Category Archives: review detail

হয়েও যেন হল না

ফিদা

fida-still

পরিচালনা: পথিকৃৎ বসু

অভিনয়ে: যশ, সঞ্জনা

প্রেম বনাম ইগো – এই দন্দ্ব নিয়েই পথিকৃৎ বসু পরিচালিত ছবি ‘ফিদা’। ছবিতে দুই ভিন্ন প্রকৃতির মানুষকে দেখি আমরা। একদিকে ঈশান (যশ) যে স্বভাবতই অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও বেপরোয়া। সে গোটা জীবনটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে। মদ নিয়ে ট্রেনে ওঠা থেকে মনের মেয়েটির মুখ থেকে সেই তিনটি শব্দ বার করার জন্য তাকে মাসের পর মাস ধাওয়া করা – কোনও চ্যালেঞ্জ থেকেই সে পিছপা হয় না। অপরদিকে খুশি ( সঞ্জনা) যে অনেক বাস্তববাদী ও বিচক্ষণ। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাতুর মানুষ হয়েও তারা অবিলম্বেই প্রেমে পড়ে। কিন্তু দু’জনের ভিন্ন প্রকৃতি ও কিছু ভুল বোঝাবুঝির দরুন প্রেমে দাঁড়িও পড়ে। দীর্ঘ ছ’বছর পর পরিস্থিতির ফেরে তারা আবার মুখোমুখি হয় লন্ডনে। আবার কি তারা মিলিত হবে? এই গল্প নিয়েই এগোয় ছবি।

গল্পে তেমন নতুনত্ব কিছু নেই। থোড় ব়ড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। এই বছরেই মুক্তি পাওয়া তেলেগু ছবি ‘থোলি প্রেমা’র সঙ্গে আশ্চর্যরকম সাদৃশ্য আছে এই ছবির। সে থাক। টলিউডে দক্ষিণী সিনেমা থেকে ‘ইনস্পায়ার্ড’ ছবি এই প্রথম বা শেষ নয়। তা সত্ত্বেও ছবির প্রথম দিকে ঈশান ও খুশির প্রেম পর্ব বেশ মজারই লাগে। আবেগপ্রবণ ও রগচটা ঈশানের রোলে টলিউডের আ্যংগ্রি ইয়ং ম্যান যশকে ভালই লেগেছে। প্রেম নিবেদন থেকে মারপিটে ভিলেনদের কুপোকাত করা প্রায় সব দৃশ্যেই তিনি সাবলীল। যদিও কোনও-কোনও দৃশ্য ধারাবাহিকে তাঁর বিখ্যাত ভূমিকা অরণ্য সিংহরায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। নবাগতা সঞ্জনা বেশ সুন্দরী। তবে ক্যামেরার সামনে এখনও স্বতঃস্ফূর্ত নন। অভিনয় বা নাচ দুটোতেই জড়তা স্পষ্ট। ঈশানের বন্ধুদের রোলে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় ও সৌরতি বন্দ্যোপাধ্যায় যথাযথ। সৌভিক বসুর দক্ষ সিনেমাটোগ্যাফির দৌলতে লন্ডন দর্শন একটা বাড়তি পাওনা।

সমস্যা হয় দ্বিতীয় অর্ধে এসে। ইন্টারমিশনের পর, দুর্বল চিত্র সম্পাদনার দরুন গল্প খেই হারিয়ে ফেলে। অগুন্তি ফ্ল্যাশব্যাক এবং বেশ কিছু অপ্রোয়জনীয় দৃশ্য, বর্ণ-বৈষম্যের সাব-প্লট ইত্যাদি মিলিয়ে দ্বিতীয় পর্বটি দর্শককে ক্লান্ত করে। অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় এর আগে ‘বোঝে না সে বোঝে না’, ‘ওয়ান’ ইত্যাদি ছবিতে চিত্তাকর্ষক সুর দিলেও – এই ছবিতে কোনও মনে রাখার মতো গান দিতে পারেননি।

‘পয়সা-উসুল’ ছবির সমস্ত উপকরণ থাকলেও কিছু ত্রুটির জন্য ‘ফিদা’-তে ফিদা হওয়া হল না।

ভাগশেষে ভাল থাকা?

ভাগশেষ

bhagsesh-still

পরিচালকঃ রেমা বসু

অভিনয়েঃ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মালবিকা সেন, শুভ্রজিৎ দত্ত, অম্বরীশ ভট্টাচার্য, প্রিয়ঙ্কা সরকার, কৌশিক রায়

মাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, প্রেম এবং অসম প্রেমের রসায়নে তৈরি নবাগতা পরিচালক রেমা বসুর ‘ভাগশেষ’। মধুমন্তী (মালবিকা সেন), অমিত (শুভ্রজিৎ দত্ত) আর বিশ্বজিৎ (অম্বরিশ ভট্টাচার্য)-এর বন্ধুত্ব দিয়ে সিনেমার শুরু হলেও, সম্পর্কের জটিলতা ঘুরে ফিরে সিনেমার মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। অমিতের মেয়ে পূজার দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে মধুমন্তী কোনও দ্বিধা করেনি, একজন ‘নন্-বায়োলজিক্যাল মাদার’ হয়ে, রক্তের সম্পর্কের বাইরে থেকেও পূজার প্রতি যাবতীয় দায়িত্ব সে পালন করেছে…পূজাকে দিতে চেয়েছে মা-এর ভালবাসা, স্নেহ…কিন্তু সম্পর্কের রসায়ন একরৈখিক নয়। তাই বোধহয় অমিত যেমন শেষপর্যন্ত মধুমন্তীর পাশে থাকেনি, তেমনি পূজাও কোনওদিন মায়ের এই ভালবাসার আস্বাদটুকু নিতে পারেনি, ভুল বুঝেছে মধুমন্তীকে… সিনেমাতে সম্পর্কের কয়েকটি পর্যায় রয়েছে, সময় পেরিয়ে ১৫ বছর পরের ঘটনাচিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে এসেছে কলেজের অধ্যাপক সিদ্ধার্থের(কৌশিক রায়) প্রতি পূজার (প্রিয়ঙ্কা সরকার) আবেগ, প্রেম আর ভালবাসা… মধুমন্তী কিন্তু মেয়ের সম্পর্ককে মেনে নিয়েছে অত্যন্ত সহজ এবং স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু এই মেনে নেওয়ার পরিণতি যে ঠিক কীরকম, তা দর্শকদের জন্যই তোলা থাক। সিনেমা জুড়ে সম্পর্কের যে পর্যায় দেখানো হয়েছে, তা কিন্তু বেশ খাপছাড়া… অনেক বছরের বন্ধুত্ব হঠাৎ করে বৈবাহিক সম্পর্কে যেতে গেলে যে ভিত প্রয়োজন, তা কিন্তু গল্পে স্পষ্ট হয়নি। অমিতের হঠাৎ করেই মধুমন্তীকে ছেড়ে চলে যাওয়ার মধ্যেও কোন যৌক্তিকতা নেই…গল্পের প্লটটিকে যেন জো়র করে কোথাও মেলানো হয়েছে। যুক্তি, বিচারবোধ অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ। অভিনয়ের ক্ষেত্রেও মেলোড্রামাটিক পরিবেশ তৈরি করে দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করা হলেও তা কিন্তু অনেকাংশেই ব্যর্থ প্রচেষ্টা বলেই মনে হবে। সংলাপের ক্ষেত্রেও পরিচালকের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন ছিল।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে মালবিকা রায়ের অভিনয় খুব যথাযথ বলা যায় না, স্ক্রিপ্টের কারনেই মাত্রাতিরিক্ত অভিনয় অতিনাটকীয় পরিবেশ তৈরি করেছে…অমিতের ভূমিকায় শুভ্রজিৎ-এর অভিনয় বেশ খাপছাড়া…সিনেমার প্রথম অংশটি যেন ছন্দহীনভাবে এগিয়েছে। দ্বিতীয় অংশে পূজার ভূমিকায় প্রিয়ঙ্কার অভিনয় বেশ ভাল, অধ্যাপকের চরিত্রে কৌশিকের অভিনয়ও বেশ নজর কাড়ে। স্বল্পদৈর্ঘ্যের চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম। তবে সিনেমাতে অম্বরীশের অভিনয় বেশ ভাল, সাহিত্যিক স্বরূপ আচরণ থাকলেও ক্লিশে সংলাপে চরিত্রটি অনেকাংশেই ম্লান… সিনেমার গানগুলি বেশ ভাল।

মোটের উপর সিনেমাতে অনেক উপকরণ থাকলেও শেষপর্যন্ত যথার্থতা পায়নি… শেষের অংশটিও অত্যন্ত তাড়াতাড়ি মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইনি জটিলতা যে এত তাড়াতাড়ি মেলানো যায় তাতে বেশ অবাকই লাগে…নন্-বায়োলজিক্যাল এক মায়ের স্ট্রাগল গল্পের বিষয়বস্তু হলেও উপযুক্ত উপস্থাপনা লক্ষ্য করা গেল না।

রংগুলো ফিকে থেকে গেল…

কালার্স অফ লাইফ

colours-of-life-big

পরিচালকঃ প্রকাশ ভরদ্বাজ

অভিনয়েঃ ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, প্রিয়াংশু চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক সেন, পায়েল রায়

পুরো ছবি জুড়ে দর্শককে কাঁদাতেই চেয়েছিলেন পরিচালক। কিন্তু চোখের জলও বেরোতে গিয়ে বোর হয়ে আবার ফিরে গেল। যে কোনও দৃশ্য, তা সে যতই স্পর্শকাতর হোক না কেন, বেশিক্ষণ টানলে কি আর ভাল লাগে? ইমোশনাল দৃশ্যগুলির সংলাপ থেকে শুরু করে হাঁটাচলা, সবই এত ধীর গতির যে, ছবি দেখতে-দে‌খতে মনে হয় নিজেই উঠে গিয়ে দৃশ্যটা শেষ করে দিয়ে আসি। তার উপর যেটা বোঝা গেল না সেটা হল, পরিচালক এটাকে ইংরেজি ছবি কেন করতে গেলেন? বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবার, তারা পাঁচটা বাংলা বাক্যের মধ্যে একটা ইংরেজি বাক্য বলতেই পারে, কিন্তু উলটোটা হয় কি? বিশেষ করে ছবির কোনও অভিনেতা-অভিনেত্রীর ইংরেজি উচ্চারণই যখন নির্ভুল নয়! না, ছবির সব কিছু মোটেই খারাপ নয়। ভালতেও আসছি। আগে গল্পটা একটু দেখে নেওয়া যাক।

বাবা-মা-মেয়ের সুখের সংসারে একদিন হঠাৎ নেমে আসে দুর্যোগ। চন্দ্রিমার (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত) স্বামী (প্রিয়াংশু চট্টোপাধ্যায়) মারা যায় একটি গাড়ি দুর্ঘটনায়। মেয়ে এষার (পায়েল রায়) বয়স তখন ১০। সেই থেকে চন্দ্রিমার লড়াই শুরু, নিজে বেঁচে থাকার, মেয়েকে বড় করার, এবং সিঙ্গল পেরেন্টের পাহাড়প্রমাণ দায়িত্ব মাথায় নেওয়ার। ফলে যা হওয়ার তাই হয়, মেয়ের ব্যাপারে ভীষণরকম ওভার প্রোটেকটিভ হয়ে যায় চন্দ্রিমা। বেড়ে ওঠার সময়টায় কোনওদিন নিজের মত প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না এষাকে। তাই বাইরের পৃথিবীটা কেমন, কেমন করেই বা সেখানে বেঁচে থাকতে হয়, সেই শিক্ষার অভাব থেকে যায় এষার জীবনে। এবং বাবার প্রিয় ছোট্ট মেয়েটা অতিরিক্ত শাসনের ফলে ক্রমে মনে-মনে দুরে সরতে থাকে মায়ের থেকে। তারপর একদিন সেই মেয়ে বড় হয়, এবং জীবন তাকে দাঁড় করিয়ে দেয় কলেজের দোরগোড়ায়। এই প্রথম মুক্তি! কিন্তু ছোটবেলা থেকে যে মেয়েটা কোনওদিন নিজের মতো থাকতে পারেনি, এই হঠাৎ পাওয়া স্বাধীনতার কতটা ভাল আর কতটা খারাপ, সেটা সে বুঝতে পারবে কি? বাকিটা হলে গিয়ে দেখবেন।

ছবিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ডিপ্রেশনের মতো মানসিক (সামাজিকও) সমস্যাকে বেশ দায়িত্ব নিয়ে দেখানো। এ ছাড়া ছবিটির বিশেষ প্রাপ্তি অভিনয়। একদিকে মেয়েকে কড়া শাসনে রাখা ও অন্যদিকে মেয়ের জীবনে আছড়ে পড়া ভয়ঙ্কর ঝড়ে নিজের জীবনও ওলটপালট হয়ে যাওয়া চন্দ্রিমার ভূমিকায় ঋতুপর্ণা একেবারে যথাযথ। এষার বাবার ভূমিকায় স্বল্প দৈর্ঘ্যের চরিত্রে, বাবা-মেয়ের মিষ্টি সম্পর্ককে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন প্রিয়াংশু। ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কৌশিক সেনও ভাল। তবে বছর কুড়ির এষার সঙ্গে মধ্যবয়সী সাইকোলজিস্ট অরুণাংশুর কথোপকথন ও সম্পর্কের মধ্যে ভীষণভাবেই দেখা যায় ‘ডিয়ার জ়িন্দগী’ ছবির আলিয়া-শাহরুখের ছায়া। আলাদা করে বলতে হয় এষার ভূমিকায় পায়েলের কথা। একদিকে লাগামছাড়া বাইরের জীবন, অন্যদিকে ভীষণ নরম মনের একটা মেয়ে… এককথায় পায়েল অনবদ্য। জীবনের এবং চরিত্রের বিভিন্ন রং সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পায়েলই। অভিনেতারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। শুধু স্ক্রিপ্ট এবং গল্প বলার ধরন যদি আরও ভাল হত, তবে নিঃসন্দেহে দর্শকের মনে দাগ কাটত ছবিটি। তবে গল্পের শেষটায় ওরকম মেলোড্রামার বন্যা বইয়ে না দিলেও চলত!

একটু গতি হলে…

সোনার পাহাড়

sonar-pahar-still

পরিচালকঃ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়

অভিনয়েঃ শ্রীজাত, তনুজা, যিশু, পরমব্রত, অরুণিমা, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

সাধারণত বার্ধক্য নিয়ে ছবি করতে গেলেই একটা একপেশে মর‌্যালিটি, ভিকটিমাইজ়েশন, দুঃখের কাহিনি দেখানো হয়। বৃদ্ধরা একা, নবীনরা স্বার্থপর, ভিলেন… এমনটাই থাকবে। সেভাবে শুরু হলেও, সিমপ্যাথি টানলেও এই ছবিটি অন্যরকম। পরিচালক পরমব্রতকে ধন্যবাদ, তিনি চর্বিত চর্বন করেননি। বরং মা ও ছেলের সম্পর্কের একটি ছবি তৈরি করেছেন। উপমার (তনুজা) দিক থেকে ছবিটি শুরু করলেও, জানলার দু’টি দিকই দেখিয়েছেন তিনি। একজন হেল্পের সঙ্গে একা থাকেন উপমা, তাঁর ছেলে-বউ আলাদা থাকে। একদিন উপমা পড়ে যাওয়ার পর, ফিজ়িওথেরাপিস্ট নিয়ে হাজির হয় এনজিও কর্তা রাজদীপ (পরমব্রত)। তারই হাত ধরে উপমা সঙ্গে দেখা হয় বিটলুর (শ্রীজাত)। অনাথ, অসুস্থ বাচ্চাটি বৃদ্ধা উপমার সঙ্গে সময় কাটাতে আসে। দুষ্টু বিটলুর সঙ্গে শিগগিরই বন্ধুত্ব হয়ে যায় তার ‘উমা’র। বিটলু খুঁজে পায় উমার গল্প লেখার খাতা। তারপর গল্প শোনার টানে দু’জন ভেসে যায়। একদিন হঠাৎই বিটলু-উমা পাড়ি দেয় সোনার পাহাড়ের উদ্দেশে। সোনার পাহাড় দেখতে পেলেই সব কষ্টের অবসান! ছবিতে খারাপ বলার মতো বিশেষ কিছু নেই। দু’-একটি এদিক-ওদিক থাকলেও তা বলার মতো নয়। ছবিতে আবেগের ছড়াছড়ি নেই, মেলোড্রামা নেই, বেশ বাস্তব লেগেছে ঝগড়ার দৃশ্যগুলি। কিন্তু ছবিটির কোনও উত্তরণ হয়নি। ওঠাপড়ার অভাবের কারণে বেশ ধীর এবং অকারণ দীর্ঘও মনে হয়েছে। যিশু, পরমব্রত, বাবানের স্ত্রীয়ের ভূমিকায় অরুণিমা, সবাই যথাযথ। তনুজার কথার টান একটু কানে লাগলেও, রাগী তিরিক্ষে মেজাজে তিনি সাবলীল। কিন্তু এই ছবির আসল নায়ক শ্রীজাত। অতিরিক্ত পাকামি ছাড়া, দুষ্টু এবং প্রচণ্ড মিষ্টি বিটলুর চরিত্রে সে অনবদ্য। অত্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিক লেগেছে তাকে। সে-ই এই পাহাড়ের সোনা। শুধু তার জন্যই এই ছবিকে কিছু নম্বর বেশি দেওয়া গেল।

পথ দেখাতে গিয়েও মিলিয়ে গেল

আলেয়া

aleya-still

পরিচালকঃ হুমায়ুন কবীর, অনিকেত চট্টোপ্যাধ্যায়

অভিনয়েঃ তনুশ্রী চক্রবর্তী, প্রিয়ঙ্কা সরকার, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, খরাজ মুখোপাধ্যায়

জায়গাটা টাকি-হাসনাবাদ, গল্পটা একজন… না একজন নয়, চারজন মেয়ের। যারা আসলে বাল্য সহচরী। তাদের মধ্যে একজন খুন হয়। আর তারপরেই…

