magazine_cover_27_september_17_2.jpg

Bolly Interview

গণতন্ত্রর প্রতি…

তাঁদের মধ্যে একজন বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী (রাহুল রাম, ‘ইন্ডিয়ান ওশন’ খ্যাত), একজন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার (বরুণ গ্রোভর, ‘মোহ মোহ কে ধাগে), একজন বড় চাকরি ছেড়ে আসা স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান (সঞ্জয় রজৌড়া)। তিনে মিলে স্ট্যান্ড-আপ কমেডির বড় নাম, ‘অ্যায়সি ত্যায়সি ডেমোক্রেসি’। মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাসির ও গানের মাধ্যমে ছিঁড়েখুঁড়ে এক করেন নানা রাজনৈতিক বিষয়কে। সাহসী, খোলামেলা তিন শিল্পী কলকাতায় এসেছিলেন ‘মিউজ়িকম’ অনুষ্ঠানে। সেখানে তাঁদের মুখোমুখি ধৃতিমান গঙ্গোপাধ্যায়

bolly-interview-1
 
 

আপনারা তিনজন এক হলেন কী করে?
রাহুল: তিন বছর আগে, ‘অ্যায়সি ত্যায়সি…’ (এটিডি) তাদের প্রথম শো করে। আমি সঞ্জয়কে চিনি বছর নয় হবে। ওর স্ট্যান্ড আপ কমেডি আমার খুব ভাল লাগত। তো আমি বলেছিলাম, তোমার পারফরম্যান্সে একটু মিউজ়িকের দরকার আছে। ও শুনে, ‘‘হ্যাঁ হ্যাঁ, দরকার আছে’’ বলে কাটিয়ে দিয়েছিল। এদিকে, বরুণ আর সঞ্জয় দু’জনেই স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান বলে, ওদের মধ্যে আদানপ্রদান হচ্ছিল, একে অন্যর কাজ পছন্দ করছিল। তারপর একটা সময়ে ওরা একসঙ্গে পারফর্ম করার প্ল্যান করল। সেসময়ে সঞ্জয় আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে।
সঞ্জয়: আসলে বরুণ আবার মিউজ়িকের কথা বলতে আমার রাহুলের কথা মনে পড়েছিল। তাই…

বরুণ আর সঞ্জয় তো এখনও আলাদা-আলাদা শো-ও করেন। এক হওয়ার সিদ্ধান্তটা কীভাবে নিয়েছিলেন?
বরুণ: ঠিক যেভাবে আপনি সিদ্ধান্ত নেন কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন। চিন্তাভাবনার মিল, কাজের মিল, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে…
সঞ্জয়: রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাটা খুব কাছাকাছি ছিল। একে অন্যের সঙ্গ এনজয় করতাম আমরা। ফলে…

আপনারা কীভাবে স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন, একসঙ্গে বসে?
রাহুল: : না, ইন্ডিভিজুয়ালি। ওরা নিজের-নিজের স্ক্রিপ্ট তৈরি করে আলোচনা করে নেয়, যাতে ক্ল্যাশ না করে। গানের অংশটুকুর জন্য আমরা একসঙ্গে বসি। কখনও ওরা আইডিয়া দেয়, কখনও আমি। তারপর বরুণ লিখে ফেলে। গান আর কনটেন্ট মিলিয়ে তারপর পুরো পারফরম্যান্সটা স্ট্রাকচার করা হয়। মোদ্দা কথা, এক্ষেত্রে আমার কাজটাই সবচেয়ে কম।

বরুণ, আজ না হয় স্ট্যান্ড-আপ কমেডি জনপ্রিয়। বরাবর তো এমন ছিল না। আপনি বহুদিন এই জগতে আছেন। তার আগে ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। ভারতীয় সমাজে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পর স্ট্যান্ড-আপ কমেডিতে আসা তো সহজ নয়…
বরুণ: ভাই, কোনটা সহজ? ইঞ্জিনিয়ার হওয়াও সহজ নয়। তুমি কী করবে সেটা ঠিক করে লেগে থাকতে হবে। সাফল্য এমনিতেই একটা কঠিন ব্যাপার।

