Category Archives: review detail

আবেগের ওভারডোজ়

হেলিকপ্টার ঈলা

eela-still

পরিচালনা: প্রদীপ সরকার

অভিনয়ে: কাজল, ঋদ্ধি সেন, টোটা রায় চৌধুরী, নেহা ধুপিয়া

আবেগের ওভারডোজ় বোঝেন? হেলিকপ্টার ঈলাকে তার সমার্থক ধরতেই পারেন। একজন ছেলেসর্বস্ব ঘ্যানঘ্যানে মা আর তার স্মার্ট ছেলে— এই হচ্ছে গপ্পের মোদ্দা কথা। না আরও ভাল করে বলতে গেলে ছেলের ক্রমাগত মাকে বুঝিয়ে যাওয়া যে, মা গো, আমাকে স্পেস দাও, আমাকে নিজের মতো থাকতে দাও ইত্যাদি নিয়ে খিচুড়িমার্কা একখানা ছবি নামিয়েছেন পরিচালক প্রদীপ সরকার। হ্যাঁ মেনে নিচ্ছি এটা বলিউড ছবি, এখানে লার্জার দ্যান লাইফ আর বিনোদনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাই বলে গল্পের গরু এভাবে গাছে উঠে যাবে? ঈলা রাইতুরকর (কাজল), স্বপ্ন তার প্লে ব্যাক সিঙ্গিং, নিজের মিউজ়িক ভিডিও লঞ্চ করা । এদিকে যেই সেই ভিডিও শুটিং স্থগিত হয়ে গেল অমনি সে করে ফেলল বিয়ে। ইতিমধ্যে ছেলেও হয়ে গেল, আর তার স্বামীও হঠাৎ করে মৃত্যুভয় ডেস্টিনি ইত্যাদি গল্প দিয়ে তাকে ছেড়ে চলে গেল। তারপর পরে রইল কী? একা মায়ের ছেলেকে বড় করে তোলা, যার সিংহভাগ জুড়ে শুধু ছেলে ভিভান( ঋদ্ধি সেন)-এর চারপাশে হেলিকপ্টারের মতো ঈলার জীবনযাপন। ছেলেকে ছাড়া আর কিছু বোঝে না সে। এমনকি ছেলে যখন নিজের জন্য কিছু করতে বলে তখনও সে খুঁজে নেয় স্নাতক শেষ করার জন্য ছেলের কলেজ। কাগজে তার নাম ছাপা হয় একজন সিঙ্গল মাদারের পুনরায় পড়াশুনো শুরুর তকমা দিয়ে। তারপর? গোটা ছবি জুড়ে শুধু মা আর ছেলের লড়াই। ছেলে বলে আমাকে স্পেস দাও, মা বলে তুই আমার সব। ফলে দু’ ঘণ্টা এগারো মিনিট ছবিটিতে আগ্রহ ধরে রাখা ভীষণই শক্ত। ভিভানের সাফোকেশন দর্শকের মধ্যেও সঞ্চারিত হবে! কেন শেষ হচ্ছে না ছবিটা! মানে ঠিক বোঝা গেল না পরিচালকের বক্তব্য, ঠিক কী মেসে‌জ তিনি দিতে চেয়েছেন। ভারতীয় বাবা মায়ের ছেলেমেয়েদের উপর থেকে নজরদারি হঠানো উচিত? মানুষ নিজের স্বপ্নপূরণ যে কোনও বয়সে করতে পারে? আরে বলতে চাইছেনটা কী? ক্লাইম্যাক্সের দৃশ্য তো সম্পূর্ণ অবাস্তব, আবেগের রসে মাখোমাখো। গানগুলো পর্যন্ত মনে দাগ কাটে না। বাকি রইল অভিনয়— কাজলের পর্দায় উপস্থিতি এখনও মারকাটারি। ঋদ্ধি কোথাও কোথাও বেশ ওভার অ্যাক্টিং করেছেন। টোটার বিশেষ সুযোগ ছিল না খাপ খোলার। নেহা ধুপিয়া অল্পসময়ে বেশ ভাল ছাপ রেখেছেন। সবমিলিয়ে ‘হেলিকপ্টার ঈলা’ সামাজিক কাঠামো আর বিনোদনকে মিশিয়ে বানাতে চাওয়া একটি হতাশ করা ছবি, নিঃসন্দেহেই।

সাসপেন্স আর অতিরিক্ত মারপিট…

ভিলেন

villain-still

পরিচালনা: বাবা যাদব

অভিনয়ে: অঙ্কুশ হাজরা, মিমি চক্রবর্তী, ঋত্বিকা সেন

গাড়ি ওড়াতে শুধু রোহিত শেট্টি পারেন না, বাবা যাদবও পারেন! আর সেই উড়ন্ত গাড়ির জ্বলন্ত অংশ গল্পের হিরোর দিকে ছুটে এলে, তার গায়ে কিন্তু একটা আঁচড়ও লাগে না! এই না হলে হিরো! না, ছবিটা কিন্তু মোটেও খারাপ না। হিরো যেখানে এমন দুর্দান্ত, সেখানে ছবির নামের যথার্থতা প্রমাণ করার জন্য ভিলেনও ততটাই জবরদস্ত!

গল্পের শুরু দুই মিষ্টি নায়িকাকে দিয়ে। সিঙ্গাপুর থেকে কলকাতাগামী ফ্লাইটে দেখা হয় স্নেহা (ঋত্বিকা) ও রিয়ার (মিমি)। বন্ধুত্ব হতেও সময় লাগে না। কিন্তু এয়ারপোর্টে স্নেহার হবু বড় জয়কে (অঙ্কুশ) দেখে অবাক হয়ে যায় রিয়া। তাকে দেখতে অবিকল রিয়ার নিজের প্রেমিক রাজার (নিঃসন্দেহে এই চরিত্রেও অঙ্কুশ) মতো! নিজের চোখকে অবিশ্বাস করে রাজার বাড়ি ছুটে যায় রিয়া। কী জানতে পারে গিয়ে? কোথায় রাজা? রাজা আর জয় কি একই মানুষ না অন্য?

