Category Archives: review detail

ধাঁধাময়

আলিনগরের গোলকধাঁধা

পরিচালক: সায়ন্তন ঘোষাল
অভিনয়: অনির্বাণ ভট্টাচার্য, পার্নো মিত্র, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কৌশিক সেন, গৌতম হালদার

কলকাতার অজানা মিথগুলোকে ছুঁয়ে দেখতে চান? হারিয়ে যেতে চান ধাঁধার রহস্যে? তাহলে অবশ্যই মন ভরাবে সায়ন্তন ঘোষালের ছবি ‘আলিনগরের গোলকধাঁধা’। কলকাতার অনেক প্রাচীন মিথকে নিয়ে এ ছবি বুনেছে তার রহস্যের গল্প। আপাত অর্থে, গল্পটি একটি অন্বেষণের, এক হারানো অমূল্য সম্পদের খোঁজের। ১৯৯০ সালের সময়পটকে ঘিরে নির্মিত হয় এ ছবির প্রথমাংশ। সে সময়ের মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের এক ভগ্নপ্রায় জমিদারবাড়িতে নিলামের দৃশ্য দিয়ে এ ছবির সূচনা। সেই নিলাম থেকে একটি পুরনো তলোয়ার কেনেন জনৈক সোমনাথ দাস। তারপর সোমনাথের মৃত্যুর হয় অত্যন্ত আকস্মিকভাবেই। কাহিনি এরপর বর্তমানের পটভূমিকায় ফিরে আসে। গল্পের কাহিনিপট ‘আলিনগর’ কলকাতা। সেই কলকাতার ইতিহাসের পরিক্রমার পথ ছুঁয়ে ছুঁয়ে কাহিনি তার রহস্যকে ঘনীভূত করে। ‘বাংলার আয়না’ গ্রন্থের লেখক আশুতোষ সিংহ (কৌশিক সেন) তাঁর মেয়ের (পার্নো) বন্ধু সোহমকে (অনির্বাণ) একটি সংকেতপূর্ণ চিঠি উদ্ধার করতে দেন। অন্যদিকে কৌশিক নিজে প্রতিদিনই একটি করে অদ্ভুত চিঠি পেতে থাকেন। আশুতোষের বাড়িতে থাকেন সাক্ষীগোপাল (পরাণ) যে বিগত অতীতের অনেক স্রোত-উপস্রোতের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। এর বিপরীতবিন্দুতে অবস্থান আবীর মিত্তলের (গৌতম হালদার), যিনি সমস্তরকম নেগেটিভ বৃত্তিগুলিকে আয়ত্ত করেছেন, ছবিতে তাঁর প্রকাশ যদিও খানিকটা মেলোড্রামাটিক। এভাবেই রহস্যের পরত পড়তে থাকে ছবির কাহিনিতে। কাহিনিটি আকৃষ্ট করে, কিন্তু অনেক তথ্য এত গতিময়তার সঙ্গে পরিবেশিত হয় যে, সেটা দর্শকদের কাছে পৌঁছয় অবিন্যস্তভাবে। যদিও সুতানুটির সেকালের নানা কথকতা ছবির সঙ্গে উঠে আসে। মূল চরিত্রে অনির্বাণের অভিনয় প্রশংসনীয়। একাধারে ধাঁধার বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান, অন্যদিকে ইতিহাসমথন— এ দুইয়ের সমন্বয় অনির্বাণের চরিত্রে। পার্শ্বচরিত্রে পার্নো, কৌশিক, পরাণ প্রত্যেকেই চরিত্রানুগ।

ঠিকমতো ফিরে আসা হল না

আমি আসবো ফিরে
Aami-Ashbo-Phirey-still

পরিচালক: অঞ্জন দত্ত
অভিনয়: অঞ্জন দত্ত, কৌশিক সেন, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জনা বসু, দর্শনা বণিক

অঞ্জন দত্তর চেনা স্টাইলের ছবি। পরিচালক শহরের বেশ কিছু মানুষের জীবনের গল্প বলেছেন যারা একে অপরের সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে যুক্ত, রয়েছে তাদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন, জীবনের মানে খোঁজার চেষ্টা। তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে বর্তমান সমাজের বেশ কিছু আলোচ্য সমস্যাকেও। আগাগোড়া ভারী বিষয় নিয়ে আলোচনার মাঝে ছোট ছোট কিছু কমিক রিলিফের ব্যবহারও বেশ ভাল। তবে বিষয়বস্তু অনুযায়ী আরও একটু বেশিই আশা করা হয়েছিল। ছবির দ্বিতীয় ভাগ একটু অযথাই দীর্ঘায়িত মনে হয়েছে, শেষটাতেও তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট। গানগুলির কথা ও সুর ভাল, যা ছবিটিকে অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। গানের কথায় টুকরো টুকরো উঠে এসেছে নস্ট্যালজিয়া। তবে গান হয়তো কোনও কোনও মানুষের দুঃসময়ের সঙ্গী বা পথ চলার অবলম্বন হতে পারে, কিন্তু যদি শুধুমাত্র কয়েকটি গান এক ধাক্কায় বেশ কয়েকজন লোকের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, তা কি পুরোপুরি বাস্তবসম্মত বলা যায়? অভিনয়ে উঠতি গায়ক অর্কর ভূমিকায় অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন দত্ত (রণজয়), অঞ্জনা বসু (মালা) সহ সকলেই নিজের দায়িত্বটুকু ভালই পালন করেছেন। সিনেমার দৃশ্যপটগুলি প্রশংসনীয়।