এই পেশাতে আসার সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিলেন?
বরুণ: ছোটবেলা থেকেই ‘মুভরস অ্যান্ড শেখরস’, হাস্যকবি সম্মেলন ইত্যাদি দেখে বড় হয়েছি। শরদ যোশী, ইসমত চুঘতাইয়ের মতো লেখকদের পড়েছি। স্যাটায়ার নিয়ে কাজ করার ইচ্ছেটা তখন থেকেই… তা সে হবি হিসেবে হলেও। এখনও তো এই কাজটা আমি ফুলটাইম করছি না। স্ক্রিপ্ট আর গান লেখাই তো আমার পেশা।
রাহুল: আমার কিন্তু ব্যাপারটা দারুণ লাগে। বরুণ আর সঞ্জয় দু’জনেই যেভাবে কর্পোরেট কাজ ছেড়ে এত সহজে একটা নন-স্ট্যান্ডার্ড ফিল্ডে এসেছে… বরুণ কত মাস চাকরি করেছিলে? সফ্‌টওয়্যার, না?
বরুণ: হ্যাঁ, এগারো মাস মতো। ভালই করছিলাম। তারপর ওরা অনসাইট পাঠাবে বলল। আমেরিকা যাব, বেশি পয়সা আয় করব…

ভারতীয় বাবা-মা’র স্বপ্ন…
বরুণ: হ্যাঁ, কিন্তু আমেরিকার নাম শুনেই আমি চাকরিটা ছেড়ে দিলাম!
রাহুল: সঞ্জয় কিন্তু অনেকদিন চাকরি করেছে। শেষে হাল ছেড়ে দেয়… বস, আর হবে না।

bolly-interview-2

এখন তো সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনাদের যথেষ্ট আক্রমণ করা হচ্ছে। মঞ্চে কখনও হয়েছে? মানে দর্শকের মধ্যে থেকে?
সঞ্জয়: এটিডি-র সঙ্গে হয়নি। তবে ব্যক্তিগত শোয়ে হয়েছে। তবে এটা তো এই পেশার অঙ্গ।
রাহুল: আসলে হাসির একটা সুবিধে আছে। অনেকে আমার কাছে এসে বলেছেন, ‘তোমাদের রাজনীতির সঙ্গে আমি সহমত নই, কিন্তু আমি প্রচুর হেসেছি।’ আপনাকে ঘৃণা করলেও, সে হাসবে। হাসি ঘৃণাকে চেপে দেয়। তাছাড়া চারদিকের মানুষও হাসছেন…

পিয়ার প্রেশার থাকে বলছেন?
বরুণ: দর্শকের তো? হয়তো… আর একটা রিয়েলাইজ়েশন যে, বাইরে আমি নিজেকে সংখ্যাগুরু মনে করলেও, এই ঘরের মধ্যে হয়তো নই। হয়তো আমার নিজেকে পালটানো দরকার একটু, বা অন্তত অন্যকে জাজ করাটা বন্ধ করা দরকার…

মাইনরিটির কথায় বলি, আপনারা তো স্ট্যান্ড-আপ কমেডি জঁরেও একটু সংখ্যালঘু…
বরুণ: দেখুন, আমার মনে হয়, ভারতে স্ট্যান্ড-আপ কমেডি জঁরটাই সংখ্যালঘু। অভিব্যক্তির ক্ষেত্রে, শিল্পের ক্ষেত্রে। খুব নেসেন্ট, খুব নিশ। খুব সংকীর্ণ একটা স্পেসে আমরা এখনও পড়ে আছি। আমাদের মধ্যে বেশিরভাগের ভাষাই টিপিক্যাল ‘শিক্ষিত লিবারাল ভয়েস’, যা ভারতে এমনিতেই এখন সংখ্যালঘু। তবে এতে শঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ ঘটেনি। ‘ইন্ডিয়ান ওশন’-এর কথা ধরুন না, এখন তো ওরা অনেকটা মেনস্ট্রিম। কিন্তু যখন শুরু করেছিল…
রাহুল: নিশ তস্য নিশ!
সঞ্জয়: দেখুন, নিজেদের মতো করে কথা বলা… আমরা এটাই করতে পারি। স্ট্যান্ড-আপ কমেডিতে আমাদের দ্বারা আর কিছু হত না। আমি এতে মাইনরিটি, মেজরিটি… কিছুই দেখতে পাই না।
রাহুল: খুব ভাল কথা, সঞ্জয়। তাহলে আমার একটা প্রশ্ন আছে তোমার কাছে। ধরে নেওয়া যায়ক, কপিল শর্মা ওর শোয়ে তোমায় ডাকল… যাবে?
সঞ্জয়: জানি না… হয়তো না। কারণ আমি আগে ‘বিগ বস’-এর অফারও পেয়েছি।
রাহুল: ধুস! ‘বিগ বস’ তো ফালতু। কপিল শর্মার শো তো বেসিক্যালি ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় কমেডি অ্যাক্ট!
সঞ্জয়: মনে হয় যাওয়া উচিত। তার কারণ অডিটোরিয়ামে আমি ২০০ লোকের কাছে পৌঁছতে পারি। টিভির মাধ্যমে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারব।
রাহুল: আর বরুণ?
বরুণ: আমি যা মঞ্চে বলি, তার ৮০%-ও যদি টিভিতে বলতে দেওয়া হয়, অবশ্যই যাব।
রাহুল: জানেন তো, কেউ শখ করে নিশ থাকতে চায় না। তারা যে কাজটা করছে, সেটা যদি মেনস্ট্রিম হয়ে যায়, তাহলে কোনও আপত্তি থাকে না তাদের।