আই পি এস অফিসার হুমায়ুন কবীর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কলম ধরেছিলেন। লিখে ফেলেছিলেন এই নামের গোটা একটা উপন্যাস। তারপর নিজের ডিরেকশন আর অনিকেত চট্টোপ্যাধ্যায়ের ক্রিয়েটিভ ডিরেকশনে তার চলচ্চিত্রায়ণ… দেখতে বসে মনে হয় ব্যাপারটা শুধু উপন্যাস থাকলে খুব একটা ক্ষতি হত না। প্রথমেই আসি অভিনয়ের কথায়, এস আই সুমনা রায়ের ভূমিকায় তনুশ্রী চক্রবর্তী অভিনয় করেননি। যেটা করেছেন, সেটা বেশ অতিনাটকীয়! সাহসী পুলিশ অফিসারের চরিত্র চিত্রণের জন্য এতটা লাউড হওয়াটা কি বাঞ্ছনীয়? প্রিয়ঙ্কারও বিশেষ অভিনয় করার কোনও জায়গা ছিল না। তাও প্রতিকূল পরিস্থিতির ভিক্টিম হিসেবে তিনি বেশ মানানসই। খরাজের অভিনয় দেখতে-দেখতেও মনে হচ্ছিল, সেই এক স্টিরিওটাইপে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলছেন। তুলনায় অল্প সময় স্ক্রিনে থাকা বাদশা মৈত্রের অভিনয় বেশ ভাল। আলাদা করে বলতে হয় সায়নী ঘোষের কথা। তনুশ্রীর বান্ধবী হিসেবে তাঁর অভিনয় ভাল লাগে। তবে চোখ টেনে নেয় কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের বিনয়ী কিন্তু ভণ্ড বৈষ্ণবের চরিত্রটি। এতটাই নিখুঁত তাঁর অভিনয় যে, দেখতে দেখতে সত্যি-সত্যিই গা রি-রি করে ওঠে! গল্পের কথা আলাদা ভাবে কিছু বলার নেই, ধীরগতির ফ্ল্যাট স্টোরিলাইন পুরোটাই তনুশ্রীকে কেন্দ্র করে ঘুরেছে। সমাপতনগুলো পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ঠেকে না। তনুশ্রী আর প্রিয়ঙ্কার জলের নীচে ডুবে যাওয়ার দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি বেশ বিরক্তিকর। পরিচালকদ্বয় সম্ভবত গুলিয়ে ফেলেছিলেন ঠিক কী ধরনের ছবি বানাবেন। এই সংশয়ের ফলেই হঠাৎ করে সিরিয়াস মুহূর্তে রোম্যান্টিক গানের খাপছাড়া প্রবেশ ঘটেছে। তনুশ্রীর বয়ফ্রেন্ডের এবং হঠাৎ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অপ্রয়োজনীয় অবতারণা বেশ খারাপ লেগেছে। তবে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে শেষ করা এই ছবির শেষ দৃশ্যটি মন ছুঁয়ে যায়। সেটি যেমন ফিল গুড অনুভূতি দেয়, তেমনই গোটা ছবি জুড়ে পুলিশ কর্মচারীদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখে খানিকটা বেমানানও ঠেকে। তবে একথা মানতে হবে, ছবির মধ্যে সামাজিক বার্তা রয়েছে এবং তা বর্তমান সমাজের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়কে তুলে ধরেছে। কিন্তু সামাজিক বার্তা দেওয়া আর ছবি বানানোর ভারসাম্য বজায় রাখাটা তো এক জিনিস নয়। মোদ্দা কথা, ‘আলেয়া’ নিজের গা থেকে উপন্যাসের গন্ধ ঝেড়ে ফেলতে পারেনি, তাই ছবি দেখতে দেখতে মনে হয় এর চেয়ে বইটা পড়লেই বোধ হয় বেশি ভাল…

সঞ্জুর অনেক জীবন… কিন্তু বর্ণময় নয়!

সঞ্জু

sanju-still

পরিচালকঃ রাজকুমার হিরানী

অভিনয়েঃ রণবীর কপূর, ভিকি কৌশল, অনুষ্কা শর্মা, দিয়া মির্জ়া

একজন অভিনেতার জীবন। সেটি বর্ণময়। তার জীবনে মাদকাসক্তি আছে, টাডা আইন আছে, জেল আছে, একাধিক নারীসঙ্গ আছে, অন্ধকারে তলিয়ে গিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে আসা আছে… সেই জন্যই বোধ হয় সঞ্জয় দত্তকে নিয়ে সাধারণ মানুষের এত আবেগ। আন্ডার ওয়র্ল্ডের সঙ্গে সংযোগের ফলে ‘খলনায়ক’ থেকে ‘নায়ক’ হয়ে ওঠা মানুষটির জীবনে ঘটনার কমতি নেই। ফলে তাঁর জীবন নিয়ে যখন রাজকুমার হিরানীর মতো পরিচালক সিনেমা করছেন বলে ঘোষণা হয়েছিল, তখন রাজযোটক ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। উপরি পাওনা হিসেবে ছিলেন রণবীর কপূর। চলনে-বলনে-দেখায়-সংলাপে তাঁকে ‘সঞ্জয়’ বলেই মনে হয়েছিল। ফলে সিনেমা হলে ঢোকার সময় ট্রেলরের ভাষায় ‘সিটবেল্ট বেঁধে’ বসার মতোই অবস্থা ছিল। কিন্তু ‘সঞ্জু’ দেখা শেষ হওয়ার পর মনে হল, খানিকটা উত্থান-পতন থাকলে মন্দ হত না। আসলে ‘সঞ্জু’র মূল সমস্যাটি হলেন রাজকুমার হিরানী। হ্যাঁ, অবাক হবেন না। যিনি ‘মুন্নাভাই’, ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘পিকে’র মতো ছবি দিয়েছেন, তিনি এই ছবির সমস্যা। আসলে রাজুর ছবিতে যে সিগনেচারটি থাকে, দর্শক তাঁর প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাবেন, কাঁদবেন, হাসবেন… সেটি ‘সঞ্জু’তে নিরুদ্দেশ। ফলে ‘সঞ্জু’ মাদকাসক্ত হলে, পিতার সঙ্গে জাহাজের ডকে গান গাইলে, জেলে গেলে, এমনকী, পিতার চিতায় আগুন দিলেও, আপনি একাত্ম হবেন না। মনে হবে না গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আটকে রয়েছে। তাছাড়া, যে মানুষটির জীবন এত বর্ণময়, তাঁর জীবনের আসল জিনিসগুলোই তো মিস করেছেন রাজু! ছবির শুরুর দিকে ‘সঞ্জু’ বলে প্রায় ৩৫০ জন মতো নারীর শয্যাসঙ্গী হয়েছে সে। প্রেমও এসেছে প্রচুর। অথচ একমাত্র ‘রুবি’ (সোনম) এবং ‘মান্যতা’ (দিয়া) ছাড়া সঞ্জুর আর কোনও প্রেমই দেখাননি পরিচালক। মাধুরী দীক্ষিতের কথা বাদ দিন। সেটা না হয় বিতর্কিত। কিন্তু সঞ্জয়ের প্রথম দুই স্ত্রী রিচা এবং রিয়া… কারও অস্তিত্বই দেখাবেন না পরিচালক? এমনকী, বাবরি মসজিদ ধ্বংস, বম্বে ব্লাস্টের সঙ্গে সঞ্জুর এ কে ৫৬ সঙ্গে রাখার সম্পর্কটিকেও বেশ সরল করেই দেখানো হয়েছে! আর গোটা ছবিটি আটকে গিয়েছে, দুই বন্ধুর (সঞ্জু ও কমলি) মিলন এবং ‘আমি টেররিস্ট নই’-এর জাঁতাকলে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। সঞ্জয় দত্তের ইমেজকে অহেতুক গৌরবান্বিত করার একটা চেষ্টা হয়েছে ‘সঞ্জু’ জুড়ে। প্রথমদিকে সঞ্জুর মাদকাসক্ত হওয়া বা ‘রকি’র সময়টার ঘটনায় যতটা সময় দিয়েছেন পরিচালক, পরে সঞ্জুর জীবনের বাকি ঘটনাগুলোর দিকে সেভাবে দেননি। ফলে জেলের ভিতরে সঞ্জুর অসহায়ত্ব, অন্ধকার জগতের সঙ্গে সংযোগ… সব উপর-উপর হয়েই থেকে গিয়েছে।