অতিরিক্ত দীর্ঘ, দুর্বল অভিনয়

চালবাজ়
Chalbaaz-still2

পরিচালক: জয়দীপ মুখোপাধ্যায়
অভিনয়: শাকিব খান, শুভশ্রী গাঙ্গুলি, আশিস বিদ্যার্থী, রজতাভ দত্ত

অনেকগুলি বলিউডি রোম্যান্টিক কমেডি ছবির থেকে কিছু-কিছু ঘটনা তুলে যদি একটা গল্প বানানোর চেষ্টা হয়, আর সেটা যদি মিশে যায় দুর্বল অভিনয় ও একই ধরণের সংলাপের সঙ্গে, তাহলে যা তৈরি হয়, সেটাই হল ‘চালবাজ়’।

কাকার বাড়িতে বড় হওয়া শ্রীজাতার (শুভশ্রী) বিয়ে ঠিক করা হয়, তার উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়ে। বিয়ের রাতেই বাড়ি থেকে পালিয়ে, লন্ডনে পুরনো প্রেমিকের কাছে চলে যায় শ্রীজাতা। গিয়ে জানতে পারে সেই ছেলেটির এক বিদেশিনী প্রেমিকা আছে। বিয়ে, এবং বিদেশে পিএইচডি করার স্বপ্ন, দুটোই ভেঙে যায় শ্রীজাতার। এমন সময়েই তার পরিচয় হয় টাকা রোজগারের জন্য ড্রাইভার থেকে শেফ, সব রকম কাজ করা রাজার সঙ্গে (শাকিব)। রাজা ‘টাকার জন্য সব করতে পারে, কিন্তু নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যায় এমন কিছু করবে না’। তারা একসঙ্গে দেশে ফিরে এলে শুরু হয় নানা ঘটনা। শ্রীজাতার বাড়ির লোকজন রাজাকেই তার বর ভেবে বসে।

চেনা ছকে বাঁধা হালকা মেজাজের রোম্যান্টিক কমেডি ছবি হতেই পারত ‘চালবাজ়’। আর সেটা হলেই হয়তো ভাল হত। ছকের বাইরে বেরনোর জন্য কিছু দুঃখের মুহূর্ত ঢোকাতে গিয়েই তাল কাটল ছবির। প্রথমত, অতিরিক্ত দীর্ঘ হয়ে যাওয়ায় মাঝে বেশ কিছু অংশ খুবই অপ্রয়োজনীয় লাগে। দ্বিতীয়ত, দুর্বল অভিনয়ের কারণে দৃশ্যগুলি ঠিক বিশ্বাসযোগ্যও হয়ে ওঠে না। শাকিবের মুখের অভিব্যক্তির কোনও বদল ঘটে না খুশির বা দুঃখের দৃশ্যে। গ্ল্যামার কুইনের অবতার থেকে বেরিয়ে আসার কোনও চেষ্টা দেখা যায় না শুভশ্রীর অভিনয়ও। রাজার সহায়কের ভূমিকায় রজতাভর অভিনয় স্বভাবতই ভাল। এক কাপ চা বানাতেও জানে না সে, অথচ এক ব্যাগ হাতা-খুন্তি নিয়ে গোয়া থেকে লন্ডন চলে যায় শেফ হতে। রজতাভর কমিক টাইমিং নিয়ে আলাদা করে কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন। শ্রীজাতার কাকার ভূমিকায় আশিস বিদ্যার্থীও ভাল।

সবশেষে বলা যায়, গল্পটি থেকে অনেক অংশ বাদ দিয়ে, হাসির সংলাপগুলি আরও বুদ্ধিদীপ্ত করে, আরও সহজভাবে গল্পটি বললে হয়তো আর একটু ভাল লাগত।

দেবের সেরা

কবীর
KABIR-still

পরিচালক: অনিকেত চট্টোপাধ্যায়
অভিনয়: দেব, রুক্মিণি, প্রিয়ঙ্কা সরকার, শতফ ফিগার

দেবের অভিনয় নিয়ে এতদিন যাঁরা সমালোচনা করেছেন, এবার তাঁদের মুখ বন্ধ করার পালা। উচ্চারণ, অভিনয়, ডায়লগ ডেলিভারি–এসব নিয়ে এতদিন কম সমালোচনা সহ্য করেননি দেব! তাঁর নামে হরেকরকম মিম-ও তৈরি হয়েছে| এদিকে নিজের প্রোডাকশন হাউজ খোলার পর, ইন্ডাস্ট্রির অন্য বড় প্রোডাকশন হাউজগুলো এক ইঞ্চি জমিও ছেড়ে দেয়নি! তাও নিজের মতো করে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাচ্ছেন দেব| ‘কবীর’-এর হাত ধরে সেই লড়াই সার্থকতা লাভ করল| এই ছবিতে দেব নিজের মুখেই বলেছেন যে বাঙালি হয়েও তাঁর বাঙলা মোটেও ভাল না| কিন্তু বাঙালি হয়ে তিনি যা করে দেখিয়েছেন, তা অনেকেই পারতেন না| পারা তো দূরের কথা! কল্পনাও করতে পারতেন না| নিজের প্রোডাকশন হাউজ থেকে সবসময়ই একটু অন্যরকম কাজ করেছেন দেব| ‘কবীর’ দেখে বলতে হয়, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে এরকম সিনেমা বাংলাতে হয়নি| এই ছবি বলিউডকেও কম্পিটিশন দেওয়ার ক্ষমতা রাখে|

