Category Archives: review detail

মিষ্টি ছবি, বড্ড বাস্তবও…

তুমহারি সুলু
tumari-sulu-still

অভিনয়: বিদ্যা বালন, মানব কল, নেহা ধুপিয়া, বিজয় মৌর্য
পরিচালনা: সুরেশ ত্রিবেণী
……

বিদ্যা প্রমাণ করলেন, তিনি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, তিনি অপ্রতিরোধ্য, তিনি অভিনয় বিষয়টিকে গুলে খেয়েছেন। পাঠক আপনি নিশ্চয় বিদ্যার প্রতি আমার এই বাঁধনছাড়া আবেগে খানিকটা বিরক্তই হয়েছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ‘তুমহারি সুলু’ দেখে আসার পর আপনারও ঠিক আমার মতোই হাল হবে। পুরো ছবি জুড়ে বিদ্যা বালন, এবং তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন ভাল গল্প পেলে বিদ্যা কী করতে পারেন। মুম্বইয়ের শহরতলিতে সুলুর (বিদ্যা) স্বামী আর পুত্রকে নিয়ে সংসার। স্বামী অশোক (মানব) ভারী ভালমানুষ, সুলুর সব পাগলামি, সব কাজেই সাপোর্ট সিস্টেম তিনি। ছেলে প্রণবও মিষ্টি ছেলে। সুলুর কাজ হল রেডিয়োর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এবং জেতা। এমনভাবেই একটি প্রতিযোগিতায় প্রেশারকুকার জিতে রেডিয়ো অফিসে যায় পুরস্কার আনতে। সেখানেই গিয়েই দেখে চ্যানেলটি আর জে নেওয়ার বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। ব্যস সুলুর মাথায় আইডিয়া দানা বাধে। সেও হবে আরজে। চ্যানেল হেড মারিয়ারও (নেহা ধুপিয়া) মনে হয় সুলু কিছু করতে পারবে। লেট নাইট শোয়ের আরজে হয় সুলু। তারপরেই ঝামেলা শুরু হয়। সাপোর্টিভ হাজ়ব্যান্ড অশোক কোথাও গিয়ে ইনসিকিয়োরিটিতে ভুগতে থাকে। পরিবারের বাকিরা (সুলুর দুই দিদি ব্যাঙ্কে চাকরি করলেও, সুলুর চাকরিটিকে ঠিক ভদ্র বলে মনে করতে পারে না) চাকরি ছাড়ার জন্য চাপ দিতে থাকে সুলুকে। তাহলে সুলু কি চাকরি ছেড়ে দিয়ে আবার সংসারে মন দেবে? বিদ্যা একদিকে স্ট্রিট স্মার্ট হাউজ়ওয়াইফ অন্যদিকে আর জে দুনিয়ায় বেমানান ‘শাড়ি পরা আন্টি’, দুই ভূমিকায় জাস্ট ফাটিয়ে দিয়েছেন। সকালে স্বামী আর পুত্রের জন্য টিফিন প্যাক করার সঙ্গে-সঙ্গে মধ্যরাতে রেডিয়োর ওপারে ‘সেক্সি’ গলায় পুরো মুম্বই কাঁপানো, এমন চরিত্র বিদ্যাকেই মানায়। কিন্তু কোথায় গিয়ে গল্প খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ে (অস্বীকার করার উপায় নেই, যেখানেই গল্প দুর্বল, সেখানে কুম্ভের মতো লড়ে আবার গল্পকে ট্র্যাকে নিয়ে এসেছেন বিদ্যা)। যেমন বোঝা যায় না, প্রণব হঠাৎ করে কেন খারাপ হয়ে যায়? বোঝা যায় না অশোকের মেল ইগোর কারণটা? তবে অশোকের ভূমিকায় মানবও বেশ ভাল। বিদ্যার পার্টনার হিসেবে তিনি অনবদ্য। ছোট্ট ভূমিকায় নেহা এবং বিজয়কে ভাল লাগে। ছবির গানও ভাল। দ্বিতীয়ার্ধে গল্প খানিকটা গতি হারায়। কিছু প্রশ্নর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে বিদ্যা থাকতে ভয় কি? অতএব মধ্যবিত্ত সমাজকে দেখতে চাইলে, আজকের দিনে মেয়েরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, মেয়েরা ঠিক কী চাইছে, সেটা জানতে হলে বিদ্যার ‘সুলু’কে দেখতেই হবে। আর হ্যাঁ নবাগত পরিচালক হিসেবে সুরেশ ত্রিবেণী গ্রেসমার্কস পাবেন।