রাহুল এবং সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত হওয়াও কি আদতে বেশি মানুষকে ছোঁয়ারই একটা প্রচেষ্টা?
বরুণ: সঙ্গীতকে পারফরম্যান্সে ঢোকানোর একটা বড় কারণ সত্যিই এটা যে সঙ্গীত অনেক বেশি মানুষকে ছোঁয় এবং সঙ্গীত জোকের চেয়ে অনেক বেশি সময় বাঁচে। জোক বোরিং হয়ে যাবে দ্বিতীয়বারেই, গান তো তা হবে না। রাহুলের আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া কিন্তু ঠিক প্ল্যান করা নয়। আমরা জানতামও না ক’টা শো রাহুল করবে। আমার এক বন্ধু বলেছিল ‘দশ হাজার টাকার বাজি, রাহুল পাঁচটা শোয়ের বেশি করবে না।’
রাহুল: এই তো, দে দে, টাকা দে! নিয়েছিস তো?
বরুণ: সেটা তো ঠিক…
রাহুল: কী রে তুই! এমন একটা সুযোগ হেলায় হারানো… ধুস!
বরুণ: আমি তো বাজিটা লাগাই-ই নি! শিওর হব কী করে? আমাদের প্রথম শোয়ের আগে একসঙ্গে তিনজন মাত্র একবার এক হয়েছিলাম, শোয়ের আগের দিন!

ধরে নিন আমি একজন শো অর্গানাইজ়ার। আমি ‘এটিডি’র একটা শো চাই। আপনারা আলাদা-আলাদা ভাবে ব্যস্ত, একসঙ্গে তিনজনকে বুক করা তো কঠিন কাজ!
রাহুল: বস, সবচেয়ে ব্যস্ত বরুণ। ও প্রযোজক-পরিচালকদের হাতে-পায়ে ধরিয়ে রাজি করিয়ে শো করতে আসে। তবে আপনি যে সমস্যার কথা বলছেন, সেটা কিন্তু খুব বাস্তব। আমি বিদেশে যাব কিছুদিনের জন্য। তখন হবে না। এর আগে বরুণ কান গিয়েছিল, হয়নি। যখন থাকব, হবে!

শেষ প্রশ্ন। আমি জানি আপনাদের সবাই সাহসী বলে, এই প্রশ্ন শুনে-শুনে আপনারা বিরক্ত হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু সত্যিই কি এই মুহূর্তে সরকারবিরোধী জোক করা অনেক বেশি কঠিন? আগে যখন বরুণ কংগ্রেস-জোক ক্র্যাক করতেন…
রাহুল: ইয়ার, আমি একটা কথা বলি? সফদর হাশমিকে কারা মেরেছিল, সবাই জানে। এ নতুন কথা নাকি? এই শহরে বাম সরকারের কম ভায়োলেন্স আছে? ভায়োলেন্স তো কোনও একটি দলের সম্পত্তি নয়, সবাই সমান। সেদিক থেকে হাসির অনুষ্ঠান অনেক নিরাপদ। আর নিরাপত্তার কথা… আজ শো দেখতে কারা এসেছে? ৭০০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে যারা আসতে পারে। আমি তো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান করছি না। সেটা হলে সাহসের ব্যাপার ছিল!

তাহলে বলছেন এই ছোট্ট ঘরের অনুষ্ঠানে এস্ট্যাব্লিশমেন্টের কিছু এসে-যায় না?
রাহুল: না, এসে-যায়। কিন্তু এত টাকা খরচ করে কেউ গুন্ডা পাঠাবে না, বিশ্বাস করুন!