি যে একটি মূক মেয়েকে দেখাতে পেরেছেন, হয়তো নারীদের মুখ হিসেবেই, তার জন্য তাঁকে সম্মান। স্পোর্টস মুভি হেরে যায় এই বক্সারের জীবনের সঙ্গে যুদ্ধে। মানুষ শ্রবণ অনেক বেশি করে ছুঁয়ে যায় মন। তার জয় হোক।

এ ছবি এতদিন পড়ে রইল কেন?

রে
ray-big

অভিনয়: শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক চক্রবর্তী, টিনা মুখোপাধ্যায়
পরিচালনা: রিংগো
……

ইদানীংকালে দু’-একটি ছবির পোস্টার দেখে মানুষ একটু মিসগাইডেড হয়ে থাকতে পারেন। ‘রে’-ও তেমনই। পোস্টার দেখেই সবাই গেল-গেল করছিলেন। বলেছিলেন, শাশ্বত কেন হবেন সত্যজিৎ? চেহারার মিল ইত্যাদি নিয়েও হাজার কথা বলা হয়েছে। নির্ভয়ে থাকুন, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় এ ছবিতে মোটেই সত্যজিৎ রায় নন। সত্যজিতের গল্পের রেফারেন্স রয়েছে বেশ কিছু, ‘সিংজি-সিংজি’ বলে চিৎকার করা আছে ‘সোনার কেল্লা’ স্টাইলে, এত অবধি। রিংগো এই অলংকার না ব্যবহার করলেও ছবির কোনও অসুবিধে হত বলে মনে হয় না। বরং না থাকলে আর একটু মেদ ঝরত এ ছবির। কাহিনি ‘রে’-র মূল নোঙর। লেখক রঞ্জন রে (শাশ্বত) ক্রাইম থ্রিলার লেখার বরাত পেয়ে দিরাং যায়। সেখানে দেখা হয় অরিজিৎ (কৌশিক) এবং রোমার (টিনা) সঙ্গে। অদ্ভুত একটি কাপ্‌ল। তারপর একের পর এক শকিং ঘটনা। খুনের উপর খুন। শেষে আসল ডক্টর হাজরার আগমন এবং রহস্য উদ্‌ঘাটন। ছবিটি তরতরিয়ে এগিয়ে গিয়েছে, মূলত কাহিনির গুণেই। তবে একটু ছোট হলে ভাল হত। ক্যামেরার কাজ অসাধারণ। কালার প্যালেট ও ফ্রেমগুলি অত্যন্ত ডিস্টার্বিং। ভাল লাগলেও, ক্লান্তিও এসেছে এর হাত ধরেই। অবশ্য মনোবিকারগ্রস্ত চরিত্রের চোখের সঙ্গে এই দৃশ্যাবলি যেতেই পারে। বাকি কাজ অরুণাচল সামলে নিয়েছে! কয়েকটি ছোট সমস্যা আছে। ভালুকপংয়ে ডাক পেয়ে কেন দিরাং যাওয়ার পরিকল্পনা করল রঞ্জন? তার বুকিং ইত্যাদি তো ভালুকপংয়েরই ছিল। কল্পনা বলেই কি? ওয়েটারের মৃত্যুর পর পুলিশের কোনও দেখা পাওয়া গেল না, তেমন করে খোঁজাও হয়নি। কল্পনা বলেই কি? প্রচণ্ড টেনশনেও রোমা-রঞ্জনের হাসি একটু আশ্চর্যের। ডাবিং নিয়েও অসুবিধে আছে। আর অরুণাচলে এত বেশি নেপালি-মিশ্রিত হিন্দি শুনতেও কেমন একটা লাগে। অভিনয়ে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় অসাধারণ। বিশেষত ভয়ের প্রকারভেদগুলি তাঁর মুখে দারুণ খেলেছে। যদিও ছবির শেষের দিকে একটু উচ্চকিত তিনি। যা তাঁর কাছ থেকে খুব একটা আশা করেন না মানুষ। তবে এই শাশ্বত তো বছর সাতেক আগের। কৌশিক চক্রবর্তী ঠান্ডা চোখের ভিলেন হিসেবে বেশ ভাল। ছোট পরদায় অভিনয় করার বিশেষ সুযোগ তো তাঁর ঘটে না। টিনাকে অবশ্য খুব একটা সাবলীল মনে হয়নি। তিনি শরীরী সুন্দরী ঠিকই, তবে চরিত্রে আরও শক্তিশালী অভিনয়ের প্রয়োজন। ২০১০-এ শুট হওয়ার পর এ ছবির এতদিন পড়ে কেন রইল, প্রশ্ন সেখানেই।