কিন্তু ওই যে, লেখার শুরুতেই বললাম, রাজযোটক হয়েছিল। সঞ্জয়ের জীবন, রণবীর কপূরের মতো অভিনেতা… অনেকগুলি রসদ নিয়ে বেশ এগিয়ে শুরু করেছিলেন রাজু। রণবীর এই ছবিতে চমৎকৃত করেছেন। দেখার দিক থেকে তিনি কতটা ‘সঞ্জয়’ হয়ে উঠেছেন, সেটা তো আগেই বলেছি, অভিনয়েও তাক লাগিয়েছেন। তিনি যে জাত অভিনেতা, সে বিষয়ে তো কোনও সন্দেহ নেই! কিছু-কিছু জায়গায় তাঁর অভিনয় রীতিমত গায়ে কাঁটা লাগিয়েছে। তাঁর যন্ত্রণা, স্টারডম, নেশাতুর অবস্থা, বাবার প্রতি অব্যক্ত ভালবাসা… আস্ত ‘সঞ্জয়’কেই যেন নিজের শরীরে ধারণ করেছিলেন রণবীর। অবশ্য সঞ্জয়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় কতটা মিমিক্রি, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে দেখলে রণবীর অসাধারণ। যোগ্য সহায়তা করেছেন ভিকি কৌশলও। ‘কমলি’ চরিত্রে রণবীরের সঙ্গে ভিকি যেভাবে পাল্লা দিয়েছেন, তাতে মুখ থেকে আপনা আপনিই ‘বাহ্’ বেরোবে। সুনীল দত্তের চরিত্রে ভাল লেগেছে পরেশ রাওয়লকেও। তবে অনুষ্কা, দিয়া, সোনমরা চিত্রনাট্যের চাহিদা মিটিয়েছেন মাত্র। এমনিতে ছবির চিত্রনাট্য, সঙ্গীত বা সম্পাদনা নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। তবে রাজু বেশ কিছু মুহূর্ত তৈরি করেছেন এই ছবিতে। কমলির সঙ্গে সঞ্জুর বন্ধুত্বের বেশ কিছু জায়গা… বাবাকে লেখা চিঠি পড়ার দৃশ্যটা… রাজুর পুরনো স্টাইলের ঝলক দিয়েছে। কিন্তু মুশকিল হয়েছে রাজুর ছবিটিকে খুব সাধারণ বলিউ়ডি ছবি হিসেবে তৈরি করেছেন। ‘মুন্নাভাই এম বি বি এস’-এর ফুটেজ ব্যবহার করে হাততালি কুড়োনো তারই প্রমাণ। ফলে ‘সঞ্জু’ রক্তমাংসের সঞ্জয় হয়ে কখনওই ধরা দেয়নি। একজন ভাল মানুষ পরিস্থিতির শিকার… এটা শেষ পর্যন্ত দর্শকের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যভাবে জারিতও করতে পারেননি পরিচালক। আর এখানেই, কেরিয়ারে প্রথমবার হোঁচট খেয়েছেন রাজকুমার হিরানী।

বিঃদ্র: সংবাদমাধ্যম বা খবরের কাগজকে অহেতুক গালাগালি করে কোনও লাভ হল কি? ছবির শেষে একটি গানও রাখা হয়েছে সেই মর্মে। কিন্তু যা ছাপা হয়, তার বেশিটাই সাজানো এবং তার সংবাদ এক ধরনের ‘মাদক’… এই মন্তব্য রাজকুমার হিরানী রেখেছেন বলে ভাবতে খারাপ লাগছে। সংবাদের একটি নতুন অভিমুখ তৈরি করা সাংবাদিকের কাজ। সেই কাজকে কিছুটা ছোট করেছেন পরিচালক। আসলে দোষ-গুণের মানুষকে ‘দেবতা’ হিসেবে দেখালে বোধ হয় এই ধরনের বোধ কাজ করে। নিজের ইচ্ছেমতো সংবাদমাধ্যমকে নাচাতে না পারার ক্ষোভটাও এই বোধের জন্ম দেয়।

ভালবাসার সন্ধানে

আহারে মন

aharemon-still

পরিচালকঃ প্রতিম ডি গুপ্ত

অভিনয়েঃ আদিল হুসেন, অঞ্জন দত্ত, মমতাশঙ্কর, ঋত্বিক চক্রবর্তী, পাওলি দাম, পার্নো মিত্র, চিত্রাঙ্গদা চক্রবর্তী