ছবির গল্প একটি ট্রেন জার্নির| সেখানে মুখ্য দুই চরিত্র কবীর (দেব) ও ইয়াসমিন খাতুন (রুক্মিণী)| দুরন্ত এক্সপ্রেসে মুম্বই থেকে কলকাতা ফিরছে তারা| সেদিন সাতটা বিস্ফোরণে কেঁপেছে মুম্বই| গল্প এগোতে থাকলে জানা যায় যে কবীর একজন জেহাদি| তার বন্দুকধারী লোকেরা ইয়াসমিনের বাবাকে তাদের বাড়িতে ঘিরে রেখেছে| কিন্তু কেন? ইয়াসমিনের কাছে কী চায় কবীর? ‘ইমতিয়াজ কোথায়’–ইয়াসমিনের মুখ থেকে এটাই জানতে চায় কবীর| কে এই ইমতিয়াজ? কেনই বা কবীর তাকে খুঁজছে? ইয়াসমিনের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক? এইসব প্রশ্নের উত্তর বরং প্রেক্ষাগৃহের জন্যই তোলা থাক! গল্পে শেষের দিকে একটা টুইস্ট আছে| লস্কর-ই-তৈবার বোমা বিশেষজ্ঞ আব্দুল করিম টুন্ডা, ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন জঙ্গি ইয়াসিন ভটকল, স্পেশাল টাস্ক ফোর্স…অনেককিছুই আছে এই জমজমাট গল্পে| ছবি মুক্তির আগে একটা কথা সকলের মুখেই ঘোরাফেরা করছিল| এরকম সিরিয়াস বিষয়ের সফল উপস্থাপন করতে পারবেন তো পরিচালক? কারণ এর আগে হালকা মেজাজের কমেডি ছবি বানিয়েছেন অনিকেত| তবে এই ছবি দেখে বলতেই হচ্ছে অনিকেতই ‘ক্যাপ্টেন অফ দ্য শিপ’| গোটা ছবিজুড়ে একটা স্মার্টনেস আছে| তার ছাপ ক্লাইম্যাক্সেও রয়েছে| এছাড়া ছবির এডিটিং দুর্দান্ত| এক মিনিটও একঘেয়ে লাগে না| ইন্দ্রদীপ দাসগুপ্তর আবহসংগীতও দারুণ লাগে শুনতে| এবার আসা যাক অভিনয় প্রসঙ্গে| অভিনেতা দেবের এখনও পর্যন্ত এটাই সেরা কাজ| তাঁর ডায়লগ ডেলিভারি থেকে শুরু করে শরীরী ভাষা–এককথায় অনবদ্য| এছাড়া এই ছবির সম্পদ রুক্মিণী| শুধু সুন্দরীই নন, তিনি যে অভিনয়টাও পারেন তা এই ছবিতেই বুঝিয়ে দিয়েছেন| থিয়েটার আর্টিস্ট কৃষ্ণেন্দু দেওয়ানজি ও অর্ণ মুখোপাধ্যায় বেশ ভাল| শতফ ফিগারকেও দারুণ মানিয়েছে| তবে প্রিয়ঙ্কা সরকারের মতো অভিনেত্রী এই চরিত্রটি করতে গেলেন কেন বোঝা গেল না! এছাড়া আরও কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলেও তা এড়িয়ে যাওয়াই যায়| এরকম ছবি করার সাহস দেখানোর জন্য দেব ও অনিকেতকে ফুল মার্কস দেওয়া যেতেই পারে| রিসার্চ ওয়র্ক থেকে ছবির প্রোমোশন…দেব যে এই ছবি নিয়ে প্রচুর খেটেছেন তা প্রমাণিত| সবমিলিয়ে কবীর বাংলা ছবির ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবে থেকে যাবে| টিম কবীর-কে হ্যাটস অফ!