সিঙ্গল হলে ভাল লাগবে, না হলেও…

করীব করীব সিঙ্গল
qareeb-qareeb-single-still

অভিনয়: ইরফান খান, পার্বতী
পরিচালনা: তনুজা চন্দ্র
……

আধুনিক তরুণ-তরুণীর প্রেমে যে বেপরোয়া ভাবটি থাকে, তা বরাবর সিনেমার উপজীব্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু পঁয়ত্রিশ পেরিয়ে মিড লাইফ ক্রাইসিসও যে ছেলেমানুষির জন্ম দিতে পারে, তা বেশ সুন্দরভাবে দেখিয়ে দিল ‘করীব করীব সিঙ্গল’ ছবিটি। অনলাইন ডেটিং সাইট থেকে প্রথম দেখা হয় জয়া (পার্বতী) এবং যোগীর (ইরফান)। আর তারপর ভাললাগা-মন্দলাগার যাত্রা শুরু হয় মুম্বই থেকে, শেষ হয় গ্যাংটকে। মাঝে উপলব্ধির মতো দেরাদুন, দিল্লি, জয়পুর পড়ে থাকে। প্রথমেই বলে দিই, গন্তব্যে কোনও ‘টুইস্ট’ নেই। কিন্তু খানাখন্দে ভরা রাস্তার যাত্রাটি বড়ই সুন্দর! সাধারণত বলিউড আজকাল বেশি বয়সের প্রেমকাহিনিকে ‘ম্যাচিয়োর’ লভ স্টোরি বলে থাকে। কিন্তু যে কারণে এবং যেভাবে জয়া আর যোগী (দ্বিতীয় সাক্ষাতেই) ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তা হাসির খোরাক হতেই পারে। দু’টি চরিত্রকেই খুব যত্ন নিয়ে তৈরি করেছেন পরিচালিকা তনুজা চন্দ্র।

জয়া বিধবা, স্বামীর সত্তা থেকে বেরতেই পারে না। একাকিত্বে ভোগে, তাই বন্ধুরা কখনও বেবিসিটার, কখনও ‘স্টেপনি’ হিসেবে ব্যবহার করছে জেনেও কাউকে চটাতে চায় না। বন্ধু ‘টিন্ডার’ থেকে জীবনসঙ্গী খুঁজে পেয়েছে শুনে ডেটিং সাইটে অ্যাকাউন্ট খোলে ঠিকই, কিন্তু নিজের সম্পর্কে সব সত্যি লিখতে ভয় পায়। নিরাপত্তাহীনতা, শরীরের ছুঁৎমার্গ… জীবনটাকে উপভোগ করা সে ভুলেই গিয়েছে। আর জয়ার সেই নিরাপত্তাহীনতা অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মলয়ালম অভিনেত্রী পার্বতী। ম্যানিকিনের মতো ছিপছিপে ফিগার, ডিজ়াইনার পোশাকে চোখ ধাঁধানোর মতো নায়িকাদের মধ্যে পার্বতী সত্যিই অন্যরকম। বুদ্ধিদীপ্ত এই সুন্দরী এতটাই সাবলীল অভিনয় করেছেন যে, এক-এক সময় মনে হতে পারে, তাঁকে মাথায় রেখেই জয়াকে ঢেলে সাজিয়েছেন পরিচালক। অন্যদিকে রয়েছে যোগী, যার রংচঙে পোশাক এবং বাচনভঙ্গী দেখলে জয়ার মতো যে-কোনও মেয়েরই গুন্ডা-বদমাইশ মনে হওয়া স্বাভাবিক। যোগীকে দেখলে মনে হতেই পারে, এই মানুষটা কিছুতেই অতীতের বোঝা বয়ে বেড়াতে পারে না। কিন্তু জয়ার মতো সে-ও অতীত থেকে বেরতে পারে না। শুধু বাউন্ডুলে সেজে নিরাপত্তাহীনতাকে ঢেকে রাখতে পারে। আর এরকম চরিত্রে যে ইরফান খানকে ‘অভিনয়’ করতে হয় না! সেন্স অফ হিউমর, নিজের সিগনেচার বাচনভঙ্গী, অগোছাল চেহারায় তিনিই হয়ে উঠেছেন যোগী।

এরকম ছবিতে গতি একটি নির্ধারক। অনলাইন সম্পর্ক অফলাইনে জমতে যতটা সময় প্রয়োজন, সেটা দেওয়া হয়েছে জয়া ও যোগীকে। কিন্তু এই ছবিটি ‘জার্নি’ মুভিও বটে। অতএব গতি ধীর হলে ছবিটি অচিরেই মাটি হয়ে যেত। গানের ব্যবহার ছবিটির কোনও ক্ষতি করেনি বরং সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। বিশেষত পাপনের ‘তু চলে তো’ গানটি বেশ সিক্সটিজ়ের গান মনে করিয়ে দেয়।

মাঝেমধ্যে ক্যামেরা ক্লোজ় শটে অভিনেতাদের ধরেছে, যেখানে অভিনেতারা ক্যামেরার দিকে সোজা তাকিয়ে নানা এক্সপেশন দিয়েছেন বেশ অনেকক্ষণ ধরে। সেই জ়ুম শটগুলো বেশ বিরক্তিকর। কেন এত টাইট স্ক্রিপ্ট আর শক্তিশালী অভিনেতাদের উপর ভরসা রাখতে পারলেন না ডিরেক্টর? দু’-একটি দৃশ্যে ইরফান ও পার্বতীর দীর্ঘ সংলাপও খানিকটা বেমানান ঠেকেছে। কিন্তু গোটা ছবিতে এবং প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরনোর পরও দর্শকের মুখে হাসি লেগে থাকবে, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ডেটিং সাইট থেকে যে শুধু কামগন্ধযুক্ত সম্পর্ক খোঁজে সকলে, কেউ যে শরীরের বাইরে গিয়ে মনে ডুব দেয় না, সেই মিথটা ভাঙার জন্যও পরিচালিকাকে ধন্যবাদ।

ডুব দিয়ে মন…

ডুব
doob-still

অভিনয়: ইরফান খান, পার্নো মিত্র, নুসরত ইমরোস তৃষা, রোকেয়া প্রাচী
পরিচালনা: মোস্তাফা সরওয়ার ফারুকি
……