গল্পে বেশ একটা রহস্যের রেশ রয়েছে। রয়েছে সাসপেন্সও। পাশাপাশি মিষ্টি প্রেম, প্রচুর অ্যাকশন, বিদেশের মাটিতে গান, পার্টিতে নায়িকাদের লাস্যময়ী নাচ— বিনোদনের অভাব নেই এক মুহূর্তও। অঙ্কুশের ডাব্‌ল রোল। ফলে দুই চরিত্রের দু’ রকম শে়ড অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে তাঁকে। তাতে তিনি অনেকটাই সফল। পাশাপাশি করতে হয়েছে অনেক অ্যাকশন। সেখানে অবশ্য তাঁর পেশিবহুল শরীরের তারিফ না করে উপায় নেই! তবে বেশি ভাল লাগে মিমিকে। সুন্দর চেহারা, শক্তিশালী অভিনয় ও যথাযথ অভিব্যক্তিতে বাকিদের চেয়ে অনেকটাই বেশি নজর কেরেছেন তিনি।

প্রেম-রহস্য মিলিয়ে একটা জম্পেশ গল্পের অবশ্য তাল কাটে অতিরিক্ত মারামারির দৃশ্যে। গল্প একটু গড়াতে না গড়াতেই যদি দু’ মিনিটে একটা করে মারপিটের সিকোয়েন্স আসে, তাহলে অতি ভাল অ্যাকশনও কিছুক্ষণ পরে একঘেয়ে লাগতে বাধ্য। আর হতাশ করলেন ঋত্বিকা। তাঁর অভিনয় মনে দাগ কাটল না কিছুতেই। গল্পের এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রের প্রতি আরও অনেকটা সুবিচার তিনি করতেই পারতেন।

সব শেষে বলা যায় যে শুধুমাত্র আরও একটি বিনোদনের ছবি হিসেবে থেকে গেল না ‘ভিলেন’। অতিনাটকীয়তা থাকলেও বেশ সুচিন্তিত একটা গল্প রয়েছে এই ছবির। এবং শেষ দৃশ্য পর্যন্ত ধরে রেখেছে রহস্যের জট খোলার আমেজ।

এক টুকরো ছেলেবেলা…

মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি

monoj-de-still

পরিচালনা: অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়

অভিনয়ে: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, ব্রাত্য বসু, আবির চট্টোপাধ্যায়, সোহম মৈত্র, পূরব শীল আচার্য

নীল আকাশে উ়ড়ে বেরাচ্ছে চার-পাঁচটা ঘুড়ি। সকালের জলখাবার, লুচি আর ছোলার ডাল। সন্ধে নামছে মা-ঠাকুমার শঙ্খধ্বনি গায়ে মেখে। মাঠ ছেড়ে ঘরে ফিরছে পড়ুয়ার দল। এবার শুরু হবে দুলে-দুলে পড়া। পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ বিস্মৃতপ্রায় এক ছেলেবেলাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। স্মার্টফোনের যুগে দাঁড়িয়ে এতো রূপকথার মতোই লাগে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ কিশোর উপন্যাস নিয়ে ছবিটি তৈরি। আর উপন্যাসকেই অনুসরণ করে এগিয়েছে গল্প। তাই বিশদভাবে গল্পের প্রয়োজন নেই। কিন্তু গল্পকে একেবারে এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাই বলি, মনোজের বাড়িতে এক অদ্ভুত ছবি আছে। সেই ছবিটি একটি বাচ্চা ছেলের। কিন্তু সে কে, তার উত্তর নেই? মনোজদের অদ্ভুত বাড়িতে আছে বাজারু ভজবাবু, পিসিমা আদ্যাসুন্দরী দেবী, কিরমিরিয়া ঝি, হ্যারিকেন গরু আর রামু। তারপর রহস্যের প্যাঁচে জড়িয়ে জিলিপির মিষ্টি। বেশ কয়েকজন ভাল অভিনেতা এই ছবিতে আছেন। ফলে টক্করটা জব্বর হয়েছে। তার মধ্যেও কিন্তু হারিয়ে যায়নি মনোজ ওরফে সোহম এবং সরোজ ওরফে পূরব। অনেকদিন পর পরদায় সন্ধ্যা রায়কে দেখে ভাল লাগল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, আবির, ব্রাত্যকে ভাল লাগে। অভিনয় যখন সাবলীল হয়, তখন নজর পড়ে গল্পে। প্রতিটি মোড়ে গল্পকে ছুঁয়েছে সিনেমা আবার কিছু ক্ষেত্রে নিজের মতো করে (খুব সামান্যই) পরিচালক অঙ্ক মিলিয়েছেন। ধন্যবাদ তাঁকে। আটপৌরে ভাবটা মুছে যায়নি। তাই তো গোরবজল ছেটানো বা বড়ি দেওয়ার মতো হারিয়ে যাওয়া ‘শিল্প’ বড্ড মন ভাল করে দেয়। ‘গরুর পেট খারাপ’, ‘ক্যাটারপিলার সাকসেস অফ পিলার’-এর মতো সংলাপ ভাঁড়ামো আর হাস্যরসের সূক্ষ লাইনটিকে নতুন করে চিনিয়ে দিয়েছে। এমন সহজ, সরল হাসি আজকাল আর আসে না তো! তবে পরিচালক টাইমফ্রেম গুলিয়েছেন। ছবিটিকে সাত আর আটের দশকের মধ্যে আটকে রাখলে ভাল করতেন, তা রেখেওছিলেন। কিন্তু শেষ দৃশ্যে ‘ডিমোনিটাইজ়েশন’ সব নষ্ট করে দিল। আর হ্যাঁ, ডাকাত আর গৃহস্থ প্রায় গা ঘেষাঘেষি করে থাকাটা গৃহস্থকে দুর্ধষ করেছে আর ডাকাতকে জলভাত (তবে শীর্ষেন্দুর গল্পে এমন আশ্চর্য হয়েই থাকে) ছবির গান আকর্ষক না হলেও ভজবাবুর গানটি চমৎকার। কিন্তু প্রথম এবং শেষ দৃশ্যে লেখকের উপস্থিতি না থাকলে ভালই হত। এমন সস্তা চমকের দরকার ছিল না। ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই তো প্রাপ্তি।