এক বিপন্ন কৈশোর

পর্ণমোচী
pornomochi-still

পরিচালক: কৌশিক কর
অভিনয়: ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়, অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, অঙ্কিতা ভট্টাচার্য, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

আমাদের মধ্যবিত্ত নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে কৈশোর আজ একা। দাদু-ঠাকুরমার সঙ্গ থেকে তারা বঞ্চিত। মা-বাবার ব্যস্ত কর্মসূচীর ফলে, তাদের থেকেও সময় পায় না। অবধারিতভাবে সেই কৈশোরের মনে জন্মায় নানারকমের বিকৃতি। এই গল্প সেই বিপন্ন কৈশোরের কথা বলে। পাশাপাশি, নাগরিক সমাজের অন্দরমহলটা যে যৌনবিকৃতির কোন তলদেশে এসে ঠেকেছে, এই ছবি তারও ভাষ্য হয়ে ওঠে। ছবির গল্পে, অনল (ঋতব্রত) বাবা-মা-র একমাত্র সন্তান। স্বাভাবিক পরিবেশে বড় হলেও বয়ঃসন্ধির নেশায় পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ে সে। স্কুলে ধরা পড়ার পর মা (অঙ্কিতা) বকলেও, বাবা (অনিন্দ্য) বন্ধুর মতো বিষয়টি বোঝায় তাকে। কিন্তু বিষয়টি গুরুতর হয়ে ওঠে যখন অনলের বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর অনল একটি পেনড্রাইভে কিছু ভিডিও পায়। এই ভিডিয়ো তার জীবনকে অন্যখাতে বইয়ে দেয়। এরপরই গল্পে আসে একটা ছকভাঙা টুইস্ট। গ্রীক রাজা অয়দিপাউসের নিয়তির সঙ্গে অনলের নিয়তি কোথাও যেন এক ফ্রেমে চলে আসে। এই কাহিনির সঙ্গে উঠে আসে এক পুলিশের (শান্তিলাল) জীবন ও তার যৌনবিকৃতি। যদিও মূল কাহিনির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তার কতটা প্রয়োজন ছিল সে প্রশ্ন উঠে আসতেই পারে। দৃশ্যগ্রহণের কিছু মুহূর্তে মুন্সিয়ানা দেখানো হয়েছে। এছাড়াও সিনেমায় রয়েছে কিছু আবহহীন দৃশ্য, যা মুহূর্তকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। সব শেষে অভিনয়ের বিষয়ে আসা যাক। অনল চরিত্রে অসাধারণ কাজ করেছেন ঋতব্রত। অন্যান্য চরিত্রবিন্যাসে শান্তিলাল, কনীনিকা, অনিন্দ্য, অঙ্কিতা প্রত্যেকেই যথাযথ।

মনকে নাড়া দেবে

গভীর গোপন বৃষ্টি
Gobhir-Gopon-Brishti-still2

পরিচালক: নরোত্তমপ্রসাদ শীল
অভিনয়: কৌশিক সেন, সমদর্শী দত্ত, সুদীপ্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রিয় দত্ত, স্নেহা চক্রবর্তী

মানুষকে নাড়া দেওয়ার ক্ষমতা আছে এই ছবির। ছবির প্লট খুব চেনা এবং বহু ব্যবহৃত হলেও দর্শকের বড় আপন। মা (অনিন্দিতা কপিলেশ্বরী)-বাবার (সুপ্রিয় দত্ত) সম্পর্কের তিক্ততা ও পরবর্তীকালে বাবার বন্ধুর (কৌশিক সেন) সঙ্গে মায়ের চলে যাওয়া গভীর রেখাপাত করে বৃষ্টির (সুদীপ্তা বন্দ্যোপাধ্যায়) মনে। ভালবাসার উপর বীতশ্রদ্ধ বৃষ্টি কলেজ লাইফে ফিরিয়ে দেয় আকাশের (সমদর্শী দত্ত) প্রেম প্রস্তাব। পরবর্তীকালে আবার আকাশের কাছাকাছি এসে তার মধ্যেই সে খুঁজে পায় নিজের প্রকৃত ভলবাসাকে এবং চায় তার সঙ্গে ঘর বাঁধতে। এরপর কী হয়, তা জানার জন্যই দেখতে হবে সিনেমাটি। প্রথম সিনেমায় যথেষ্ট নৈপুণ্য দেখিয়েছেন পরিচালক নরোত্তমপ্রসাদ শীল। কৌশিক সেন সম্পর্কে নতুন কিছু বলার না থাকলেও সুদীপ্তা, সমদর্শীর অভিনয় দর্শনীয়। স্বল্প পরিসরে নবাগতা স্নেহাও নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তবে তাঁর আরও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন আছে বলে মনে হল। সেটের খুঁটিনাটির দিকে যথেষ্ট নজর দিয়েছেন পরিচালক, তেমনই সমান নজর দিয়েছেন শট ডিভিশনেও। বাঙালীর কিছু নস্ট্যালজিক জিনিসকে খুব বুদ্ধিদীপ্তভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা দর্শককে আকর্ষণ করবে। অনিন্দ্যর সঙ্গীত পরিচালনায় গানগুলোর প্রয়োগ ও গায়কি বেশ যথাযথ। তবে দু’-একটি ব্যাপারে আর একটু যত্নবান হওয়া প্রয়োজন ছিল, যেমন একটি রবীন্দ্রনৃত্যের দৃশ্যে নায়িকার পোশাকে আর একটু নজর দেওয়ার দরকার ছিল বলে মনে হয়েছে। এছাড়া, আকাশ আর বৃষ্টি বাংলোতে একরাত রইল (যদিও আলাদা ঘরে)… এখনও আমাদের সমাজ কি এতটা উদার হয়েছে যে একজন মধ্যবিত্ত বাঙালী মা কোনও প্রতিক্রিয়া ছাড়াই এই ঘটনাটা মেনে নেবেন (যতই ছেলের উপর বিশ্বাস থাকুক না কেন)? তবে মোটের উপর দেখে ভালই লাগবে।