কথাটা কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে, ‘ডুব’-এর ‘জাভেদ হাসান’ চরিত্রটি নাকি লেখক হুমায়ুদ আহমেদকে মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। এবং হুমায়ুনের জীবনের ঝলক পাওয়া যাচ্ছে জাভেদের জীবনে। না, আমাদের কোনওরকম বিতর্কে ঢোকার ইচ্ছে নেই। আমাদের উদ্দেশ্য ছবিটির বিশ্লেষণ এবং গল্পটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া। বাংলাদেশের চিত্র পরিচালক জাভেদ হাসান সাহেব (ইরফান খান) দুই সন্তান (একটি মেয়ে এবং একটি ছেলে) এবং স্ত্রীকে নিয়ে সুখে জীবনযাপন করছিলেন। হঠাৎ-ই খবরকাগজের শিরোনামে উঠে আসে জাভেদ সাহেব নাকি মেয়ে সাবেরির (নুসরত ইমরোস তৃষা) সহপাঠিনী নিতুর (পার্নো মিত্র) সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। জাভেদ এই সম্পর্ক স্বীকার করতে চাননি। তারপর খানিকটা স্ত্রীর মায়ার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার কারণে এবং খানিকটা নিতুর নাছোড় মনোভাবের কাছে হার মেনে, পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তিনি। নিতুর সঙ্গে ঘর বাধেন। সিনেমা শেষ হয় জাভেদের মৃত্যুর মাধ্যমে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন অধরাই থেকে যায়। যেমন, পরিচালক পুরো ছবিটায় কী দেখাতে চেয়েছেন? দুই সহপাঠিনীর মধ্যে প্রতিযোগিতা? যদি তাই হয়, তাহলে সেই প্রতিযোগিতা নিয়ে একপক্ষ কেন সরব হল? কেনই বা প্রতিযোগিতা শুরু হল, তা বোঝা গেল না। যেমন বোঝা গেল না, জাভেদ ঠিক কী চাইছেন? দীর্ঘ বিবাহিত জীবন কাটানোর ফলে তাঁর এবং স্ত্রী মায়ার (রোকেয়া) সম্পর্কে শীতলতা এসেছিল, এটা সত্যি, কিন্তু তিনি তো সেটা কাটাতেই চাইছিলেন, হঠাৎ করে হাল ছেড়ে দিলেন কেন? স্ত্রীর দিক থেকেও কোনও ইতিবাচক সাড়া কেন মিলল না? এমনকী, সুখী পরিবারের চিহ্ন হিসেবে দেওয়ালে ঝোলানো ছবিগুলিতে কোথাও মায়া এবং জাভেদের, দু’জনের ছবি খুঁজে পেলাম না। তাহলে কি প্রেম অনেকদিন আগেই তাঁদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল? তাহলে নিতু আর সাবেরির প্রতিযোগিতাটা এখানে মিথ্যে হয়ে যায়। কারণ, নিতু না থাকলেও হয়তো সংসারটা ভাঙতই। জাভেদের সন্তানদের কাছে পাওয়ার আকুতি চোখে পড়ে, কিন্তু সিনেমা জুড়ে স্ত্রীর প্রতি সামান্য দুর্বলতাও চোখে পড়ে না। ইরফানের অভিনয় নিয়ে কথা বলা উচিত হবে না। প্রতিবারের মতোই তিনি এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। কিন্তু তাঁর বাংলা উচ্চারণ বড্ড কানে লাগে। ওপার বাংলার টান তো দূরের কথা এপার বাংলার কথ্যভাষাতেও হিন্দির টান স্পষ্ট (জানিয়ে রাখি, বাংলাদেশে বাংলা কথার একটা আলাদা টান পাওয়া যায়। যা পশ্চিমবঙ্গে থাকে না। ইরফানের কথায় সেই টান উধাও)। বাকি সংলাপ ইংলিশে বলে কুল রক্ষা করেছেন তিনি। পার্নোর যতটুকু দায়িত্ব ছিল, তিনি তা পালন করেছেন। নুসরতের অভিনয় বেশ ভাল। কিছু-কিছু দৃশ্যে অনবদ্য (জাভেদকে জলের গ্লাস এগিয়ে দেওয়ার সময় তাঁর মুখের অভিব্যক্তি) তিনি। বরং রোকেয়া বড্ড কাঠ-কাঠ। তাঁর অভিনয় আরও পেলব এবং সাবলীল হওয়া দরকার ছিল। ফলে ইরফান এবং তাঁর দৃশ্যগুলি ভাল হওয়ার সব উপাদান মজুত থাকলেও হতে পারল না। সিনেমাটোগ্রাফি অসাধারণ। রিসর্টের দৃশ্যগুলি অনবদ্য (পরিচালককে আলাদা করে ধন্যবাদ, সুন্দর জায়গা দেখানোর জন্য। প্রতিটি অ্যাঙ্গেল প্রশংসনীয়। কিন্তু কখনও-কখনও এডিটিংয়ের দোষে ক্যামেরাও দুষ্ট হয়ে পড়েছে। কিছু দৃশ্য অকারণে দীর্ঘ। আর হ্যাঁ মেকআপের ব্যাপারে একটু যত্মশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল। যদিও অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না (এটা পরিচালকের দায়িত্ব)। তবে শেষ দৃশ্যটি ভাল লাগে। বিশেষত মৃত্যুর হাত ধরে স্ত্রী আর মেয়ের কাছে জাভেদের ফিরে আসাটা। তাহলে কি জাভেদ ফিরতেই চেয়েছিলেন? ডুব দিতে চেয়েছিলেন অতীতের সুখস্মৃতিতে?