চেনায় অন্য সম্পর্ক

ময়ূরাক্ষী
Mayurakkhi-still

অভিনয়: প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, ইন্দ্রাণী হালদার, গার্গী রায়চৌধুরী, সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়
পরিচালনা: অতনু ঘোষ
……

‘অংশুমানের ছবি’ থেকে ‘রূপকথা নয়’, পরিচালক অতনু ঘোষের সব ছবিতেই মানুষের সম্পর্কের একটা নতুন দিক খুঁজে পাওয়া যায়। আজকের ভাঙা-গড়ার পৃথিবীতে সেই সম্পর্কের আঘ্রাণ মন ভাল করে দেয়। তাই অতনুর ছবি দেখে হল থেকে বেরনোর পর একটা রেশ থেকেই যায়। মন ভাল হওয়ার সুর বাজতে থাকে কানে। ‘ময়ূরাক্ষী’র ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই ছবিতে এমন একটা গল্প বলা হয়েছে, যা সকলের খুব চেনা। তবে সেই গল্পের ট্রিটমেন্টের কারণেই ভাল লাগে। ছবির গল্প ৮৪ বছরের বৃদ্ধ সুশোভনকে (সৌমিত্র) নিয়ে, যিনি একসময় ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডার ছিল অপরিসীম। কিন্তু বয়সের কারণে, ডিমেনশিয়া এবং কগনিটিভ ডিসফাংকশনসহ আরও বেশ কিছু নিউরোলজিক্যাল সমস্যায় ভুগছেন। তাঁকে দেখতে শিকাগোতে কর্মরত ছেলে আর্যনীল (প্রসেনজিৎ) কলকাতায় আসেন। ব্যক্তিগত জীবনে আর্যনীলও খুব একা। আর্যনীলের দুটো বিয়ে ভেঙে গিয়েছে। সুশোভনকে দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন মল্লিকা (সুদীপ্তা)। সুশোভন বর্তমানের অনেককিছু ভুলে গেলেও, অতীতের সবকিছুই মনে রাখেন। তিনি ময়ূরাক্ষীকে দেখতে চান। আর্যনীলের কাছে তিনি অনুরোধ করেন একবার যদি ময়ূরাক্ষীকে নিয়ে আসা যায়। কিন্তু ময়ূরাক্ষীর কথা শুনেই আর্যনীল কেমন যেন ভাবুক হয়ে পড়েন। কেন? কে এই ময়ূরাক্ষী? কেনই বা সুশোভন তাঁর খোঁজ শুরু করেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বরং প্রেক্ষাগৃহের জন্যই তোলা থাক। তবে এই ছবিতে গল্পের ট্রিটমেন্টের পাশাপাশি যে বিষয়টি সবচেয়ে জোরালো, তা হল সকলের অভিনয়। প্রসেনজিৎ, সৌমিত্র এবং সুদীপ্তা অসামান্য অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রসেনজিতের ছিপছিপে মেদহীন চেহারা, সঙ্গে দাড়ি, এককথায় সুপার-হট! সৌমিত্র তুলনাহীন! প্রত্যেকটি ছোট ছোট ক্ষেত্রে তাঁর অভিব্যক্তি, শরীরীভাষা অসামান্য। ছোট চরিত্রে ইন্দ্রাণী, গার্গী ও সুমনও খুব ভাল। দেবজ্যোতি মিশ্রর আবহ সঙ্গীত তারিফ করার মতো।