এক সমান্তরাল যাপনের গল্প

ধারাস্নান
dharasnan-still

পরিচালক: হরনাথ চক্রবর্তী
অভিনয়: ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, কাঞ্চন মল্লিক, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, সাহেব চট্যোপাধ্যায়

পাশাপাশি চলতে থাকে কিন্তু মেলে না— এমনই এক সমান্তরাল যাপনের ইতিকথা ‘ধারাস্নান’। উল্লাস মল্লিকের কাহিনিকে ফ্রেমে ধরেছেন পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী। বর্তমান থেকে অতীতের ফ্ল্যাশব্যাকে এ ছবি ফিরে ফিরে আসে। তমসা (ঋতুপর্ণা) এ কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র, যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় ছবির গল্প। তমসা নামটির মতোই তমসার জীবনও তমসাময়। ছবির শুরু হয় এক বৃষ্টিভেজা রাতে। অবিরত ধারাস্নানের সেই রাতে স্কুটি চালিয়ে ফেরার পথে তমসার সঙ্গে অভব্যতা করতে যায় এক মাতাল পথচারী। যথাযোগ্য জবাব দেয় তমসা। এহেন স্মার্ট, প্রতিবাদী তমসার অতীত এক তিক্ত স্মৃতি বহন করে চলে। এমনই এক বৃষ্টিস্নাত রাতে গণধর্ষিতা হয় সে। তারপর আদ্যন্ত গোবেচারা, পঙ্গু শান্তশীলের (কাঞ্চন) সঙ্গে নামমাত্র বিবাহ, অসুখী দাম্পত্য তমসার যাপনকে বদলে দেয়। একাধিক পুরুষসঙ্গ ক্রমে তার অভ্যেস হয়ে ওঠে। সিঁড়ি হিসেবে কখনও সে ব্যবহার করে হরবাবু (বিশ্বজিৎ), ডাক্তারবাবু (রাজেশ শর্মা), কিংবা রাতুল হালদারকে (সাহেব)। একদিকে যখন এই বহুগামিতা, তখন অন্যদিকে ছবিতে সমান্তরালভাবে উঠে আসে ভূমিকার (দিশা গঙ্গোপাধ্যায়) আপোষহীনতার আদর্শ। ঐতিহ্য, সংস্কার ও দেশপ্রেমের মধ্যে দিয়ে ছবিতে ভূমিকা এক অনমনীয় ঋজুতা রেখে যায় তার যাপনে। ঠিক যেন তমসার বিপরীত বিন্দুতে অবস্থান ভূমিকার। কাহিনির শেষে কী হল তা তোলা থাক পরদা জন্যই। ঋতুপর্ণা এই বহুমাত্রিক নেগেটিভ শেড্‌স-এর চরিত্রটি অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। চিরাচরিত কমেডির বাইরে গিয়ে স্বামী শান্তশীলের চরিত্রে অনবদ্য কাঞ্চন মল্লিক। বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, রাজেশ শর্মা, সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহেব চট্টোপাধ্যায় প্রত্যেকেই নিজের চরিত্র রূপায়ণে যথাযথ। আলাদা করে বলতে হয় দিশা গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা, ভূমিকা চরিত্রে তাঁর প্রতিস্পর্ধী অভিনয় স্মরণীয়। সিনেমার প্রথম সিকোয়েন্স বৃষ্টিস্নাত রাতে, শেষেও ক্যামেরা ফ্রিজ় হয় বৃষ্টির ধারাপাতে—‘ধারাস্নান’-এর একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় যেন। এছবির চিত্রনাট্য মেদহীন। হরবাবু চরিত্রের কমিক রিলিফ সিরিয়াস মুহূর্তের মাঝে খানিক রসসঞ্চার করে। তবে স্বাধীনতার ফ্ল্যাশব্যাকের মুহূর্তটি নস্ট্যালজিয়ার বদলে হাস্যোদ্রেক ঘটায় নির্মাণের লঘুতার কারণে। এ ছবির সঙ্গীত ও বিশেষত আবহ নির্মাণে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। ‘বন্দে মাতরম’ আবহ সত্যিই দর্শকমনে অনুরণন সৃষ্টি করে।

এ এক চিরন্তন লড়াই

আলিফা
alifa-still

পরিচালক: দীপ চৌধুরী
অভিনয়: বাহারুল ইসলাম, জয়া শীল ঘোষ, পাকিজা হসমী, রায়ান আবদুল, প্রসূন গায়েন