থ্রিলার! তবে…

রুখ
rukh-still

অভিনয়: মনোজ বাজপেয়ী, আদর্শ গৌরব, স্মিতা তাম্বে
পরিচালনা: অতনু মুখোপাধ্যায়
……

সরল একটি হুডানইট থ্রিলার? ‘রুখ’ দেখতে শুরু করার পরে প্রাথমিকভাবে হয়তো আপনার এটা মনে হতেই পারে। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর দেখবেন, হুডানইউট ছাপিয়ে অন্বেষণটা যেন নিজের মধ্যেই হচ্ছে। আর সেই অন্বেষণ এবং কষ্টের লাঘবের পর যে নতুন সত্তাটা বের হবে, সেটাই যেন নতুন আপনি। বলতে বাধা নেই, এই উপাদানটিই ‘রুখ’কে আর পাঁচটি থ্রিলারের চেয়ে আলাদা করেছে। এই ছবি দিবাকরকে নিয়ে, একজন ব্যবসায়ী। গল্প শুরু হয়, পথ দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুর পর। তার ছেলে ধ্রুব তদন্ত শুরু করে। আস্তে আস্তে খুলতে থাকে চরিত্রদের মুখোশ। বলতে বাধা নেই, পরিচালক বেশ ভাল একটি স্ক্রিপ্ট উপহার দিয়েছেন দর্শকদের। হ্যাঁ, ভুলভ্রান্তি আছে। কিন্তু তা-ও বলা যায় ভাল। অভিনয়েও সকলে দারুণ। মনোজ বাজপেয়ীর কথা তো আলাদা করে বলার কিছু নেই। প্রতিটি চরিত্রকেই তিনি আপন করে নেন। আদর্শও ধ্রুবের চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য। ভাল লাগে স্মিতা তাম্বেকেও। কিছু কিছু সময় স্ক্রিপ্টের গতি একটু ধীর হয়ে যায়। ফলে দর্শকদের মনোযোগ ছিন্ন হতে পারে। একটি ভাল থ্রিলারের জন্য এই খামতি হয়তো ভিলেনের মতো কাজই করবে। কিন্তু বলতে বাধা নেই, যদি ধৈর্য নিয়ে থাকতে পারেন, এই ছবি আপনাকে অন্য এক ধরনের তৃপ্তি দেবেই।

বড়ই জটিল

ব্যোমকেশ ও অগ্নিবাণ
bomkesh-0-agniban-still

অভিনয়: যিশু সেনগুপ্ত, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, উষসী চক্রবর্তী, সুমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবদূত ঘোষ, অঞ্জন দত্ত
পরিচালনা: অঞ্জন দত্ত
……

সিনেমা সবে শেষ হয়েছে| হল থেকে সকলে বেরোচ্ছেন| তারমধ্যে এক পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলার কথা কানে এল, ‘দু’টো গল্পই আমার অনেকবার পড়া| তাও সিনেমাটা কিছুই বুঝলাম না| যারা গল্পগুলো পড়েনি তাদের কী হবে!’ সত্যি তো! এই ছবির ইউএসপি ছিল ‘অগ্নিবাণ’ ও ‘উপসংহার’, দু’টো গল্পকে মিলিয়ে একটা ছবিতে তুলে ধরা| আর এটাই হয়ে উঠল ছবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা| দু’টো গল্পকে মেলাতে গিয়ে পরিচালকমশাই পুরোটাই ছড়িয়ে ফেললেন| ফলে যাঁরা গল্পদু’টো পড়েছেন আর যাঁরা পড়েননি, সকলের কাছেই ছবির প্লট হয়ে ওঠে জটিল ও গোলমেলে| এছাড়া পুরো ছবিজুড়ে একটা অন্ধকারভাব যার কারণ বোঝা গেল না| তবে ছবিতে সকলের অভিনয় বেশ ভাল| বিশেষ করে ব্যোমকেশের চরিত্রে যিশুর অভিনয় ও শরীরী ভাষা অনবদ্য| তবে সিনেমাতে ক্যামেরার কাজ বেশ ভাল| এডিটিংও ভাল লাগে|

একটি বিপজ্জনক সফর

ককপিট
cockpit-গু

অভিনয়: দেব, কোয়েল, রুক্মিণী, প্রিয়ঙ্কা
পরিচালনা: কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়
……

বিমানসফরকে মোটামুটি নিরাপদ বলেই ধরি আমরা। কিন্তু হাওয়ায় বিপদ ঘটলে? ভাগ্য ও পাইলট ছাড়া কারও কিছু করার থাকে না! এ ছবির ফ্লাইটে আবার যাবতীয় বিপদ একসঙ্গে। প্লেন চালাচ্ছেন বিখ্যাত চালক দিব্যেন্দু রক্ষিত (দেব)। বাবা প্রয়াত বিমানচালক। বাড়িতে দিব্যেন্দুর স্ত্রী রিয়া চিন্তায়, কলকাতার আবহাওয়া ভাল না। মুম্বই থেকে প্লেন ঠিকমতো আসতে পারবে তো? বিমানে আবার দিব্যেন্দুর পুরনো বান্ধবী বিমানসেবিকা কৃতি তার শেষ ফ্লাইট নিচ্ছে। কিন্তু আকাশে ওড়ার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক বিপর্যয়। খারাপ আবহাওয়া, ইঞ্জিন বন্ধ, এয়ার প্রেশার কমে যাওয়া, জ্বালানি শেষ… এরই মধ্যে বিমানের বিভিন্ন যাত্রীর সঙ্গে আমরা পরিচিত হই। দিব্যেন্দু কি পারবেন এতগুলি মানুষের প্রাণ বাঁচাতে?