সাধারণত এই ধরনের ছবি মাঝে গিয়ে গতি হারিয়ে দিশাহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু ‘ময়ূরাক্ষী’ সবসময়ই বেশ টানটান। তবে ক্লাইম্যাক্স নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে। মনে হতে পারে, ছবিটা কেমন যেন হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল! তবে হয়তো এটাই অতনুর সিগনেচার স্টাইল।

রাজকীয় ক্যানভাস

অ্যামাজ়ন অভিযান
amazon-still

অভিনয়: দেব, স্বেৎলানা গুলাকোভা, ডেভিড জেমস
পরিচালনা: কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়
……

আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল ‘চাঁদের পাহাড়’-এর সাফল্য আর সেই আত্মবিশ্বাসে ভর করেই ‘অ্যামাজ়ন অভিযান’-এর দুঃসাহস দেখাতে চেয়েছিলেন পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। সেই কাজে তিনি কতটা সফল হন, তা চাক্ষুষ করতে মুখিয়ে ছিল বাঙালি দর্শক। প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিঃসন্দেহে গল্প লেখার কাজটি। প্রবল চাপেরও বটে। হাজার হোক, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুলে রাখা জুতোয় পা গলিয়ে দুঃসাহসিক অভিযানে বেরিয়ে পড়া বলে কথা! ছবি মুক্তির মাস খানেক আগে বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে প্রথম ‘গ্র্যাফিক নভেল’টি প্রকাশ করে সেই চাপ থেকে অনেকটাই মুক্তি পেয়েছিলেন গল্পকার-পরিচালক। সেই গ্রাফিক নভেলের ছবি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও, গল্পের প্রশংসাই করেছিলেন অধিকাংশ পাঠকই। কিন্তু ছবির পরিচালকের ক্ষেত্রে প্রকৃত পরীক্ষার ফল তো ছবি মুক্তির পরই পাওয়া যায়, তাই না?

১৯১৩ সালের পটভূমিতে লেখা হয়েছে গল্প। ব্যাপারটা মোটামুটি এরকম, ইতালীয় অভিযাত্রী মার্কো ফ্লোরিয়ানের (ডেভিড জেমস) মেয়ে অ্যানার (স্বেৎলানা গুলাকোভা) ডাকে সাড়া দিয়ে কেউটিয়া গ্রাম ছেড়ে শঙ্কর (দেব) বেরিয়ে পড়ে অ্যামাজ়নিয়ার এল ডোরাডোর সন্ধানে। শুরু হয়, এক মনমুগ্ধকর, রোমাঞ্চকর দীর্ঘ যাত্রা। সেটিই এই ছবির মেরুদণ্ড। আর ফুসফুসের অক্সিজেন? দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত অ্যামাজ়নিয়ায় দীর্ঘ শুটিং পর্বে সিনেম্যাটোগ্রাফার সৌমিক হালদারের তুলে আনা দৃশ্যপট! কী অপূর্ব সেই শোভা। বিশেষত এল ডোরাডোর দৃশ্যাবলি মন ভরিয়ে দেয়। শঙ্করের চরিত্রে দেব এখানে আরও অনেক পরিণত। তাঁর অভিনয় বাস্তবের অনেকটা কাছাকাছি। ডাবিংয়ের সময় যে তিনি অনেক বেশি ধৈর্যশীল ছিলেন, তা বোঝা যায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে। তবে বলতে দ্বিধা নেই, অ্যানার চরিত্রে স্বেৎলানা ও মার্কোর চরিত্রে ডেভিড এককথায় অনবদ্য। তাঁদের খুঁজে এনেছেন যিনি, তাঁকে আলাদা কৃতিত্ব দিতেই হয়। আবহসঙ্গীতের দিকটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। রবিরঞ্জন মৈত্রর সম্পাদনাও বিশেষ কৃতিত্বের দাবী রাখেন। প্রশংসার দাবীদার প্রোডাকশন ডিজ়াইনার তন্ময় চক্রবর্তীও।