এই সিনেমায় পরিচালক এই শহরের মধ্যে চারটি পৃথক ভালবাসা খোঁজা বা ভালবাসার জন্য অপেক্ষার গল্প বলেছেন। কাহিনির প্রতিটি চরিত্রেও আছে বেশ অভিনবত্ব। তাদের মধ্যে আছে চোর থেকে শুরু করে সন্তান পরিত্যক্ত বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা পর্যন্ত অনেকেই। সিনেমায় মাইকেল (ঋত্বিক)-সুজ়ি (পার্নো), বরুণ (অঞ্জন)- চারুলতা (মমতা), পূর্ণেন্দু (আদিল)-রমোনা (পাওলি), প্রত্যেকেই একে অপরের কাছাকাছি আসে বিভিন্ন সূত্র থেকে। পরবর্তীকালে তারা নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে পরস্পরের প্রতি টান অনুভব করে। প্রত্যেকেই প্রাণপণ চেষ্টা করেছে নিজের ভালবাসাকে ধরে রাখার। আদৌ সেই টান কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা সিনেমার জন্যই তোলা থাক না হয়। তবে গল্পের জাল বিস্তারে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন পরিচালক। সিনেমার প্রথমার্ধে কাহিনির জাল বিস্তার করে দ্বিতীয়ার্ধে নৈপুণ্যের সঙ্গে গুটিয়েছেন তিনি। তাই কোনও অংশই বাড়তি মনে হয়নি। শেষে পুরো কাহিনিটিকে একটা জায়গায় নিয়ে আসার চেষ্টাটাও প্রশংসনীয়। সিনেমাটিতে অনেক চরিত্র থাকলেও কেউ কাউকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি কোথাও, শুধুমাত্র যে যার দায়িত্বটুকু পালন করেছেন। তবে বিশেষভাবে বলতে হয় চিত্রাঙ্গদা চক্রবর্তীর কথা। লিউকেমিয়া পেশেন্টের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় নজরকাড়া। দৃশ্যায়নের খুঁটিনাটির দিকেও বিস্তারিত নজর দেওয়া হয়েছে। আর সিনেমার শেষে আছে একটি চমক। সিনেমার গানগুলি তেমন মনকাড়া না হলেও খারাপ নয়। আবহসঙ্গীত আলাদা করে তেমন নজর কাড়ে না। তবে কয়েকটি ব্যাপারে কিছু ছোট-ছোট খটকা থেকে গেল। কিছু হিসেব যেন জোর করে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পূর্ণেন্দু জীবিত থাকা সত্ত্বেও কেন মিথ্যাচার করল, তা ঠিক বোধগম্য হয় না। তবে মোটের উপর, ছবিটি মনে ছাপ ফেলে যায়।

ভাইজান এল রে…

ভাইজান এল। কিন্তু রাজত্ব করতে পারল কি?


পরিচালকঃ জয়দীপ মুখোপাধ্যায়

অভিনয়েঃ শাকিব খান, শ্রাবন্তী, পায়েল, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত

জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের চতুর্থ ছবি ‘ভাইজান এল রে’ দেখতে গিয়ে মনে হল, গল্পের প্রথমভাগটা অতটা বড় না হলেও চলত। বরং, পায়েল আর শাকিবের অপ্রয়োজনীয় রোম্যান্সের গান বাদ দিলে চিত্রনাট্যে খানিকটা ভারসাম্য আসত। বাংলাদেশ এবং ভারতের যৌথ প্রযোজনায় তৈরি এই ছবি মূলত অ্যাকশন কমেডি, যাকে অঘোষিতভাবে ডেভিড ধাওয়ানের বিখ্যাত ছবি ‘জুড়য়া’-র বাংলা রিমেক বলা যেতে পারে। তবে একটু অন্যরকম! গল্পের মধ্যে সেরকম নতুনত্ব কিছু নেই। জন্মের পর হারিয়ে যাওয়া দুই যমজ ভাই… এক ভাই আজান (শাকিব) গরিবের ঘরে মানুষ এবং ডাকাবুকো। আর এক ভাই উজান (শাকিব) জমিদারের বাড়িতে জামাইবাবুর হাতে অত্যাচারিত হয়ে জুবুথুবু। তারপর সম্পূর্ণ এন্টারটেনমেন্ট প্যাকেজ! পরিচালক স্ক্রিপ্টে বিশেষ টুইস্ট দেওয়ার চেষ্টা করেননি।

গতে বাঁধা স্ক্রিপ্টের সঙ্গে শাকিব খান, শ্রাবন্তী, পায়েলের গ্ল্যামার কোশেন্ট মিশিয়ে একটা এমন ছবি বানিয়েছেন, যেটা দেখতে গেলে মাথা খাটানোর বিশেষ দরকার নেই। তবে হ্যাঁ, এই ছবিতে অন্তত সমস্ত সুতোকে একটা জায়গায় বাঁধার চেষ্টা করেছেন পরিচালক। তাতে অন্তত ছবির শেষে ‘ওটা কেন এমন হল’ টাইপের প্রশ্ন মাথায় আসবে না। কিন্তু ওই… চিত্রনাট্যের দুর্বলতার পাশাপাশি সংলাপের জোরও তেমন নেই। ফলে কোথাও নিজে থেকেই হাসি পায়, কোথাও আবার জোর করে হাসতে হয়! অভিনয়ে শাকিব খান যথাযথ। তবে খুব একটা নতুনত্ব কিছু পাওয়া যায়নি তাঁর অভিনয়ে। হিয়া (শ্রাবন্তী) বা রুনা-র (পায়েল) বিশেষ কিছু করার ছিল না। শ্রাবন্তী তবুও ভাল। কিন্তু পায়েলের জোর করে ‘স’- এর উচ্চারণটা বরং বেশ বিরক্তিকরই লেগেছে। অভিনয়ের কথা যদি বলতে হয় তবে ভিলেনের চরিত্রে শান্তিলাল বেশ দাপুটে অভিনয় করেছেন। বাকিরা কেউই তেমন উল্লেখযোগ্য নন। আলাদা করে বলতে হয় রজতাভ দত্তর কথা। তিনি ভাল। কিন্তু নায়িকার বাবার চরিত্রে সেই এক কমিক রোলের গণ্ডিটা থেকে তিনি এবার একটু বেরিয়ে আসতেই পারেন!