এমন একটি বিষয় নিয়ে ছবি আগে বাংলায় হয়নি। ভাবেনওনি বিশেষ কেউ। সেদিক থেকে যথেষ্ট সাহস দেখিয়েছেন প্রযোজক দেব। অর্থব্যয়ের ব্যাপারেও কোনওরকম কার্পণ্য করেননি। মাঝ-আকাশে অভিনব প্রোমোশন প্ল্যান করেছেন। এমনটাও তো আগে কখনও হয়নি। শুধু তো এটুকুই নয়, বড় প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছেন তিনি। বড় প্রেক্ষাগৃহের চেনে তাঁর ছবির টাইমিং দেখিয়েও বদলে দেওয়া হয়েছে। এই কঠিন লড়াইয়েও দেব যা স্পিরিট দেখাচ্ছেন, তার জন্য তাঁকে কুর্নিশ। শুধু এটুকুর জন্যই ছবিটি একবার অন্তত দেখা যেতে পারে। তবে…

কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের খ্যাতি আছে যত্নশীল পরিচালক হিসেবে, সেই ছাপ টাইটেল কার্ডের গ্রাফিক্সেই স্পষ্ট। কিন্তু এ ছবিতে তাঁর আরও বেশি যত্নশীল হওয়া উচিত ছিল। একে তো বড্ড লম্বা ও বোরিং এই যাত্রা, বিশেষত প্রধম অর্ধে। বড় হঠাৎ-হঠাৎ সবকিছু যেন ঘটে যায়। কীভাবে যে প্লেন অর্ধেক সমস্যা থেকে মুক্তি পেল, বোঝা গেল না! দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য বেশ টানটান হয়ে ওঠে ছবি। কিন্তু পরিচালক থামতে না জানলে যা হয়, থ্রিলটা যেন কোথায় হারিয়ে যায়… অভিনয়ে দেব, কৃতির চরিত্রে রুক্মিণী, তার বন্ধুর চরিত্রে রোজ়া এবং দেবের স্ত্রীর চরিত্রে কোয়েল বেশ ভাল। একটু অতিনাটক মনে হলেও সবচেয়ে মানানসই লেগেছে রুক্মিণীকেই। পাইলট হিসেবে দেবকে মানিয়েছে চমৎকার। অরিন্দমের সংগীত মন্দ নয়, বিশেষত অরিজিৎ সিংহের কণ্ঠে গানটি দিব্যি। এয়ারপোর্ট কন্ট্রোল চিফের চরিত্রে শতাফ ফিগার এবং ছোট চরিত্রে প্রিয়ঙ্কা সরকার ও অম্বরীশ ভট্টাচার্য ছাপ রেখে গিয়েছেন। বিমানের রহস্যগুলির মতোই আর একটি প্রশ্ন, কৃতি ও স্ত্রী রিয়াকে প্রায় একই রকম দেখতে পেনডেন্ট কেন দেয় দিব্যেন্দু? শেষে কৃতি তা ফেরতই বা দেয় কেন? প্রেম ব্যর্থ হলে কি উপহার ফেরত দিতে হয়? শেষে বলার, এই ছবির সম্ভাবনা ছিল আরও। বিশেষত বিষয়বস্তু সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। পরিচালক যদি আর একটু যত্নবান হতেন…

খু-উ-ব মিষ্টি বিস্কুট!

প্রজাপতি বিস্কুট
projapati-big

অভিনয়: আদিত্য সেনগুপ্ত, ঈশা সাহা, সোনালী গুপ্ত, অপরাজিতা আঢ্য, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, রজত গঙ্গোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত প্রমুখ
পরিচালনা: অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়
……