তবে এতসব ভালর মধ্যেও বেশ কয়েকটি প্রশ্ন খচখচ করতে থাকে মনের মধ্যে। অভিযানের শুরু থেকেই বুলেটের বেল্টে আসল জিনিসটিই এত কম কেন? সেই বেল্ট কি তাহলে শুধুই শোভাবর্ধক? কাঠের সাঁকো ভেঙে পড়া ও সেখান থেকে তিন অভিযাত্রীর বেঁচে ফেরা দেখতে ভাল লাগে ঠিকই, কিন্তু সেই কোন ছোটবেলা থেকে পড়ে এসেছি সাঁকোর উপর দিয়ে সৈন্যদলকে মার্চ করতে দেওয়া হয় না, কারণ তাতে সেটি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তা হলে সেই যুক্তি ভুলে শঙ্কর, অ্যানা, মার্কোর মতো অভিজ্ঞ অভিযাত্রীরা তাদের সঙ্গী ঘোড়াগুলিকে নিয়ে একইসঙ্গে নড়বড়ে কাঠের সেতু পেরতে গেল কেন? জংলি উপজাতির কাছে অক্সিজেন সিলিন্ডার এল কোথা থেকে (নদীতে লাফিয়ে ম্যাপ উদ্ধারের আগে তো শঙ্করদের সঙ্গে তেমন কোনও সিলিন্ডার দেখিনি)? খালি হাতে পাহাড় চড়ার পর, পাহাড়ের উপর বন্দুকগুলিই বা এল কীভাবে? এরকম আরও বহু প্রশ্ন আছে, যার দায় কোনও মতেই এড়িয়ে যেতে পারেন না পরিচালক। গ্র্যাফিক্স কিছু ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় (জাগুয়ার পর্ব) আবার কিছু ক্ষেত্রে নেহাতই হাস্যকর (অ্যানাকন্ডার দৌড়)। জানি, বাজেট একটা বড় ফ্যাক্টর, তবু…

অবশ্য একথা স্বীকার করতেই হবে যে বাংলা ছবির ইতিহাসে এই ছবি সত্যিই এক বড় পদক্ষেপ। প্রযোজক-পরিচালকদের ধন্যবাদ, এই সাহস দেখানোর জন্য।

এমনটা আগে হয়নি

টাইগার জ়িন্দা হ্যায়
Tiger-Zinda-Hai-still

অভিনয়: সলমন খান, ক্যাটরিনা কাইফ, সজ্জাদ দেলাফ্রুজ়, পরেশ রাওয়াল, কুমুদ মিশ্র
পরিচালনা: আলি অব্বাস জ়াফর
……