অনবদ্য প্রসেনজিৎ! কিন্তু…

কিশোরকুমার জুনিয়র

Kishore-kumar-junior-still

পরিচালনা: কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়

অভিনয়ে: প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, অপরাজিতা আঢ্য, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়, রাজেশ শর্মা, মাসুদ আখতার

কিশোরকুমার একটা আবেগ। কিশোরকুমার একটা অনুভূতি। কিশোরকুমার একটা প্রজন্ম। কিশোর অনুরাগীদের জন্য এই ছবি এক শ্রদ্ধার্ঘ্য। তাতে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’-এর চরিত্রে তিনি অনবদ্য। কিন্তু এই ছবি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের নয়। অন্তত যে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি আমরা এতদিন দেখে এসেছি, তার ধারের কাছেও আসে না ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’। ছবির গল্প এতটাই ফ্ল্যাট যে ভাবতে অবাক লাগে, সত্যি কি এটা কৌশিকের ছবি? ছবির গল্পের শুরুটা এক কিশোরকন্ঠীর জীবন নিয়ে। আসল নাম রজত ঘোষ (প্রসেনজিৎ) হলেও তিনি সকলের কাছে কিশোরকুমার জুনিয়র। আর পাঁচজন বাস্তবজীবনের কিশোরকন্ঠীদের মতোই তিনিও নিজের আসল পরিচয় ভুলে গিয়ে, শুধু কিশোরের ছায়া হয়ে থাকতেই পছন্দ করেন। স্ত্রী রিতা (অপরাজিতা) স্বামীর এই অভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলেও, ছেলে ঋষি (ঋতব্রত) বাবার এই ব্যবহার মেনে নিতে পারে না। তাঁর বাবা তো কিশোরকুমার নন, তাঁর বাবা কোথায়? প্রশ্ন তোলেন ঋষি। যাই হোক, গল্প ভাল দিকেই এগোচ্ছিল। কিন্তু তারপর থেকেই সবকিছু কেমন যেন ঘেঁটে গেল। রাজস্থান সফর, সেখান থেকে কিশোরজুনিয়র ও দলবলকে কিডন্যাপ হওয়া, ভারত-পাকিস্তান, কিশোর-রফি, সবকিছুই আছে। শুধু গল্পটাই নেই। তবে কুমার শানুর কন্ঠে প্রত্যেকটি গান শুনতে এবং বড় পরদায় দেখতে ভাল লাগে। প্রসেনজিতের অনবদ্য অভিনয়ের কথা আগেই বলেছি। সঙ্গে তাঁর শরীরীভাষা, কস্টিউম, সবকিছুই দুরন্ত। তবে অপরাজিতার অভিনয় অত্যন্ত চড়া। ভাল লাগে রাজেশ শর্মা, ঋতব্রত ও মাসুদ আখতারের স্বাভাবিক অভিনয়। ছবির কিছু-কিছু জায়গায় খটকাও লাগে। এয়ারপোর্টে ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’ ব্যানার নিয়ে এলেও পরে গিয়ে রাজেশ শর্মা কেন কিশোরকুমার জুনিয়রের নাম শুনে এত অবাক হন? ঠিক কী কারণে তাঁদের অপহরণ করা হল তা এক-দু’বার বলা হলেও ঠিক স্পষ্ট নয়। ক্লাইম্যাক্স কিংবা বিরতির আগেও কোনও পাঞ্চ নেই যা সাধারণত কৌশিকের ছবিতে থেকে থাকে। অপহরণ যাঁরা করলেন তাঁরা নিজেদের মোবাইল থেকেই কিশোরের ছেলেকে কলকাতায় ফোন করেন। এইটুকু ভয় নেই যে সেই নম্বরটি সহজেই ট্র্যাক করা যেতে পারে। মাসুদ সেটা বুঝলেও তাঁর সঙ্গী হেলায় নিজের মোবাইল থেকে কিশোরের ছেলে ঋষিকে ফোন করেন। ছবির বিষয়বস্তু শুনে মনে হয়েছিল এই ছবি কিশোরকন্ঠীদের জীবনের অন্দরমহলে প্রবেশ করবে। কিন্তু তা পাশ কাটিয়ে এই ছবিতে অন্যান্য আরও অপ্রাসঙ্গিক বিষয় উঠে আসে যার কোনও প্রয়োজন ছিল না। সবমিলিয়ে এই ছবি অবশ্যই কিশোরের, কিন্তু এই ছবি কৌশিকের নয়।

হাসির ফুলঝুরি

হইচই আনলিমিটেড

Hoichoi-Unlimited-still

পরিচালনা: অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

অভিনয়ে: দেব, খরাজ মুখোপাধ্যায়, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত, অর্ণ মুখোপাধ্যায়, কৌশানী মুখোপাধ্যায়, পূজা বন্দ্যোপাধ্যায়, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, মানসী সিনহা

কমেডি সিনেমা তৈরির প্রতি অনিকেত চট্টোপাধ্যায়ের ঝোঁক এতদিনে দর্শকদের কাছে অজানা থাকার কথা নয়। পাশাপাশি তাঁর সাম্প্রতিকতম সিনেমার নাম থেকেই বোঝা যায় যে এটি একটি ভরপুর হইহুল্লোড়ে ভরা ছবি, ট্রেলারেও সেই আভাস কিছুটা পাওয়া গিয়েছিল। তবে তাঁর কমেডি ছবির বৈশিষ্ট্য হল, ছবিগুলোতে স্থূল কমেডির মোড়কে কোথাও একটা না-পাওয়া, অতৃপ্তির ব্যথা জড়িয়ে থাকে। এই সিনেমাতেও তার অন্যথা হয়নি। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির চারজন মানুষ, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী বিজন চিরিমার (খরাজ), অবসরপ্রাপ্ত বিমানবাহিনী আধিকারিক অনিমেষ চাকলাদার (শাশ্বত), মোটর মেকানিক আজম খান (অর্ণ) এবং শিল্পপতি বড়লোক শ্বশুরের ঘরজামাই কুমার রায় (দেব)— প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিপর্যস্ত। এক বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের চারজনের আলাপ হয় এবং জীবনটাকে ‘সার্ভিসিং’ করানোর জন্য তাঁরা উজবেকিস্তান যাওয়ার পরিকল্পনা করেন (অবশ্যই পরিবার ছাড়া..)। এরপর নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে তাঁদের উজবেকিস্তান যাওয়া এবং তার পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা নিয়েই সিনেমাটা এগিয়েছে।

নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই সিনেমার কাহিনি নির্মাণে সক্ষম হয়েছেন পরিচালক। নিখাদ হাসির সিনেমা হিসেবে দেখতে গেলে এই সিনেমা ফার্স্ট ডিভিশন মার্কস পেতেই পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ধটনার প্রসঙ্গ এনে, তা নিয়েও মজার রসদ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন পরিচালক। তবে বেশ কিছু ঘটনার যৌক্তিকতা নিয়ে মনে খটকা থেকে যায়। কোনও-কোনও জায়গায় সিনেমার গতিও একটু দ্রুত লাগে। অতিরিক্ত হাসির রসদ আনতে গিয়ে কোথাও-কোথাও যেন কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর প্রয়াসও চোখে পড়ে, আর সেই প্রয়াস থেকেই অভিনেতাদের অভিনয়ও কিছু জায়গায় কমেডি থেকে ভাঁড়ামির পর্যায়ে চলে গিয়েছে। এমনিতে নজর কাড়ে খরাজ, শাশ্বত, দেবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে করা অর্ণর অভিনয়। ছবিতে অভিনেত্রীদের অভিনয় করার পরিসর ছিল তুলনামূলকভাবে কম, তবুও স্বল্প পরিসরে সকলেই নিজের-নিজের দায়িত্বটুকু পালন করেছেন। সিনেমাটোগ্রাফি বেশ ভাল, বিশেষ করে লং প্যান শটগুলি। গানগুলি আলাদাভাবে নজর না কাড়লেও সিনেমার মেজাজের সঙ্গে মানানসই। সিনেমায় রজতাভ দত্তর চরিত্রটা নিয়ে কিন্তু একটা টুইস্ট রয়েছে, তাই তাঁর চরিত্রের ব্যাপারে কিছু না বলাই ভাল, সেটা না হয় সিনেমার জন্যই তোলা থাক। মোটের উপর যদি শুধু এন্টারটেনমেন্টের জন্য সিনেমাটি দেখতে যাওয়া হয়, তবে দর্শকরা একেবারেই নিরাশ হবেন না।

পক্ষপাতে রোমাঞ্চ মৃত

এক যে ছিল রাজা

ekjchilo-raja-still

পরিচালনা: সৃজিত মুখোপাধ্যায়

অভিনয়ে: যিশু সেনগুপ্ত, জয়া আহসান, অপর্ণা সেন, অঞ্জন দত্ত, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, রাজনন্দিনী পাল প্রমুখ

ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা ভারতীয় আইনিব্যবস্থার ইতিহাসে একটি বিরল এবং ল্যান্ডমার্ক মামলা। সেই মামলা নিয়েই সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘এক যে ছিল রাজা’। কিন্তু কেন এই মামলা এতটা গুরুত্বপূর্ণ? দুঃখের বিষয়, এই ছবিটি দেখলে কখনওই মনে হয় না, কেসটি খুব জটিল ছিল। তার প্রথম কারণ ক্লাসিক্যাল মামলাটিকে (এবং ভাওয়াল সন্ন্যাসীর জীবনটিকেও) ‘ফিকশন’-এ পরিণত করেছেন পরিচালক। ফিকশনই যদি করবেন, তাহলে এই বিষয়টি বাছলেন কেন? ছবিটির গোড়াতেই পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বিখ্যাত বই ‘দ্য প্রিন্সলি ইম্পোস্টার’-এর উল্লেখ রয়েছে। বইটি যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, আগাগোড়া কতটা রোমাঞ্চকর গোটা মামলাটি। পাঠক ধন্ধে পড়ে যান যে, ১১ বছর পর ফিরে আসা সন্ন্যাসীই ভাওয়ালের মেজোকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় কি না। এবং এটিই হতে পারত ছবিটির ইউএসপি। কিন্তু পরিচালকের পক্ষপাতে সেই রোমাঞ্চটাই উধাও।

ছবির শুরুতেই পরিচালক দেখিয়ে দিয়েছেন সন্ন্যাসীই আদতে রাজা। এবার অপেক্ষা শুধু কোর্টে প্রমাণিত হওয়ার। ছবিতে রমেন্দ্র নারায়ণ রায় হয়েছেন মহেন্দ্রকুমার চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী বিভাবতীদেবী হয়েছেন চন্দ্রাবতী, বোন কৃপাময়ীর অনশনের দাবী হয়ে গিয়েছে আত্মহত্যার হুমকি ইত্যাদি। এই মামলার যা জটিলতা, তা একটি চলচ্চিত্রে কী করে দেখানো হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ছবির দৈর্ঘ্য ২ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। অথচ, প্রথমার্ধের সিংহভাগ জুড়ে মেজোকুমারের খামখেয়ালিপনা, শিকারপ্রেম, অবাধ যৌনজীবন! সেসব তো দর্শক উত্তমকুমার অভিনীত ‘সন্ন্যাসী রাজা’-তে দেখেছেন! যা দেখেননি, তা হল এই বর্ণময় মামলা। সেখানেই এই ছবির খামতি। কোর্টরুমের সাক্ষ্য, সওয়াল-জবাবের ধারা এতটাই সরলীকৃত যে প্রশ্ন জাগে, এই মামলা এতবছর ধরে চলেছিল কেন? শারীরিক বৈশিষ্ট্য দিয়েই যদি প্রমাণ করা যায় ব্যক্তির পরিচয়, তা হলে তা এতবছর ধরে চলল কেন? আর তখনই বিরক্তির উদ্রেক হয়। প্রশ্ন জাগে, রাজার স্ত্রী কি তার মৃত্যুর ষড়যন্ত্রে সামিল ছিল? ছবিতে তা দেখানো হয়নি। তবে কেন সে প্রতারক বলে চিহ্নিত করল সন্ন্যাসীকে? সন্ন্যাসীর বাংলায় উত্তর ভারতীয় টান কেন (এর ব্যাখ্যা পার্থবাবুর বইতে রয়েছে), কীভাবে নিজের মাতৃভাষা মাত্র ১১ বছরে বিস্মৃত হলেন তিনি, এসব দর্শকের কাছে অজ্ঞাতই রয়ে যায়।