অভিজাত সেনবাটীতে পাড়ার ছেলেরা কার্ত্তিক ঠাকুর ফেলে যাওয়ার পরই বাড়ির ছোটবউ শাওনের (ঈশা) মনে সন্তানলাভের ইচ্ছে হয়। কিন্তু স্বামী অন্তরের (আদিত্য) সঙ্গে তার সম্পর্কে সেই ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে না। তার কারণ অনেক। অন্তর ভুলতে পারে না পুরনো প্রেম, সম্বন্ধ করে বিয়ে করার পর বেশ অনেকদিন বেঙ্গালুরুতে চাকুরিরত থাকায় বউয়ের সঙ্গে তার দূরত্বও কম নয়, নিম্নমধ্যবিত্ত ছাপোষা ঘরের মেয়ে শাওনের পক্ষে সেনবাটীর আভিজাত্যের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না… মোটামুটি একগুচ্ছ সমস্যা তাদের দাম্পত্যে। এর মধ্যে শান্তির রাস্তা হিসেবে সন্তানকে পেতে চাইলেও সেটা শাওন-অন্তরের জীবনে নতুন ঝঞ্ঝাট হয়ে দাঁড়ায়। ইঙ্গবঙ্গ আরবান সিনেমার (বর্তমানে আরবান বাংলা ছবিতে অভিনেতারা ইংরেজিই বেশি বলেন কি না!) মাঝে ‘প্রজাপতি বিস্কুট’ বাঙালিয়ানার টাটকা বাতাস। ছবির প্রথম ফ্রেম থেকে শেষ ফ্রেম অবধি চরিত্রগুলো আদ্যন্ত বাঙালি। একটা ছিমছাম ছোটগল্পের মতো ছবিটির গতি। কিন্তু ছোটগল্পটির বক্তব্য খুব একটা পরিষ্কার নয়। যে মর্মে ছবিটি শুরু হয়েছিল, শেষ অবধি দেখা গেল, সারমর্ম একেবারে আলাদা! সেখানে ন্যারেটিভ একটু ধাক্কা খায়। কেন শাওন আর অন্তর অদ্ভুত ব্যবহার করতে থাকে, বোঝা যায় না। শাওনের চরিত্রের একটা সম্পূর্ণ অন্য দিক আবিষ্কৃত হয়, আপাত ক্যাবলা অন্তরের কনফিডেন্সও জেগে ওঠে। বোকা-বোকা, সবসময় সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা অন্তরের ভূমিকায় আদিত্য বেশ সপ্রতিভ। পেলব থেকে ‘রেবেল’ হয়ে ওঠা শাওনের ভূমিকায় ঈশাও চমৎকার। কিন্তু কিছু-কিছু জায়গায় বেশি নমনীয়তা দেখাতে গিয়ে অতিনাটকের সাহায্য নিয়েছেন তিনি। শাওনের মা-বাবার ভূমিকায় অপরাজিতা আঢ্য এবং শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় খুব ভাল। শাওনের ‘রাবীন্দ্রিক’ শাশুড়ির ভূমিকায় সোনালী গুপ্ত এবং সিরিয়ালপ্রিয় শ্বশুরের ভূমিকায় রজত গঙ্গোপাধ্যায়ও যথাযথ। আলাদা করে বলতে হয় অন্তরের রসিক বসের ভূমিকায় রজতাভ দত্তর কথা। তিনি কমিক রিলিফ এনেছেন ছবিতে কিন্তু তা কখনও বাড়াবাড়ি মনে হয় না। সবই ঠিক ছিল কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল অত্যধিক চিনির ব্যবহার। সব চরিত্রকে খুব ইনোসেন্ট এবং মিষ্টি দেখাতে গিয়ে বাস্তব থেকে খানিকটা সরে এসেছে ছবিটি। চরিত্রগুলো আর একটু এক্সপ্রেসিভ হলে হয়তো ছবিটি আরও বাস্তবসম্মত হতে পারত। ছবিতে গানের ব্যবহার বড্ড সুন্দর। বিশেষ প্রশংসার দাবিদার ‘আহা রে মন’ এবং ‘তোমাকে বুঝি না প্রিয়’ গান দু’টি। তবে উদ্দাম প্রেমের রমরমার যুগে একটি ভিন্নধর্মী প্রেম দেখতে মন্দ লাগে না। শুধু অন্তর এবং শাওনের সম্পর্কের টানাপড়েনগুলো একটু পরিষ্কার হলেও জমে যেত। ‘দারুণ’ হতে পারত, বদলে ‘বেশ মিষ্টি’ হয়ে রইল ‘প্রজাপতি বিস্কুট’।