এই না হলে সলমন? বলুন না, সলমন খানকে কি ফ্লপ-টপ মানায়? তিনি পরদায় আসবেন, সিটিতে হল ভরে যাবে, ঝাঁ চকচকে সিনেমা তাঁর স্টারডমে ভর করে বক্স অফিস সাগর পার করবে, এটাই তো আমাদের চেনা ওয়র্ল্ড অর্ডার! অস্ট্রিয়ার বরফে তাঁর কাঁটা পরানো জুতোর প্রথম পদক্ষেপই বলে দিচ্ছিল, ‘কারেক্ট আছে’! তবে ‘টাইগার জ়িন্দা হ্যায়’-এর ক্ষেত্রে বলার, এ ছবি একা সলমনের স্টারডমের উপর ভরসা করেনি। শুরু থেকেই একটা উৎকণ্ঠা, একটা থ্রিলের রাজত্বে ঢুকে পড়ে ছবিটি। তারপর নেকড়েদের সঙ্গে অ্যাকশন দৃশ্যটিতে মেজাজটা জমে যায় আরও। খুব আন্তর্জাতিক একটা বাস্তব চরিত্র আছে দৃশ্যগুলির। মূল কাহিনি আইসিস, ইরাক, ২০১৪-য় ঘটে যাওয়া ভারতীয় ও পাকিস্তানি নার্সদের অপহরণের ঘটনা ইত্যাদি ধরে এগিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বিভৎসতাই অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে ছবিকে। দৃশ্যাবলির গুণে ছবির মেলোড্রামাগুলিও ঢাকা পড়ে গিয়েছে। যার ফলে ‘এক থা টাইগার’-এর চেয়ে ভালই হল তার সিকোয়েল। যা-ই হোক, এই নার্সদের উদ্ধার করতে অবসর কাটিয়ে ফিরে আসে র এজেন্ট টাইগার (সলমন)। নিজের টিম নিয়ে গ্রাউন্ডে গিয়ে সে দেখে, তার স্ত্রী জ়োয়াও (ক্যাটরিনা) হাজির। তারপর ভারত এবং পাকিস্তানি এজেন্টরা একত্রে উদ্ধারকার্যে নামে (এ যুগে এটুকু দেখানোই যথেষ্ট সাহসের)। বলাই বাহুল্য শেষে আসে সাফল্য। সলমন খানের অভিনয় বেশ খারাপ, অ্যাকশন দৃশ্যে তিনি স্লথ, যুক্তির ধার একেবারেই ধারে না তাঁর চরিত্র (বিষাক্ত ধোঁয়ায় তাঁর মুখে একটি কাপড় হলেই চলে)। কিন্তু তাঁর ক্যারিজ়মার কথা তো পাঠক জানেনই। আশ্চর্যের ব্যাপার, এ ছবিতে যিনি সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন, তিনি ক্যাটরিনা কাইফ। কষ্ট, রাগ এবং অ্যাকশনে তিনি অত্যন্ত সাবলীল। সত্যি বলতে, হিন্দিতে ‘ব্ল্যাক উইডো’ বা ‘ওয়ান্ডার উয়োম্যান’কে নিয়ে ছবি হলে আর খোঁজ করতে হবে না মোটেই। ভিলেন আবু ওসমানের চরিত্রে সজ্জাদ দেলাফ্রুজ় এবং ছোট-ছোট চরিত্রে পরেশ রাওয়াল এবং কুমুদ মিশ্র বেশ ভাল। ছবিটি আর একটু ছোট হলে আর একটু টানটান হত। আর যদি ডিটেলগুলির দিকে আর একটু মন দেওয়া যেত… আহা থাক না, বরং সুপারহিরো খানের গুণগানটাই আজ হোক!

এ কোন জীবন!

সমান্তরাল
samantaral-still

অভিনয়: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, ঋদ্ধি সেন, তনুশ্রী, অপরাজিতা আঢ্য, সুরঙ্গনা, কুশল চক্রবর্তী, অনিন্দ্য বন্দোপাধ্যায়
পরিচালনা: পার্থ চক্রবর্তী
……