অনেক সাক্ষাৎকারে সৃজিত বলেছেন, এই ছবিতে নারীবাদের একটা আঙ্গিক রয়েছে। কোথায়? চন্দ্রাবতী তো এখানে নেহাতই খেলার পুতুল! বিপক্ষের উকিল অনুপমার (অপর্ণা সেন) মুখে কিছু সংলাপ গুঁজে দিলেই নারীবাদ প্রমাণিত হয়? দেশাত্মবোধ, সত্যের জন্য লড়াইয়ের মতো আদর্শবাদী কথা তো বসালেন পুরুষ ব্যারিস্টার ভাস্করের (অঞ্জন দত্ত) মুখেই! অনুপমার মামলা লড়ার কারণটা সেখানে খুব ছেঁদো লাগে যে! নারীবাদের মূল বক্তব্য দর্শক অবধি পৌঁছয় না একেবারেই। না চরিত্রায়ণে, না গল্পে। এসব সাবপ্লটে না জড়িয়ে বোধহয় মূল ঘটনার বিস্তারে মন দিলে ছবিটি উপভোগ্য হত।
অভিনয়ের কথা বললে, যিশু সেনগুপ্ত অনবদ্য। শারীরিক অভিনয়টা যে তিনি পারদর্শিতার সঙ্গে করতে পারেন, তা বারবার করে প্রমাণ করেছেন নিজেকে ভেঙেচুরে। ভাল লাগে জয়া আহসানকেও। বেশ সাবলীল তিনি, বোধহয় বাঙাল ভাষায় দখলের জন্যই। নবাগতা রাজনন্দিনীর অভিনয়ের পরিসর খুবই কম। অনির্বাণ ভট্টাচার্য ভাল অভিনেতা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এবার কিন্তু ম্যানারিজ়মগুলো একটু একঘেয়ে ঠেকছে। অঞ্জন দত্ত এবং অপর্ণা সেন দু’জনেই ভাল অভিনয় করেছেন। বিশেষ প্রশংসার দাবিদার সোমনাথ কুন্ডু, যিনি মেকআপ করেছেন। ছবির সঙ্গীতরচনা খুব সুন্দর, বিশেষ করে শ্রেয়া ঘোষাল এবং ঈশান মিত্রর গলায় ‘এসো হে’ গানটি, যা ছবিজুড়ে বিভিন্ন দৃশ্যের আবহে বেজেছে।

কিন্তু আলাদা করে অভিনয়, মেকআপ, গান কি একটি ছবিকে স্বমহিমায় উত্তীর্ণ করতে পারে? ছবির মূল কাঠামো, অর্থাৎ চিত্রনাট্যই যেখানে দুর্বল! দীর্ঘ দৈর্ঘ্যের এই ছবি রীতিমতো ‘বোরিং’ লাগে কিছু জায়গায়। সব কিছু দেখানোর লোভ সংবরণ করে পরিচালক যদি ভাওয়াল সন্ন্যাসীর বর্ণময় মামলায় বেশি মন দিতেন, তাহলে দর্শক একটি অনবদ্য ছবি উপহার পেতে পারতেন। রাজা মহেন্দ্রকুমারকে সত্যের পরাকাষ্ঠায় উন্নীত করতে গিয়েই রোমাঞ্চের মৃত্যু হল।

প্রাপ্তি অর্জুন…

ব্যোমকেশ গোত্র

bomkesh-gotra-still

পরিচালনা: অরিন্দম শীল

অভিনয়ে: আবির চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত, অর্জুন চক্রবর্তী, সোহিনী সরকার, রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়

এই গল্প কতটা শরদিন্দুর এবং কতটা অরিন্দমের, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু বলতে বাধা নেই, মূল কাঠামো এক রেখে, তার উপর যেটুকু কারিকুরি করেছেন অরিন্দম, তা ভীষণ রকম প্রশংসাযোগ্য। আর এখানেই ‘ব্যোমকেশ গোত্র’ আর পাঁচটি ব্যোমকেশ-ছবিকে টেক্কা দিয়েছে। মূল গল্প প্রায় সকলেই জানেন। তা-ও বলি, সত্যকাম দাস ব্যোমকেশের কাছে আসেন একটি অদ্ভুত দাবি নিয়ে। তাঁর মৃত্যুর পর ব্যোমকেশ যেন তদন্ত শুরু করেন। তার আগে নয়। গল্পটিকে অরিন্দম নিয়ে গিয়ে ফেলেছেন মুসৌরীতে। তারপর পাহাড়ের দুর্দান্ত পরিবেশে তার সঙ্গে পরতে পরতে যোগ করেছেন ব্যাভিচার, উত্তেজনা এবং রহস্য। এক সময় খুন হন সত্যকাম।