কঙ্গনার জন্য হাঁড়িকাঠে…

সিমরন
simran-still

অভিনয়: কঙ্গনা রানাওয়াত, সোহম শাহ, হিতেনকুমার
পরিচালনা: হনসল মেহতা
……

পছন্দের অভিনেতাকে অনেকেই শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে থাকেন। ‘সিমরন’ ছবিটি দেখলে মনে হয়, এটি কঙ্গনা রানাওয়াতের প্রতি পরিচালক হনসল মেহতার শ্রদ্ধার্ঘ্য। একটু খোলসা করে বলি, এই ছবির প্রতিটি ফ্রেমের নির্মাণের একমাত্র উদ্দেশ্য যেন কঙ্গনার অভিনয়ক্ষমতা প্রদর্শন। অ্যাটলান্টানিবাসী গুজরাতি মেয়ে প্রফুল পটেল (কঙ্গনা) হিলটন হোটেলের হাউজ় কিপিং স্টাফ। তিরিশোর্ধ প্রফুল ডিভোর্সি (তার জন্য দিনরাত রক্ষণশীল মা-বাবার কাছ থেকে গঞ্জনাও কম জোটে না), নিষ্ঠা ভরে নিজের কাজ করে আর মাইনরিটি হাউজ়িংয়ে নিজের জন্য একটি আলাদা বাসস্থান কেনার পয়সা জমায়। কিন্তু জুয়া খেলায় নিজের সমস্ত সঞ্চয় হেরে নিজেই সেই স্বপ্নের শেষকৃত্য সারে সে। তেজারতির কারবারির কাছে গলা অবধি দেনায় ডোবা প্রফুল পাকেচক্রে চুরির রাস্তা নেয়। সন্দীপ কউর নামে এক নার্স, যার নামে কমপালসিভ রবারির অভিযোগ, এই প্রফুল চরিত্রটির অনুপ্রেরণা। কিন্তু দু’মাসে কী-কী অনন্য উপায়ে সন্দীপ ব্যাঙ্ক থেকে চুরি করেছিল, সেগুলো নিয়ে আর একটু রিসার্চ করলেও হয়তো ছবিটি আরও ইন্টারেস্টিং হত। কিন্তু এক্ষেত্রে, পরিচালক যেন দ্বিধায় ছিলেন যে, চরিত্রটিকে গ্লোরিফাই করবেন নাকি কটাক্ষ করবেন। এই ছবির স্ক্রিপ্ট অনেকটাই কঙ্গনার নিজের লেখা (যে কারণে স্ক্রিপ্ট রাইটার অপূর্ব আসরানির সঙ্গে কঙ্গনার বেজায় ঝামেলা। কারণ তিনি চাননি কো-রাইটার হিসেবে কঙ্গনার নাম উঠে আসুক। আর দু’জন স্ক্রিক্ট রাইটারের অন্তর্দ্বন্দ্বটাও স্ক্রিপ্টে স্পষ্ট। কারণ দু’টি অর্ধে ছবির বক্তব্য দু’রকম। একদিকে যেমন ছবিটি একটি সিরিয়াস বিষয়কে লঘুভাবে পরিবেশন করার চেষ্টা করে, অন্যদিকে প্রফুলকে ভিকটিম হিসেবে দেখানোর চেষ্টাও চলেছে নিরন্তর। আর খুব সামান্য কিছু স্মার্ট ডায়লগ বাদে বেশিরভাগ ডায়লগই বেশ গ্যাদগেদে। তবে ৯/১১-এর ওয়র্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের পর আমেরিকানদের সাউথ এশিয়ার লোক এবং নাশকতার প্রতি বোকা-বোকা ভীতিটিকে স্যাটায়ারের মোড়কে তুলে ধরার জন্য পরিচালককে বাহবা জানাতে হয়। কঙ্গনার অভিনয় নিয়ে নতুন করে আর কিছুই বলার নেই। কিন্তু এবার বোধহয় কঙ্গনার উচিত ‘কুইন’-এর ‘রানি’র চরিত্র থেকে বেরোনোর। প্রফুলের চরিত্রটি যেন ‘রানি’ এবং ব্যক্তি কঙ্গনার মিশেল। ‘রানি’র সারল্যও রয়েছে, আবার রয়েছে কঙ্গনার অফস্ক্রিন বোল্ডনেসও। কিন্তু ছবির প্রতিটি ফ্রেমজুড়ে এত কঙ্গনা দেখলে একঘেয়েমি আসতে বাধ্য। কিছু-কিছু দৃশ্য দেখলে তো মনে হয়, কঙ্গনাকে অভিনয়ের জায়গা করে দেওয়া ছাড়া ছবির জন্য দৃশ্যগুলি নিষ্প্রয়োজন। দু’-তিনটি গানও ঢুকিয়েছেন, যা ছবির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় না। এই ছবির শক্তি যদি কঙ্গনা হন, তবে দুর্বলতাও তিনিই।

দুর্বল চিত্রনাট্যের শিকার!

বিলু রাক্ষস
bilu-rakkhosh-still2

অভিনয়: জয় সেনগুপ্ত, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, চান্দ্রেয়ী ঘোষ
পরিচালনা: ইন্দ্রাশিস আচার্য
……

একা একজন মানুষ। একাকীত্বে জর্জরিত। অভিভাবক প্রয়াত, স্ত্রী ছেড়ে চলেছেন। কেন? কারণ তাঁর মধ্যে রাক্ষস বাস করে। চাকরির জাঁতাকলে পড়ে গানবাজনা করতে না পেরে, সেই রাক্ষস বেরিয়ে জীবনের অনেক ক্ষতি করেছে… ছবির এই বিষয়টি আগ্রহ জাগানোর পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু আশা আর বাস্তব তো এক না-ও হতে পারে। বিলু রাক্ষস-এর ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। ছবির শুরুতে বিলুর (জয়) একাকীত্বকে যেভাবে নির্মাণ করেছিলেন পরিচালক, তার রেশ শেষ পর্যন্ত থাকে না। সংসারে শাশুড়ি-বউমা বা স্ত্রীর সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে যে টানাপোড়েনের মধ্যে তাঁকে পড়তে হয়, তার সঙ্গে কেন জানা নেই, দর্শক একাত্ম বোধ করতে পারেন না। হতে পারে, অভিনয় এর জন্য দায়ী, হয়তো বা দুর্বল স্ক্রিপ্টও। কিন্তু সত্যি এটাই, প্রথম ছবি হিসেবে বিষয়টা ভাল বেছেছিলেন পরিচালক। কিন্তু ট্রিটমেন্টের গলদ থেকে গেল। ছবির ন্যারেটিভ স্টাইল ভাল ছিল। অতীত এবং বর্তমানের অনায়াস চলনে বিলুর জীবনের গল্প ভাল করেই ফুটে উঠছিল। কিন্তু যেটা বোঝা গেল না, তা হল হতভাগ্যের কারণগুলো। যে গানকে ভালবেসে বিলুর জীবনের এই ক্রাইসিস, সেই গানকে তো কখনও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিতে দেখা গেল না বিলুকে! জয় সেনগুপ্তর অভিনয় সাধারণ। স্ত্রী সোহিনীর চরিত্রে কনিনীকা ভাল শুরু করলেও, পরে একটু অতিনাটকীয় লেগেছে। চান্দ্রেয়ী বা বাকিরা দুর্বল চিত্রনাট্যের শিকার। আসলে চরিত্রের উত্থান-পতনটা দর্শকদের মধ্যে জারিত করতে পারেননি পরিচালক। বহুরকমের প্লট-সাবপ্লট এসেছে। তাতে ছবির ফোকাস খানিকটা হলেও সরে গিয়েছে। আর সেটাই এই ছবির দুর্বলতা। শেষের দিকে মামাবাড়িতে গিয়ে বিলুর ইলিউশনটা বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে। ছবির আবহসঙ্গীত ভাল। ক্যামেরার কাজও ভাল। কিন্তু এডিটিংয়ের জোরে ছবিটাকে আর একটু ছোট করা যেত।