কলকাতার বুকে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের গল্পটা বড্ড চেনা হয়েও অচেনা। কারণ, এমন সমস্যা বুকে নিয়ে বেরাচ্ছে অনেক পরিবারই। প্রাণপণে গোপন করে চলেছে একটা কঠিন সত্যকে। সেই সত্য কখনও হঠাৎ করে বেরিয়ে আসে খবরের কাগজের পাতায়। কখনও বা পরিবারটি আজন্ম গোপন সত্যটি শেষ করে দেয় একটি জীবনকে। গল্পটা শুরু হয় অর্ককে (ঋদ্ধি) দিয়ে। সে খুব ছোটবেলায় গাড়ি দুর্ঘটনায় হারিয়েছে বাবা-মাকে। তারপর একটা বয়স অবধি মামাবাড়িতে কাটিয়ে চলে যায় বোর্ডিং স্কুলে পড়তে। তারপর দাদুর (সৌমিত্র) ইচ্ছেয় আবার কলকাতায় এসে কলেজে ভর্তি হয়। থাকতে শুরু করে মামাবাড়িতে। থাকা মাত্রই টের পেতে থাকে কোথাও যেন সুর কাটছে। আর এই সুর কাটছে মেজমামা সুজনকে (পরমব্রত) নিয়ে। সুজন ঠিক স্বাভাবিক নয়। তাকে বাড়ি থেকে বের করা হয় না। কারও সামনে আনা হয় না। এমনকী, সুজনের ছোট ভাই কৌশিক (অনিন্দ্য) তাকে পেটায়। পাগলাগারদে পাঠাতে চায়। আর এটাই বুঝতে পারে না অর্ক। কেন মেজমামার মতো সমুদ্র হৃদয়ের মানুষটিকে বাড়ির বাইরে বের করা হয় না? কেন-ই বা তাকে সায়কিয়াট্রিস্ট দেখানো হয় না? কেন-ই বা মাঝে-মাঝে বাড়ি থেকে পালিয়ে কুমোরটুলিতে গিয়ে কাঁচা মাটির মূর্তির গায়ে হাত বোলায় সুজন? উত্তর খুঁজতে গিয়ে অর্কর সামনে উঠে আসে এক কঠোর বাস্তব। সেই বাস্তবকে লুকোতে গিয়েই এক শিক্ষিত পরিবার শেষ করে দেয় একটা মানুষের জীবনকে। সুস্থ মানুষকে বানিয়ে দেয় অসুস্থ। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সুচারুভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরমব্রত কয়েকটি দৃশ্যে চমৎকার। মার্জিত অভিনয় করেছেন তিনি। ঋদ্ধি এবং তাঁর বান্ধবীর ভূমিকায় সুরঙ্গনা যথাযথ। ভাল লাগে অপরাজিতাকেও। অনিন্দ্যর অতিরিক্ত খলনায়কপনা মাঝে-মাঝে বিরক্তি জাগায়। প্রতি মুহূর্তে শয়তানি বোধহয় খোদ শয়তানও করে না। ছোট্ট ভূমিকায় তনুশ্রীকে মানিয়েছে। তবে একটাই খটকা লাগে। তাঁর চরিত্র ‘পিয়া’ তো হাজ়ব্যান্ড কৌশিকের সমস্ত কাজের ব্যাপারেই ওয়াকিবহাল। তাহলে হঠাৎ করে তাঁর মধ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এল কেন? ঠিক তেমনই বোঝা গেল না, সুজনকে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে দেওয়ার পর হঠাৎ কেন সে বেহালা বাজাতে বসে পড়ল এবং কেন-ই বা কতগুলো লোক এসে তাকে টানাটানি করতে লাগল। কৌশিকের বাড়াবাড়ির সামনে বাড়ির কর্তাসহ বাকিরা কেনই বা অসহায় বোঝা গেল না। ফার্স্ট হাফটা ভাল লাগলেও, সেকেন্ড হাফ অগোছালো। পরিচালক আরও একটু গোছাতে পারতেন। তবে তাঁর ভাবনাটি সত্যিই অন্যরকম। এই ভাবনাটিকে পরদায় আনার জন্য তাঁকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। ছবির গানও বেশ ভাল। ছবির শেষটা মনখারাপ করায়। তবে এটাও ঠিক, এই গল্পের তো এই পরিণতিই হয় আজকে ২০১৭ দাঁড়িয়ে। জানি না, কবে গিয়ে একটু অন্যরকম হবে শেষটা? আমরা কবে নারী-পুরুষের বাইরে গিয়ে মানুষের কথা ভাবতে পারব?