আমরা সকালে ঘুম থেকে উঠি, কাজ করি, খাই-দাই, আবার ঘুমিয়ে পড়ি। খুব কঠিন কাজ কি? বিশ্বাস করুন খুব কঠিন। আমার-আপনার কাছে এটা যতটাই সহজ, পৃথিবীর কিছু মানুষের কাছে এটা বড্ড কঠিন। তাদের জীবনে নদী গ্রাস করে ভিটে, জঙ্গল ক্রমাগত চোখ রাঙায়। সমাজ প্রতি মুহূর্তে নিচের দিকে ঠেলতে থাকে। সম্পর্কে ওঠে বিষাক্ত হাওয়া। আলি তাঁর পরিবার নিয়ে বাসা বাঁধে শহরের থেকে দূরে পাহাড়ের মাথায় জঙ্গলে (ছবি বলছে আসামের কোনও এক পাহাড়। যেখান থেকে শহর পৌনে এক ঘণ্টার দূরত্ব)। নিকোনো উঠোন, বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে ঘেরা লঙ্কার বাগানের পাশে ছোট্ট ঘরে তাঁদের বাস। উঠোনের সামনে উদোম দৃষ্টিপটে ধরা পড়ে দূরে শহরের দৃশ্য। বিলাসীদের মনে হতেই পারে, এমন জায়গায় তো রিসর্ট হতে পারত। যেখানে টাকার বিনিময়ে গ্রাম্য জীবনের স্বাদ পাওয়া যাবে। অস্থায়ী বাঁশের ঘরের মাথা থেকে চুঁইয়ে বৃষ্টির জল পড়ায় থাকবে রোমান্সের ছোঁয়া। উঠোনে নিজ হাতে রান্না করায় থাকবে সুখী জীবনে এক টুকরো ব্যস্ত থাকার ভান। আর বৃষ্টিভেজা পাহাড়ের সৌন্দর্য নেওয়া যাবে ভরপুর। কাট! জীবনটা মোটেও যে, রিসর্টপ্রেমীদের আহ্লাদের জায়গা নয়, তা বোঝা যায় জঙ্গলে লেপার্ডের আগমনে। এক লহমায় বেআইনিভাবে জঙ্গলে বাসা বাধা মানুষগুলোর ঘুম কেড়ে নেয় সে। আলিও যে ঘুম হারানোর দলে। তবে কাজ হারানো আলির সমস্যা আরও গভীর। ফরেস্ট গার্ডকে ক্রমাগত ঘুষ দেওয়া, মেয়ে আলিফা আর ছেলে ফয়জ়লকে স্কুলে পড়ানোর ইচ্ছে, ব্যভিচারিণী স্ত্রী ফতিমার জীবনযাত্রা, তাঁকে পাগল করে তোলে। শহর কী করে এমন মানুষের সঙ্গে? তাঁকে কখনও খালি হাতে ফেরায়, কখনও সামান্য টাকার বিনিময়ে মনুষ্যতর জীবের পর্যায়ে ফেলে দেয়। এদিকে বাচ্চা মেয়ে আলিফা স্বপ্ন দেখে পড়াশোনা করার, পাহাড় থেকে শহর যাওয়ার। নিজের মনের মধ্যে ‘আব্বু’ আর ‘আম্মি’র সম্পর্কের পরিবর্তনের ছবি এঁকে চলে। সেই ছবি প্রথমে রঙিন পরে ধূসর হয়ে যায়। নিশ্চুপ আলিফা স্কুল যাওয়ার ইচ্ছেটা বড় হতে শুরু করে। কিন্তু স্কুল শুরু হওয়ার আগেই যে লেপার্ডরূপী মৃত্যু তাকে কাছে নেয়। আলিফা চলে যায়। কিন্তু তার চলে যাওয়ার জন্য দায়ী কে? ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নাকি দুর্নীতিগ্রস্থ পরিবেশ। মানুষ গ্রাম থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে শহর, কিন্তু শহর কত বইবে? শহর তাদের আবার প্রকৃতির কাছে ঠেলে দিচ্ছে, প্রকৃতির সন্তানরাও জায়গা ছাড়তে নারাজ। ফলে লড়াই শেষ হওয়ার নয়। ফতিমার চরিত্রে জয়ার অভিনয় স্বাভাবিক। কোথাও অতিনাটকীয় নেই। তাঁকে দেখে মনে হয়, জন্মজন্মান্তর তিনি ওই পাহাড়েই সংসার পেতে আছেন। স্থানীয় টানে সংলাপও বলেছেন ভাল। যদিও মাঝে এক ঝলক চলতি বাংলা দুধের মধ্যে চোনার কাজ করেছে। আলির ভূমিকায় বাহারুল একটু অতি অভিনয় করেছেন। তবে আলি চরিত্রটি ভারী সুন্দর। ওই পিছিয়ে পড়া সমাজে এমন মানুষই তো দরকার। তাহলেই খেটে খাওয়া মেয়েরা ঘর বাধার স্বপ্ন দেখতে পারবে, উন্নত হতে পারবে। আলিফার চরিত্রে পাকিজা এবং ফয়জ়লের চরিত্রে রায়ান ভাল। বড্ড মাটির কাছাকাছি তারা। এমনটাই হওয়ার ছিল। দৃশ্যায়ন দারুণ। স্বাভাবিকতায় একটুও আঁচড় পড়ে না। পরিচালক যত্ন নিয়ে দৃশ্য সাজিয়েছেন। সংলাপ বেধেছেন। গল্পটিকে সারল্যের সাহায্যে উপস্থাপনা করেছেন। একবারও মনে হয় না সিনেমা দেখছি। ভাবতে বাধ্য করেছেন সমাজের এই প্রান্তিক মানুষগুলোকে নিয়ে। আমরা বাঘের আক্রমণে মৃত মানুষের খবর পাই কিন্তু তার পিছনের গল্প জানতে পারি না। সেই গল্পই শুনিয়েছেন তিনি। বুঝিয়েছেন, আমরা, সমাজের অন্যান্য স্তরের মানুষরা পাশে থাকার ভান করি মাত্র, লড়াই তারাই লড়ে। তাই একদিকে লজ্জা পেলেও, গর্বও হয় মানুষের উপর, তাদের লড়াইয়ের উপর। এবার থেকে পাহাড় গেলে, জঙ্গলে গেলে বাঁশের অস্থায়ী ঘর দেখে ভাবব বইকী। হয়তো আলিদেরও খুঁজব। কিন্তু তারপর…