ব্যোমকেশ গোত্রে সবচেয়ে বেশি যেটা চোখ টেনেছে, তা হল গল্প বলার ধরন। বেশ স্মার্ট চিত্রনাট্যের সঙ্গে দুর্দান্ত সংলাপ (ইতিহাসের অন্তর্ভুক্তিও ঘটেছে), এডিটিং এবং ক্যামেরার মিশেলে ভাল একটি থ্রিলার হিসেবে তৈরি হয়েছে ছবিটি। ফলে হুডানিট-এর সেই টানটান শিহরণটা না থাকলেও, দর্শকদের সিটে বসিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আসলে পুরো ব্যাপারটিই তো সত্যের অণ্বেষণ… আর ব্যোমকেশ সেটি কীভাবে করছে, এই দুইয়ের উপরই মূল ফোকাসটি রেখেছেন অরিন্দম। ফলে দর্শক বেশ খানিকক্ষণ আগে যদি বুঝতেও পেরে যান, কে খুনি, তাতেও বিশেষ কোনও সমস্যা হবে না। কারণ ওই… গল্প বলার ধরন। চরিত্র নির্মাণেও যথেষ্ট সময় দিয়েছেন পরিচালক। সেটা গল্পের জন্য ভাল হয়েছে। আবির তো ‘ব্যোমকেশ’ হিসেবে বেশ সফল। এ ছবিতেও তার ব্যতিক্রম নয়। তার উপর হাত, মাথা এবং মুখ (পড়ুন সংলাপ) চালানোর যথেষ্ট জায়গা আছে। ফলে ভাল লাগে। ‘সত্যবতী’ হিসেবে সোহিনী অনেকটা জায়গা পেয়েছেন। তার পূর্ণ সদ্ব্যবহারও করেছেন। রাহুল ‘অজিত’ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে ভীষণ সুন্দর কিছু সংলাপ এবং পাঞ্চ রয়েছে। কিন্তু ব্যোমকেশের প্রতি তার মুগ্ধতা, ‘অজিত’ চরিত্রটির সঙ্গে যায়নি। একটু গাম্ভীর্যের অভাব মনে হয়েছে। ভাল লেগেছে অঞ্জন দত্তকেও। কিন্তু এমন দুর্দান্ত একজন অভিনেতাকে আর একটু ব্যবহার করতে পারতেন অরিন্দম। তবে এই ছবি যাঁকে ঘিরে, মানে ‘ব্যোমকেশ’-এর পরেই, তিনি ‘সত্যকাম’ রূপে অর্জুন। অর্জুন, আপনাকে কুর্নিশ, এমন মনে রাখার মতো অভিনয় করার জন্য। সত্যকাম হিসেবে অর্জুনের ব্যাভিচার, নির্লজ্জতা, কষ্ট… দর্শকের মনে থাকবে অনেকদিন। অর্জুনের এই অভিনয় প্রশ্ন তুলতেই পারে, কেন তাঁকে আরও বেশি ছবিতে ব্যবহার করা হয় না। বিক্রম ঘোষের আবহও ছবির গতিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ফলে, এটা বলাই যায়, অরিন্দম তাঁর এযাবৎকালের ‘সেরা’ ব্যোমকেশ বানিয়ে ফেললেন। কিন্তু সব কিছু পরে প্রশ্ন একটাই, সেটা হল অ্যাকশন সিকোয়েন্সগুলোকে কি আর একটু স্মার্ট বানানো যায় না? কতদিন আর লোকজন দলবল নিয়ে গিয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে আর এক-এক করে মার খাবে?

অসাধারণ একটি অভিজ্ঞতা…

অন্ধাধুন

andhadhun-still

পরিচালনা: শ্রীরাম রাঘবন

অভিনয়ে: আয়ুষ্মান খুরানা, তব্বু, রাধিকা আপ্তে, অনিল সিন্‌হা

ট্রেলার দেখে এই ছবিকে একটা সোজাসাপটা থ্রিলার হিসেবেই মনে হয়েছিল। গল্পও আপাতদৃষ্টিতে বেশ সহজসরল। এক অন্ধ পিয়ানোবাদক। একটি খুন এবং সেই খুনের সাক্ষীকে লোপাট করার জন্য খুনিদের ব্যাকুলতা… পরিচালক শ্রীরাম রাঘবনের নতুন ছবি ‘অন্ধাধুন’কে যদি একেবারে সহজ কথায় ব্যাখ্যা করতে হয়, তার বিবরণ খানিকটা এইরকমই হবে। কিন্তু ‘এক হাসিনা থি’, ‘বদলাপুর’ প্রভৃতি ছবি খ্যাত এই পরিচালকের ছবিকে কোনও নির্দিষ্ট ঘরানা বা বাঁধাগতের ঘেরাটোপে যে সীমাবদ্ধ করা যায় না! ফলে সহজ কথায় ব্যাখ্যা করে কোনও লাভ নেই। এই ছবিতে থ্রিলারকে ছাপিয়ে যে জিনিসটি প্রাধান্য পেয়েছে, তা হল হিউমর… ডার্ক হিউমর। যদিও এই ছবিতে রোমাঞ্চের অভাব নেই। বলতে গেলে একেবারে ‘এজ অফ দ্য সিট’… কিন্তু তা-ও বলতে হয়, হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে মানুযের হীন প্রবৃত্তিগুলিকে সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। তৈরি করেছেন একটি রূপক…
‘‘অন্ধে হোনে কে প্রবলেমস তো সবকো পতা হ্যায়, ফায়দেঁ ম্যাঁয় বতাতা হুঁ…’’ এই ছবির মুখ্য চরিত্র আকাশের বলা এই কথাটিই ছবির প্রেক্ষাপটটি প্রকাশ করে। আকাশ একজন প্রতিভাবান পিয়ানোবাদক। নিজের কাজকে আরও উৎকৃষ্ট করার জন্য সে অন্ধ হওয়ার ভান করে। তাকে অন্ধ মনে করে অধিকাংশ মানুষই তার সামনে অম্লানবদনে অনেক কুকীর্তি করে যায়! সুতরাং বাধ্যতামুলক সৌজন্যের মুখোশের আড়ালে অনেকের প্রকৃত স্বভাবের সঙ্গেই সে পরিচিত। এমন সময়ই এক মক্কেলের বাড়িতে পিয়ানো বাজানোর আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ে আকাশ…