একা জিৎ

সুলতান, দ্য সেভিয়র
sultan-still

পরিচালক: রাজা চন্দ
অভিনয়: জিৎ, প্রিয়ঙ্কা, মিম

এই ছবিতে বিনোদনের পাশাপাশি যেটা আছে, তা হল বেশ ইন্টারেস্টিং একটা গল্প। রাজা (জিৎ) তার বোন দিশাকে (প্রিয়ঙ্কা) নিয়ে আসে কলকাতায়। দিশা ভাল ছবি আঁকে। বোনকে আর্ট কলেজে ভর্তি করে, চাকরি করে জীবন চালাবে… এই রাজার ইচ্ছে। কিন্তু একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, মহিলাপাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত একটি চক্রের লোকেদের মেরে ফেলতে শুরু করেছে রাজা। কিন্তু কেন? সেটা না হয় পরদায় গিয়েই দেখবেন। ফলে ছবিটির সমালোচনায় আসা যাক। জিৎ স্বমহিমায় ফিরেছেন ‘সুলতান’-এ। স্বমহিমায় বলতে, নিজের ক্যারিশমায়। এই ছবির পরতে পরতে জিতের সুপারস্টার সত্তা। তা সে বোনের দায়িত্ববান ভাই হিসেবে হোন বা দুর্দান্ত গুণ্ডার ভূমিকায়। তাঁর লুক পালটেছে। কিন্তু ইমেজের কোনও পরিবর্তন হয়নি। স্ক্রিনে থাকলে, তিনি ছাড়া আর অন্য কারও দিকে নজর যাচ্ছে না। প্রিয়ঙ্কাও ভাল অভিনয় করেছেন। জিতের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু একঘেয়ে লেগেছে। মানে, হালফিলে প্রিয়ঙ্কার করা চরিত্রগুলো এবার কোথাও গিয়ে একটু এক মনে হচ্ছে। একজন ভাল অভিনেত্রীর এরকম হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। তবে মিমকে দেখতে সুন্দর লেগেছে। তা সে তাঁর স্ক্রিনস্পেস যতই কম হোক। কিন্তু ওই যে বললাম, গল্পটাই ‘সুলতান’কে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তার সঙ্গে জিতের মুখ থেকে বেরনো কিছু পা়ঞ্চলাইন… দর্শকের মনে আলোড়ন তোলার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু একটা প্রশ্ন মনে দাঁনা বাঁধতেই থাকে। গত কয়েক বছর ধরেই বাঁধছে বলা যায়। সেটা হল, কমার্শিয়াল ছবি মানেই কি যুক্তিবুদ্ধি সমস্ত জলাঞ্জলি দিয়ে দিতে হবে? মহিলাপাচার চক্রের পাণ্ডাকে ধরতে গিয়ে পুলিশ মুড়ি মুড়কির মতো গুলি ছুঁড়ছে, পটাপট মানুষ মরছে অথচ তাদের পিছনের থাকা কাচের দেওয়াল বা দরজার একটুও ক্ষতি হচ্ছে না… ব্যাপারটা এই সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসযোগ্য কি? রাজা হঠাৎ করে গাড়ি থেকে ছুটে ছুটে একটা এসইউভি-কে ধাওয়া করতে গেল কেন, বোঝা গেল না। উকিল হিসেবে মিমের কোর্টে আসার দৃশ্য বা স্বল্প পরিসরে কাঞ্চনের অভিনয় হাস্যরস কম, ভাঁড়ামির উদ্রেগ বেশি করেছে। ফলে কিছু কিছু চমক তৈরি হলেও, আদতে এই দৃশ্যগুলো ‘সুলতান’-কে ভারাক্রান্তই করেছে। আর ভিলেনদের ধরে মারার দৃশ্যগুলিতেও জিৎ ওরফে রাজা এতটাই সাবলীল যে, অনেক সময়ই মনে হয়েছে, ভিলেনের এরকম মাপের হিরোর সামনে দাঁড়ানোর কোনও যোগ্যতাই নেই। কিন্তু তাতে কোনও অসুবিধে হয়নি। কারণ জিৎ কমার্শিয়াল ছবির এমন এক স্বপ্নালোক তৈরি করেছেন, যেখানে সব কিছু সম্ভব। যেখানে নায়ক-নায়িকা বা ভিলেন যে-কোনও সময়ে, যে-কোনওভাবে ঢুকে যেতে পারেন। আসলে জিৎ তো জানেন, তিনিই এই ছবির সর্বময় ‘সুলতান’। ফলে কোনও সময়ই তাঁর হেরে যেতে নেই। তাই খামতিগুলোকে ঢেকে একার হাতে সিনেমাটাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন তিনি (কিন্তু ক্যামেরা অনেক সময়ই তাঁর এই লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজর সঙ্গ দেয়নি)। আর পরিচালকের করা এরকম কিছু গলদকে নিজের হাতে ঢেকে দিয়েছেন। হতে পারে, এই ছবির আরও খানিকটা ছোট হতে পারত। হতে পারে, চিত্রনাট্য আরও শক্তিশালী হতে পারত, হতে পারে, অভিনয় আরও ভাল হতে পারত। কিন্তু ওই… ‘হতে পারত’গুলো হয়নি তো কী, জিৎ তো আছেন স্বমহিমায়।

স্লো মোশনে পয়জ়নিং

রেস ৩

পরিচালক: রেমো ডি সুজ়া
অভিনয়: সলমন খান, অনিল কপূর, ববি দেওল, সাকিব সালিম, জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজ়, ডেজ়ি শাহ