পয়সা উসুল

বাগী ২
baaghi2-still

পরিচালক: আহমেদ খান
অভিনয়: টাইগার শ্রফ, দিশা পটানী, মনোজ বাজপেয়ী, রণদীপ হুডা, প্রতীক বব্বর

মস্তিষ্ক, যুক্তি, কমন সেন্স… এগুলো বাইরে রেখে আপনি যদি প্রেক্ষাগৃহে ঢোকেন, তা হলে এই ছবি দেখে ভরপুর আনন্দ পাবেন। পয়সা উসুল যাকে বলে আর কী! ‘বাগী’-তে নিজের অ্যাকশন সিকোয়েন্স, ডান্স ও ফিজ়িকের মাধ্যমে টাইগার শ্রফ দর্শকের মন জয় করে নিয়েছিলেন। ‘বাগী’র সিকোয়েল ‘বাগী ২’-তে, টাইগারকে দেখে সেই আনন্দ ডবল হতে বাধ্য। ছবির গল্পে সেনা অফিসার রণবীর প্রতাপ সিংহ ওরফে রকি (টাইগার) তার প্রাক্তন প্রেমিকা নেহার (দিশা) ডাকে কাশ্মীর থেকে গোয়া ফিরে আসে। চারবছর আগে নেহার সঙ্গে রকির ব্রেকআপ হয়ে যায়। নেহা বর্তমানে বিবাহিত এবং এক কন্যার মা। মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার পথে দু’জন মুখোশধারী ব্যক্তি নেহার গাড়ি আক্রমণ করে এবং তার মেয়েকে অপহরণ করে। মেয়েকে খুঁজে বের করার জন্যই রকিকে ডেকে পাঠায় নেহা। কিন্তু একটা সময়ের পর রকি জানতে পারে, আদতে নেহার নাকি কোনও মেয়েই নেই! তা হলে কি নেহা মিথ্যে বলছে? নাকি… ছবিতে একটা সাসপেন্স এলিমেন্ট রয়েছে, যা প্রথম অর্ধটিকে বেশ টানটান রেখেছে। এই ছবির ইউএসপি অবশ্যই অ্যাকশন। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে পরিচালক আহমেদ খান ছবিতে রোম্যান্স কিংবা কমেডির পিছনে বেশি সময় নষ্ট করেননি। তাই হার্ডকোর অ্যাকশন ছবি যাঁরা ভালবাসেন তাঁরা নিরাশ হবেন না। তবে টাইগার শ্রফকে বেশি স্ক্রিন স্পেস দিতে গিয়ে ছবিতে মনোজ বাজপেয়ী, রণদীপ হুডার মতো প্রতিভাদের নষ্ট করা হয়েছে। তা-ও যতুটু সময় পেয়েছেন সেইটুকুতেই তুখোড় অভিনয় করেছেন মনোজ ও রণদীপ। নেহার মাদকাসক্ত দেবরের চরিত্রে প্রতীক বব্বরকে দারুণ মানিয়েছে। তাঁর অভিনয় ও শরীরীভাষা দুরন্ত। এবার আসা যাক ছবির প্রধান দুই অভিনেতার প্রসঙ্গে। দিশাকে দেখতে মিষ্টি লাগলেও তাঁর অভিনয়ে প্রচুর জড়তা রয়েছে। ভয় পাওয়ার দৃশ্যেও তাঁর মুখের যা অভিব্যক্তি, রোম্যান্সের ক্ষেত্রেও তাই। কোনও পার্থক্য নেই। তবে টাইগার যে ইন্ডাস্ট্রির লম্বা রেসের ঘোড়া হতে চলেছেন তা এই ছবি প্রমাণ করে। তাঁর ফিজ়িক ও অ্যাকশন স্টান্ট অতুলনীয়। তবে ইন্টারভ্যালের আগে অবধি সাসপেন্স ধরে রাখলেও ক্লাইম্যাক্সে সেই পাঞ্চ নেই। ছবির অধিকাংশ গানই পুরনো গানের রিমেক হলেও শুনতে ভাল লাগে। আতিফ আসলামের গলায় ‘ও সাথি’ গানটি বেশ ভাল। তবে ‘এক দো তিন’ গানটির রিমেক পরদায় দেখতে একেবারেই ভাল লাগে না। এই গানে জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজ়কে দেখতেও বেমানান লাগে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় এই ছবির অ্যাকশন। এর অ্যাকশন দৃশ্য দেখে যতই ‘র‌্যাম্বো’র কথা মনে পড়ুক না কেন, পরদায় টাইগারকে দেখে হলভর্তি দর্শকের সিটি ও হাততালি বুঝিয়ে দেয়, টাইগার ইজ় হিট!