শুরুতেই বললাম, ২০১০ সালের ফরাসি ছবি ‘দ্য পিয়ানো টিউনার’ এর ছায়ায় ‘অন্ধাধুন’কে সেই অর্থে মার্কামারা থ্রিলারের চেয়ে ব্ল্যাক কমেডি বললেই বেশি ভাল হয়। হলিউডে এই ঘরানার অনেক ছবি হলেও, এদেশে এইরকম ছবি খুব একটা হয়নি। ফলে দর্শকদের একটা নতুন জঁর-এর সঙ্গে পরিচিত করার ক্ষেত্রে শ্রীরাম রাঘবন ১৬ আনা সফল হয়েছেন। বিশেষ করে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের সঙ্গে সাম্যঞ্জস্য রেখে কোনও রকম সংলাপ ছাড়াই স্রেফ মূকাভিনয় প্রয়োগ করে পরিচালক যেভাবে একটি খুন এবং প্রমাণ লোপাটের দৃশ্য তৈরি করেছেন, তার তারিফ না করে উপায় নেই। অভিনয়ের প্রসঙ্গে আসা যাক। প্রত্যেকের অভিনয়ই অনবদ্য। আয়ুষ্মান খুরানা এক কথায় অসাধারণ। বিগতদিনের এক তারকার (ট্র্যাজিকোমিক) ভূমিকায় অনিল সিন্‌হার চমকপ্রদ অভিনয় দর্শককে ‘সানসেট বুলেভার্ডের’ নর্মা ডেসমন্ডের কথা মনে করিয়ে দেবে। কিন্তু এই ছবির মুল পাওনা, তব্বু। তাঁর অভিনীত নির্মম, বিবেকহীন ‘সিমি সিনহা’ দর্শককে শেক্সপিয়রের লেডি ম্যাকবেথের কথা মনে করিয়ে দেয়। রাধিকা আপ্তে, ছায়া কদম, জ়াকির হুসেনরাও তাঁদের ভূমিকায় নিজের সেরাটুকু দিয়েছেন।

কিন্তু তা-ও বলতে হয়, এই ছবির সেরা ‘নায়ক’ শ্রীরামই। এত মুন্সিয়ানার সঙ্গে তৈরি খুঁতহীন একটি ছবির জন্য অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করেছিল দর্শক। যেখানে, অভিনয়, গল্প, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর… সব বিভাগ আলাদা আলাদা করে অনবদ্য হয়ে ছবিটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

মেকিং স্মার্ট, কিন্তু…

তুই শুধু আমার

Tui-shudhu-amar--still

পরিচালনা: জয়দীপ মুখোপাধ্যায়

অভিনয়ে: সোহম, ওম, মাহিয়া মাহি

পিনাকী (ওম) উচ্চাকাঙ্খী ছেলে। বেশ আঁটঘাট বেঁধে সে লন্ডননিবাসী বিজ়নেস টাইকুন আদিত্য সিংহ রায়ের (সোহম) সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে চায় নিজের বান্ধবী প্রিয়াংশীকে (মাহি) হাতিয়ার করে। সোজা রাস্তা এটাই। কিন্তু এর মধ্যে গলিঘুঁজি প্রচুর! তবে সরলীকরণ করলে বোধহয় পাঠকের সুবিধে হবে। ছবিটি অক্ষয় খন্না ও ববি দেওল অভিনীত সুপারহিট ছবি ‘হমরাজ়’-এর রিমেক। একদম টেক্সটবুক কপি নয়, হালকা এডিটিং আছে। ক্রুজ়ের ব্যবসা হয়েছে এথনিক জুয়েলারি, ট্যাম্পোলিনের মার্ডার হয়েছে নিছক মার খেয়ে মৃত্যু… ইত্যাদি টুকটাক বদল। লজিকের ধার খুব একটা ধারছি না। প্রশ্ন তুলছি না, অ্যাড ফিল্ম ক্যাম্পেন শুট হয়ে যাওয়ার এতদিন পরও পিনাকী ওরফে পিকু লন্ডনে কী করে থেকে গেল, তার সঙ্গে প্রিয়াংশীর সম্পর্কটা আদতে বন্ধুত্বের নাকি প্রেমের (একবার প্রিয়াংশী বলছে তাকে ভালবাসত, পর মুহূর্তেই বলছে শুধুই বন্ধু মনে করত)… কারণ ছবির মেকিং বেশ ঝকঝকে। বাণিজ্যিক (ইদানীং প্যারালালও) ছবির ক্ষেত্রে একরকম ধরেই নেওয়া হয় যে, লজিক নিয়ে খুব একটা ভাববে না দর্শক। হয়তো ভাবেও না। কিন্তু তার জন্য প্যাকেজিংয়ে আরও অনেক স্তর থাকতে হয়। সোহম সাবলীল অভিনেতা, এখানেও তাঁকে ভাল লেগেছে। নেগেটিভ চরিত্রে ওম বেশ ভাল। ‘ইভল’ ব্যাপারটি তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন বিশ্বাসযোগ্যভাবে। তবে মাহিয়া মাহি বড্ড কৃত্রিম! ভীষণ আড়ষ্ট এবং চড়া দাগের অভিনয় তাঁর! স্মার্ট মেকিং দিয়ে ছবির মেদ ঢাকতে হলে যে উপকরণগুলি প্রয়োজন, তার মধ্যে অন্যতম গ্ল্যামার। যে ধরনের পোশাক পরেছেন অভিনেতারা, বিশেষত নায়িকা, তা প্রাগৈতিহাসিক যুগের এবং তার লুক অ্যান্ড ফিল খুবই খারাপ। গানগুলো শুনতে ভালই। ওম যে ভাল নাচতে পারেন, তা এই ছবিতে বেশ পরিষ্কার। কিন্তু ছবিতে ওমের লম্বা চুলের যে লুক, তার সঙ্গে পোস্টারের লুক আলাদা কেন? ভাল লেগেছে বিশ্বনাথ বসুর কমেডি। জয়দীপ পরিচালিত ছবিতে একটি প্রয়াস নজরে পড়ে, কাস্টিং এবং আরও কিছু খুঁটিনাটির দিকে নজর দিলে সার্বিকভাবে একটি ভাল ছবি দর্শক উপহার পেতেই পারে। আর একটু ওরিজিনাল স্ক্রিপ্ট যদি চেষ্টা চরিত্র করে হাতে পেলে ভালই হত আর কী!