মিষ্টি ছবি, বড্ড বাস্তবও…

তুমহারি সুলু
tumari-sulu-still

অভিনয়: বিদ্যা বালন, মানব কল, নেহা ধুপিয়া, বিজয় মৌর্য
পরিচালনা: সুরেশ ত্রিবেণী
……

বিদ্যা প্রমাণ করলেন, তিনি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, তিনি অপ্রতিরোধ্য, তিনি অভিনয় বিষয়টিকে গুলে খেয়েছেন। পাঠক আপনি নিশ্চয় বিদ্যার প্রতি আমার এই বাঁধনছাড়া আবেগে খানিকটা বিরক্তই হয়েছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ‘তুমহারি সুলু’ দেখে আসার পর আপনারও ঠিক আমার মতোই হাল হবে। পুরো ছবি জুড়ে বিদ্যা বালন, এবং তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন ভাল গল্প পেলে বিদ্যা কী করতে পারেন। মুম্বইয়ের শহরতলিতে সুলুর (বিদ্যা) স্বামী আর পুত্রকে নিয়ে সংসার। স্বামী অশোক (মানব) ভারী ভালমানুষ, সুলুর সব পাগলামি, সব কাজেই সাপোর্ট সিস্টেম তিনি। ছেলে প্রণবও মিষ্টি ছেলে। সুলুর কাজ হল রেডিয়োর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এবং জেতা। এমনভাবেই একটি প্রতিযোগিতায় প্রেশারকুকার জিতে রেডিয়ো অফিসে যায় পুরস্কার আনতে। সেখানেই গিয়েই দেখে চ্যানেলটি আর জে নেওয়ার বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। ব্যস সুলুর মাথায় আইডিয়া দানা বাধে। সেও হবে আরজে। চ্যানেল হেড মারিয়ারও (নেহা ধুপিয়া) মনে হয় সুলু কিছু করতে পারবে। লেট নাইট শোয়ের আরজে হয় সুলু। তারপরেই ঝামেলা শুরু হয়। সাপোর্টিভ হাজ়ব্যান্ড অশোক কোথাও গিয়ে ইনসিকিয়োরিটিতে ভুগতে থাকে। পরিবারের বাকিরা (সুলুর দুই দিদি ব্যাঙ্কে চাকরি করলেও, সুলুর চাকরিটিকে ঠিক ভদ্র বলে মনে করতে পারে না) চাকরি ছাড়ার জন্য চাপ দিতে থাকে সুলুকে। তাহলে সুলু কি চাকরি ছেড়ে দিয়ে আবার সংসারে মন দেবে? বিদ্যা একদিকে স্ট্রিট স্মার্ট হাউজ়ওয়াইফ অন্যদিকে আর জে দুনিয়ায় বেমানান ‘শাড়ি পরা আন্টি’, দুই ভূমিকায় জাস্ট ফাটিয়ে দিয়েছেন। সকালে স্বামী আর পুত্রের জন্য টিফিন প্যাক করার সঙ্গে-সঙ্গে মধ্যরাতে রেডিয়োর ওপারে ‘সেক্সি’ গলায় পুরো মুম্বই কাঁপানো, এমন চরিত্র বিদ্যাকেই মানায়। কিন্তু কোথায় গিয়ে গল্প খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ে (অস্বীকার করার উপায় নেই, যেখানেই গল্প দুর্বল, সেখানে কুম্ভের মতো লড়ে আবার গল্পকে ট্র্যাকে নিয়ে এসেছেন বিদ্যা)। যেমন বোঝা যায় না, প্রণব হঠাৎ করে কেন খারাপ হয়ে যায়? বোঝা যায় না অশোকের মেল ইগোর কারণটা? তবে অশোকের ভূমিকায় মানবও বেশ ভাল। বিদ্যার পার্টনার হিসেবে তিনি অনবদ্য। ছোট্ট ভূমিকায় নেহা এবং বিজয়কে ভাল লাগে। ছবির গানও ভাল। দ্বিতীয়ার্ধে গল্প খানিকটা গতি হারায়। কিছু প্রশ্নর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে বিদ্যা থাকতে ভয় কি? অতএব মধ্যবিত্ত সমাজকে দেখতে চাইলে, আজকের দিনে মেয়েরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, মেয়েরা ঠিক কী চাইছে, সেটা জানতে হলে বিদ্যার ‘সুলু’কে দেখতেই হবে। আর হ্যাঁ নবাগত পরিচালক হিসেবে সুরেশ ত্রিবেণী গ্রেসমার্কস পাবেন।