ঘরের কাছাকাছি

ঘরে অ্যান্ড বাইরে
Ghore-and-Baire-still

পরিচালক: মৈনাক ভৌমিক
অভিনয়: কোয়েল মল্লিক, যিশু সেনগুপ্ত, অপরাজিতা আঢ্য, বিশ্বনাথ বসু, জয় সেনগুপ্ত

বন্ধুত্ব আর প্রেম… বিষয়টা জটিল। একটি ছেলে আর মেয়ের একসঙ্গে বড় হওয়া, বন্ধুত্বর প্রেমে পরিণত হওয়া, জটিলতার মধ্যে দিয়ে শেষে… ওই শেষটুকুই শুধু প্রশ্নের। হয় মিলন হবে, না হয় হবে না। বাকিটুকু তো বেশ চেনা আমাদের, তাই না? ওই ‘চেনা’ জিনিসটাই মৈনাক ভৌমিকের এই ছবির ইউএসপি। পরিচিত বলেই, মনের কাছাকাছি ধরা দেয় ছবিটি। ছবির দুই বন্ধু, অমিত (যিশু) আর লাবণ্যর (কোয়েল) মধ্যে জমা হয়েছে অনেকটা অভিমান। চার বছর ধরে দু’জনের বাক্যালাপই নেই। অমিত কলকাতাতেই থাকে না। কিন্তু কেন? এরই মধ্যে হঠাৎ খবর, লাবণ্যর বিয়ে ঠিক হচ্ছে। কাজের ছুতোয় মুম্বই থেকে কলকাতা চলে আসে অমিত। তারপর আস্তে-আস্তে মান-অভিমান, বিয়ের জন্য দেখাশোনা ইত্যাদি ধরে গল্প এগোতে থাকে। চেনা ছকের ছবিটি একেবারে শুরুর মুহূর্ত থেকে একটা স্মার্ট টোন ধরে ফেলে। শুরুর অ্যানিমেশন হোক বা বর্তমানে রং, সর্বত্রই সেই আধুনিক স্মার্টনেসটা স্পষ্ট। আর এই স্মার্টনেসে তাল মিলিয়েছে যিশু ও কোয়েলের কেমিস্ট্রি। বহুদিন পর তাঁরা পরদায় একসঙ্গে, কিন্তু তাঁদের অভিনয়ে এখন অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। ডাকাবুকো লাবণ্য চরিত্রটি পাশের বাড়ির মেয়ে। কোয়েলকে দেখিয়েছেও চমৎকার। গ্ল্যামার, নেক্সট ডোর আর এলিগ্যান্সের এই মিশেল দুষ্প্রাপ্য বললেও কম বলা হয়। অমিতের চরিত্রে যিশু অত্যন্ত সাবলীল। বাস্তবিক, ছবিটির কেন্দ্রবিন্দুই যিশুর অভিনয়। বন্ধুত্ব, ছেলেবেলা, নস্ট্যালজিয়া, অনেকগুলি সুর ধরে ছবিটি। লাবণ্যর বাবা-মা, অমিতের মা, অমিতের বন্ধু বন্টো… সব ক’টি চরিত্রেই অভিনেতারা খুব ভাল। জয় সেনগুপ্ত অভিনীত এনআরআই পাত্র স্যামের চরিত্রটিও বেশ চেনা, কিন্তু তাতে টাইপকাস্টের ছাপ স্পষ্ট। স্টিরিয়োটাইপ সম্ভবত এ ছবির একমাত্র সমস্যা যে কারণে কমেডি অনেক জায়গাতেই বেশ স্থূল এবং অস্বাভাবিক। এটার প্রয়োজন ছিল না। প্রয়োজন ছিল না ব্যোমকেশ বা কাকাবাবুর স্পুফ। এতে ছবির স্বাভাবিক চলন ধাক্কা খেয়েছে। যার ফলে ছবির প্রথম অর্ধ একটু আধখ্যাঁচড়া। ছবির সঙ্গে ‘মেরা পেয়ারি বিন্দু’র কিছু মিল কেউ-কেউ পেতে পারেন। তবে, আগেই বলেছি, এ ছবি ‘চেনা’ বলেই কাছের। ছবির গানে অনুপম রায়, লগ্নজিতা, স্যাভির ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর… সব মিলিয়ে জমে গিয়েছে। ছবির ক্লাইম্যাক্স একটু অবাস্তব লাগতে পারে, একটু অসম্ভব মনে হতে পারে বাড়ি বিক্রি, রাতারাতি পাব তৈরি, অতগুলি টাকার কাহিনিগুলি। কিন্তু এ অবাস্তবতার স্বপ্নই তো মানুষ দেখে। বাস্তবে তো না বলা প্রেম, চোখের জল, অমিত আর লাবণ্যর দূরে থেকেও কাছে থাকার ‘শেষের কবিতা’-রা বাস করে। মৈনাক ভৌমিকের ‘রূপকথা রম-কম’-এ বরং এই রংগুলিই থাক।