পুরনো গল্প আর কতদিন…

টুসকি

tuski-still

পরিচালনা: অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

অভিনয়ে: খরাজ মুখোপাধ্যায়, কাঞ্চনা মৈত্র, অনামিকা সাহা, রাণা মিত্র, প্রিয়ঙ্কা দত্ত, মৌমি বসু

টাকা আছে, তাই আপনি ভাল খেতে পারবেন, ভাল পরতে পারবেন, আপনার ছেলে বা মেয়ে ভাল স্কুলে পড়তে পারবে, সুন্দর, আরামদায়ক একটা জীবনও কাটাতে পারবেন… এ তো এক্কেবারে হক কথা। আর যদি টাকা না থাকে? আপনি যদি নিম্ম মধ্যবিত্তের একটু নিচে হন? নাহ, তা হলে উপরের যেগুলোর কথা বললাম, সেগুলোর একটাও পাবেন না, এ তো একেবারে সোজা হিসেব। যুগ-যুগান্তর ধরে ঠিক এইরকমটাই হয়ে আসছে। ‘টুসকি’র মোড়কে পরিচালক অনিকেত চট্টোপাধ্যায় এরকমই একটা গল্প শোনাতে চান আমাদের। টুসকি (প্রিয়ঙ্কা দত্ত) একটা ছোট্ট মেয়ে, বস্তিতে থাকে। তার মা (‘টুসকি’ নিজের মা মারা যাওয়ায় মাসির কাছে প্রতিপালিত) রণিতা (কাঞ্চনা মৈত্র) কাজ করে এক ধনী বাড়িতে। সে বাড়ির মেয়ে টুয়া (মৌমি বসু)। টুসকি আর টুয়া সমবয়সী, কাকতালীয়ভাবে তাদের জন্ম একইদিনে, ১৫ অগস্ট। টুসকির সঙ্গে টুয়ার মেলামেশা না-পসন্দ টুয়ার মায়ের। কারণ তাদের ‘শিক্ষা’ (মানে ইংরেজি স্কুলে পড়ে না, আর কী) নেই, তাদের মুখে অশ্লীল ভাষা। আর পাঁচটা বড়লোক বাড়ির আদুরে মেয়েরা যেমন হয়, সেরকমই টুয়াকে আতুপুতু করে রাখেন মা, মেয়ের পড়াশোনা, মেয়ে কোন স্কুলে ভর্তি হবে, এই নিয়ে মায়ের চিন্তার শেষ নেই! নামী স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করার জন্য ‌এই উন্নাসিক ‘ভদ্র’মহিলা ঘুরপথে ‘সাহায্য’ (কেমন সে সাহায্য সে না হয় আপনারা নিজে গিয়েই দেখে নেবেন) নিতে ছাড়েন না কাউন্সিলরেরও (রাণা মিত্র)। অন্যদিকে টুসকি মেধাবী, সে ভাল স্কুলে পড়তে চায়। রণিতা ঠিক করে টুসকিকে সে টুয়ার স্কুলে ভর্তি করবে। বস্তির মেয়ে কেন পড়বে ‘ভদ্রলোক’-দের স্কুলে? বেঁকে বসেন টুয়ার মা। আমদানি হয় ভিলেনেরও। শুরু হয় লড়াই।

সহজ, সাদামাটা একটা প্লট। নতুনত্বও নেই। কিন্তু অনিকেতের এই সিনেমাটা যেন তার চেয়েও বেশি সরল, বা বলা ভাল বড্ড সাধারণ। গল্পটা যে কী, সেটার পুরো আঁচ পাওয়া গিয়েছিল ট্রেলারেই। তাই সিনেমায় আলাদা করে কোনও চমকও থাকে না। বরং হলে ঢোকার আগেই জানা হয়ে যায় শেষপর্যন্ত কী হবে! সিনেমার মাধ্যমে সমাজকে বার্তা দেওয়া ভাল, কিন্তু শুধুমাত্র একটা সামাজিক বার্তা (যেটা কিনা খুব পুরনো একটা কথা) দেওয়ার জন্যই কি পরিচালক এত আয়োজন ফেঁদে বসলেন? একটি মেয়ের পড়ার জন্য সব্বাই মিলে চাঁদা তুলে টাকা জোগাড় করে, এরকম রূপকথার মতো বস্তিই বা কোথায় হয়? আর যেখানে পড়াশোনার জন্যই সবাইকে দিতে হয় দশ টাকা করে চাঁদা! লোকের খাবার জোটে না ঠিক করে, সেখানে মিশনারিদের আসার খবরে কী করে যে তারা বস্তিটাকে রং-টং করে, সাজিয়ে ঝাঁ চকচকে করে ফেলতে পারে রাতারাতি, সে নিয়ে বেশ খানিক খটকা লাগে বৈকি! কথায়-কথায় লোকজন (পড়ুন কাউন্সিলর আর তার সাগরেদরা) একটি বিশেষ পত্রিকাকে গালিই বা দেয় কেন বোঝা গেল না, ঠিক যেমন বোঝা গেল না শেষে একজন মাওবাদী সন্দেহভাজনকে (চে গেভারা পড়লেই কি মাওবাদী হয়ে যেতে হয়?) প্লটে ঢুকিয়ে ঠিক কী খিচুড়িটা পাকাতে চাইলেন পরিচালকমশাই! অভিনেতারা সকলের অভিনয়ে খানিক চড়া, অতিরিক্ত মেলোড্রামায় ঘনঘন তাল কাটে। তবে খরাজ মুখোপাধ্যায়ের কথা খানিক বলতে হয়, কারণ এই সিনেমায় কমিক চরিত্রের বাইরেও তাঁকে পাওয়া গেল অন্যরকম চরিত্রে। নবাগত শিশুশিল্পী প্রিয়ঙ্কা, মৌমি ঠিকঠাক। সিনেমার একটি গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, ‘হাওয়া লাগে গানের পালে’ লোপামুদ্রার গাওয়া। আর হ্যাঁ, এই সিনেমা তৈরি হয়েছিল ২০১৪ সালে, তাই উঁকি মারে পুরনো হাজার টাকার নোট। তবে মাত্র কয়েকটা গালাগালির জন্য (পরিচালকের ভাষায়, বস্তিবাসীরা তো আর শান্তিনিকেতনের ভাষায় কথা বলবে না!) ‘এ’ তকমা পাওয়া সত্যিই মানা যায় না। অনিকেতের আক্ষেপ যথার্থ, যাদের জন্য এ সিনেমা, তারা তো দেখতেই পাবে না। কিন্তু বাচ্চারা কি দেখতে পেলে আনন্দ পেত?