সময়টা তো উৎসবের? সেইমতো তো গাঁটের কড়ি খরচ করে লোকে ভাইয়ের সিনেমা দেখতে যায়? জানি এটা অনসম্বল কাস্ট, কিন্তু ভক্তরা তো ছবিটাকে ‘ভাইজানের’ সিনেমা বলেই দেখতে গিয়েছে? তাঁদের জন্য এ কোন ইদি! এ তো অত্যাচার, তা-ও আবার থ্রিডি-তে! যা বোঝা যাচ্ছে, ইদটা বোধহয় সলমনের জন্য বিশেষ সুবিধের নয়। গতবছরও ‘টিউবলাইট’ যা জ্বলল, সেই ‘রেস’ অব্যাহত! আসলে প্রথম সিকোয়েন্সেই ভিলেন শামশের (অনিল কপূর, হ্যাঁ, স্পয়লার দেবই!) যা খেল দেখাল, তাতেই বোঝা যাচ্ছিল এটি কী হতে চলেছে! এরপর বারবার ক্যাম্পোসের কথা ঘুরে-ঘুরে আসতে চলেছে শমশেরের মুখে। ওই প্রথম সিকোয়েন্সের সঙ্গে দর্শককেই ক্যাম্পোস ফ্রি দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। কোন অস্ত্রব্যবসায়ী তার নিজের বেস নিজেই উড়িয়ে দেয়? কীসব সংলাপ, কী অভিনয়… চোখ-মাথা দপদপ করে উঠল ওইটুকুতেই। তারপর শুরু হল মহাভারতের চেয়েও লম্বা, স্লো-মো ইন্ট্রো পর্ব। হ্যাঁ, ওই জিনিসটি প্রচুর আছে সিনেমায়। স্লো-মো। আর মাস্‌ল আর স্বল্পবাস। যা-ই হোক, ইন্ট্রোয় সিকন্দরের (সলমন খান, অ্যাদ্দিনে সবাই জানেন) নাম আসার আগেই ‘সিকন্দরের বডিগার্ড’ যশের (ববি দেওল) ইন্ট্রো হয়ে গেল। স্বাভাবিক। শমশেরের সৎছেলে সিকন্দর তো আসবে বিশেষভাবে। সৎছেলে, ভাইপো, সুপারহিরো… ইন্ট্রোর পরে দ্বিতীয় ইন্ট্রো! সেই সিকোয়েন্সে শমশেরের কনভয়ের উপর আক্রমণ করে তার শত্রু রাণা। এ এক আশ্চর্য কনভয়। এই কনভয়তে মাত্র একটিই গাড়ি আছে! এবং যে বাইক-আরোহী শার্পশুটাররা ধাওয়া করে শমশেরকে, তারাও অদ্ভুত। গাড়ির একদিকের দরজা সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়ে থাকলেও, সেখান দিয়ে একটিও গুলি তারা চালায় না। শমশেরের অ্যাকশন আরও অপূর্ব। সে সানরুফ খুলে গুলি চালায়, সানরুফ দিয়ে বাইকারকে টেনে ঢুকিয়ে মারে। মানে, ইয়ে, পরিচালক মশাই, দরজাটা… আহা এসব তো হতেই পারে। একটা গুলি চালালেই যেখানে মানুষের গায়ে আগুন জ্বলে যায় (কেরোসিন মেখেছিল বোধহয়), এবং জ্বলন্ত বাইকটিকে (শুধু বাইক) যখন গুলি করে মারা হয় (বিশ্বাস না হয়, দেখে আসুন গিয়ে), তখন তো এসব হতেই পারে। তা শমশেরের ছেলে-মেয়ে (আসলে কিন্তু তারা ওর ছেলে-মেয়ে নয়) সুরজ (সাকিব) আর সঞ্জনা (ডেজ়ি) এরপরই রেগে-মেগে রাণার ওয়্যারহাউজ়ে যায় (ভগবান জানে কেন। কারণ ওয়্যারহাউজ়ে রাণার থাকার কোনও সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। বহুবার রাণা শমশেরের উপর আক্রমণ করেছে। প্রতিবারই কি সুরজ-সঞ্জনা এভাবে ওয়্যারহাউজ়ে মারপিট করে আসে? ভাতে মারার পরিকল্পনা?)। মার্শাল আর্টে সিদ্ধহস্ত সঞ্জনা আবার গিয়েছে ইভনিং ড্রেস পরে। লাথি মারবে কী করে? কেন? ছুরি নিয়ে ফ্যাঁশ করে চিরে ফেলা হল ড্রেসের একটি দিক। ডেজ়ির অমন সুডৌল পা না হলে কীভাবে দেখানো হবে? অবশ্য সলমনের টাকা দেখেই ‘আমি কী বোকা’ যেখানে বলতে পারে জ্যাকলিন অভিনীত চরিত্রটি (জেসিকা), সেখানে তো এমন হতেই পারে! ওহ্‌… সিনেমা শুরুই হয়নি। এ ছবির মূল কাহিনি একটি ধাঁধা। শমশেরের ছেলে কে, তা নিয়ে। আর জেসিকার প্রেম কার সঙ্গে তা নিয়ে। একটা চুরিও আছে বটে কিন্তু তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। নেতাদের যৌন কেলেঙ্কারির ভিডিয়োর জন্য কেন ইন্টারপোল অফিসার ফোন করবে আর এত ছবি থাকতে একটা ভিডিয়োর হার্ডডিস্ক নিয়ে কেন এত মাতামাতি… তা অবশ্য কিছুই বুঝিনি। সেই হার্ডডিস্ক চুরিতে সলমনের ভূমিকা কী, তা-ও বুঝিনি। কেন একটি মেয়েকে অযথা গুলি করা হল, কী করে সলমনকে গ্রেফতার করা হল, বুঝিনি। তবু ওই গল্পে মোচড়-টোচড়গুলির জন্যই ছবির একটি নম্বর। যশ যে শমশেরের ছেলে, এটা তো একটা আশ্চর্য বটে! বিশ্বাস করুন, আর গল্প বলতে ভাল লাগছে না। ডেটোনেটর টিপে দিলেও যেখানে বোমা ফাটে না, সরু রাস্তায়, সাদা জামা পরা একটা লোককে যখন পুরো আর্মিও গুলি করে মারতে পারে না, দুই বুড়ো ববি আর সলমন খালি গিয়ে মারপিট করে, যেখানে জেলারকে ঘুষের কথা বললেই জেল থেকে ছাড়া পাওয়া যায়, যেখানে সরকারি এজেন্ট চোরদের মধ্যে বসে বলে ‘আমি সরকারি এজেন্ট’, সেখানে আর গল্প বলতে ভাল লাগে? বুঝতেই পারছেন, স্ক্রিপ্ট বলে এই ছবির কিছু নেই, সংলাপ অসহ্য। আর অভিনয়… সেকথা না বলাই ভাল। রাজেশ শর্মা, নরেন্দ্র ঝা-দের দেখে যেন কেমন একটা লাগে এসব ছবিতে। আর সলমন… খারাপ অভিনয়ে তিনি নিজেকেও হারিয়ে দিচ্ছেন। ক্যারিজ়মাটাও যেন উধাও সুট পরে হাওয়ায় উড়ে এসে মারপিট করা মানুষটির। নড়া-চড়ার ফ্লুইডিটিটুকু নেই, তাঁকে এখন নাচতেও হচ্ছে! সে যে কী দৃশ্য! আর ওই ‘অসাধারণ’ সব অকারণ নাচ-গানের সিকোয়েন্স! ওহো, ভাল কথা। বিপদের সবে শুরু। চার নম্বর রেসও কিন্তু আসছে!

(এই লেখা সম্পূর্ণভাবে কিবোর্ডের কৃতকর্ম। ছবিটি দেখিয়া সমালোচক ফৌত হইয়াছেন। না, ডেথ অফ দ্য অথর জাতীয় কোনওরকম আঁতলামি করার প্রচেষ্টা নাই। আসলে ছবিটি…)