শুভ মঙ্গল সাবধান

পরিচালক:আর এস প্রসন্ন
অভিনয়: আয়ুষ্মান খুরানা, ভূমি পদনেকর, সীমা পাওয়া, বিজেন্দ্র কালা

না কাব্য করা আমার উদ্দেশ্য নয়, আমি স্রেফ এক লাইনে ‘শুভ মঙ্গল সাবধান’ ছবিটার মানে বোঝাতে চাইছি। এই ছবিটাও যে আমাদের সমাজের একটি কঠিন বিষয়কে, সহজ করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। ভারতীয় মধ্যবিত্ত সমাজের ‘সেক্স’ শব্দটি নিয়ে ছুৎমার্গের কথাটাই হাসি ঠাট্টার মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন পরিচালক মশাই। দিল্লির ছেলে মুদিত শর্মা (আয়ুষ্মান) প্রেমে পড়ে সুগন্ধার (ভূমি)। কিন্তু কথা বলার সাহস যোগাড় করতে না পেরে একেবারে মাট্রিমনিয়াল সাইটের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। জড়িয়ে পড়ে দুই পরিবার। বিয়ের দিন ঠিক হয়ে যায়। তারপরই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত এসে পড়ে এক সমস্যা। মুদিতের ভাষায় ‘জেন্টস প্রবলেম’। সোজা বাংলায়, বিয়ের আগে দু’জনে ঘনিষ্ঠ হতে গেলে পারফরম্যান্স প্রেশারে পড়ে যায় মুদিত। স্ট্রেসের কারণে মুদিত পিছিয়ে আসে। জানাজানি হয়ে গেলে একদিকে পাত্রপক্ষ চেষ্টা করে পাত্রীর ঘাড়ে দোষ দিতে, অন্যদিকে সমাজের তোয়াক্কা না করে পাত্রীর বাবা তাকে পরামর্শ দেয় পালিয়ে যাওয়ার। বিষয়ভাবনায় অভিনবত্ব আপনাকে মুগ্ধ করবে। দেখতে পাবেন, মধ্যবিত্ত ভারতীয় সমাজের মায়েরা কী সাংঘাতিক দক্ষতায় ‘সেক্স’ কথাটি উচ্চারণ না করেই এর পাঠ বিবাহযোগ্য মেয়েদের দেন। ‘আলিবাবা’, ‘গুফা’, নতুন-নতুন শব্দও শিখতে পারবেন বইকী। ছবির সংলাপ এক কথায় দুর্দান্ত। ছোট্ট-ছোট্ট পান আপনাকে অবাক করে দেবে। হাসতে বাধ্য করবে। সংলাপকে আরও রসালো বানিয়েছেন অভিনেতারা। আয়ুষ্মান আর ভূমি খুব ভাল। ‘দম লাগাতে…’ জমজমাট কেমিস্ট্রি এখানেও চোখে পড়ে। গার্ল নেক্সট ডোরের ভূমিকায় ভূমি একদম পারফেক্ট। কিন্তু ভয় হচ্ছে, পরপর একই ধরণের চরিত্র করতে-করতে টাইপকাস্ট না হয়ে যান তিনি। আয়ুষ্মানও সেই দোষে দোষী হতে পারেন। ‘ভিকি ডোনর’ পর থেকেই আর দিল্লির পঞ্জাবি ছেলের চরিত্রটি ছেড়ে বেরতে পারছেন না। আর হ্যাঁ, ছবি হিসেবে ‘দম লাগাতে…’কেই এগিয়ে রাখতে হবে। তবে সুগন্ধার মায়ের ভূমিকায় সীমা পাওয়া অনবদ্য। কয়েকটি দৃশ্যে তো জাস্ট ফাটাফাটি। দারুণ অভিনয় করেছেন সুগন্ধার বাবার ভূমিকায় বিজেন্দ্র কালা। আনন্দ এল রাই ঘরানার এই ছবিতেও সেট থেকে অভিনয়, কোথাও কৃত্রিমতা চোখে পড়ে না। পরিচালক আর এস প্রসন্নও যথাযথ চেষ্টা করেছেন ছবিটিকে একদম আলাদা রূপ দিতে (প্রসঙ্গত, এই ছবিটি ২০১৩-এর তামিল ছবি ‘কল্যাণ সাময়ল সাদহম’ রিমেক। অরিজিনাল ছবিটির পরিচালক ছিলেন প্রসন্ন)। সব মিলিয়ে বেশ ভালই এগোচ্ছিল ছবিটি। হইহই করে কেটে গেলে প্রথম হাফ। কিন্তু ঝামেলা বাধল শেষ দশ মিনিটে। পরিচালক মশাইয়ের হঠাৎ-ই মনে হল, এবার সিনেমা শেষ করা দরকার। ফল, তাড়াহুড়ো এবং অযত্মে ভরা ক্লাইম্যাক্স। এমনকী, জিমি শেরগিলের দৃশ্যটিরও কোনও মানে পাওয়া গেল না। তাই যা হওয়ার তাই হল, ‘সিনেমাটি ভাল হতে পারত’, এই লাইনেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তাও এমন প্রচেষ্টাকে হাততালি না দিয়েও পারছি না।