magazine_cover_12_november_17.jpg

Tolly Interview

বাঙালিরা ছবির ব্যাপারে অনেক বেশি সেন্টিমেন্টাল। মুম্বইতে সবকিছুই কেমন যেন প্লাস্টিক এবং মেকি: বাবা যাদব

কোরিয়োগ্রাফার সরোজ খানের সহকারী হিসেবে মুম্বইতে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন। এরপর বাংলা ছবিতেও প্রায় বছর দশেক হল কোরিয়োগ্রাফি করছেন। তবে এবার শুধু কোরিয়োগ্রাফি নয়, নতুন বাংলা ছবি ‘বস’-এর হাত ধরে তিনি ডিরেকশনে ডেবিউ করতে চলেছেন। ‘বস’ এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে বাবা যাদব চুটিয়ে আড্ডা দিলেন আসিফ সালামের সঙ্গে

 

বাবা আপনার আসল নাম কী?

(হাসি) না না। আমার ভাল নাম রাজেশ যাদব। বাবা আমার ডাকনাম। আসলে, মুম্বইতে বাবা-র অনেক মানে হয়। যেমন ধরুন, ওখানে লোকজন বলে থাকে, ‘আরে বাবা ইয়ে মত কর, আরে বাবা টেনশন মত দে!’ সরোজজি (খান) আমাকে সবসময় ওইভাবেই সম্বোধন করতেন। ‘বাবা তু ইধার আ জা’, ‘বাবা তু ইয়ে স্টেপ কর’, সরোজজি আমাকে বাবা নামেই ডাকতেন। তাই বলতে পারেন, বাবা নামটি সরোজজিই জনপ্রিয় করে তোলেন। সেই থেকে আমি এই নামটাই ব্যবহার করি। তা ছাড়া কোরিয়োগ্রাফারের সঙ্গে রাজেশ নামটা ঠিক যায় না! একটু ছোট, স্টাইলিশ কিছু দরকার ছিল, তাই বাবা নামটাই বেস্ট।

 

সরোজ খান তো আপনার গডমাদার…

আমার ভগবান। প্রোফেশনাল জগতে কীভাবে চলতে হয়, তা সরোজজিই আমাকে আঙুল ধরে শিখিয়েছেন। আমি সরোজজিকে ‘আম্মা’ বলে ডাকি, আমার সেকেন্ড মম। আজ আমি এই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছি শুধুমাত্র ওঁর জন্য। কোরিয়োগ্রাফি থেকে শুরু করে ক্যামেরার সামনে নিজের ইমোশন মেলে ধরা, সবকিছুই ‘আম্মা’র থেকে শেখা।

 

তা সরোজজিকে ‘বস’-এর প্রোমো এবং গান দেখিয়েছেন?

না, এখনও দেখানো হয়নি। আসলে উনি এখন আউট অফ টাউন। মুম্বইতে ফিরে আসলেই দেখাব। ওঁর ফিডব্যাক নেওয়াটা খুব জরুরি।

 

এবার আসি আপনার প্রথম পরিচালনা ‘বস’ প্রসঙ্গে। কেমন অভিজ্ঞতা হল?

ইটস্ আ লার্নিং এক্সপিরিয়েন্স। পরিচালনায় না এলে জানতেই পারতাম না, আরও কতকিছু শেখার আছে। একজন পরিচালককে সবকিছু দেখতে হয়। অনেক দায়িত্ব থাকে তার কাঁধে। তবে আমি এই অভিজ্ঞতাটা খুব এনজয় করেছি।

 

কোরিয়োগ্রাফি না ডিরেকশন, কোনটা বেশি চ্যালেঞ্জিং?

দু’টোই চ্যালেঞ্জিং। একজন কোরিয়োগ্রাফার যদি ছবিতে ছ’টা গানের কোরিয়োগ্রাফি করে, তার মানে গোটা ছবির আধঘণ্টা কিন্তু তাঁকে ডিরেক্ট করতে হচ্ছে। আবার অন্যদিকে, পরিচালকের উপর অনেক বেশি দায়িত্ব থাকে। একটা ছ’-সাত কোটি টাকার ছবি যদি আপনাকে ডিরেক্ট করতে দেওয়া হয়, তার মানে ভেবে দেখুন, সেই ছবির প্রযোজক আপনার উপর কতটা আস্থা রাখছেন।

 

হঠাত্ করে পরিচালনার শখ জাগল কেন? আগে থেকেই এরকম কোনও পরিকল্পনা ছিল?

অনেক আগে ‘মিট ব্রাদার্স’ এবং সোনু কক্করের জন্য দুটো হিন্দি মিউজ়িক ভিডিয়ো ডিরেক্ট করেছিলাম। তবে সেটা ছবি পরিচালনার তুলনায় কিছুই না। আসলে পরিচালনায় আসার প্ল্যান অনেক আগেই ছিল। মুম্বইতে অনুভব সিন্হা এবং আদিত্য চোপড়ার সঙ্গে প্রচুর কাজ করেছি। অনুভবের সঙ্গে প্রায় দেড়শোর উপর মিউজ়িক ভিডিয়োতে কাজ করেছি। ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’তে আদিত্যকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। বলতে পারেন, আদিত্য এবং অনুভবকে দেখেই আমার পরিচালনার প্রতি ভালবাসা জন্মায়। ওঁরা সবসময় বলতেন, ‘বাবা, লাইফ মে হামেশা আগে বড়তে রহনা হ্যায়।’ আমি ভাবতাম, হোয়াট নেক্সট? কোরিয়োগ্রাফির পর কী?

 

তা হিন্দি ছবি পরিচালনা না করে, বাংলা ছবি দিয়ে ডিরেকশনে ডেবিউ করলেন কেন?

বেশ কয়েকবছর ধরে বাংলা ছবিতে কোরিয়োগ্রাফার হিসেবে কাজ করছি। সত্যি বলতে, এখানে লোকরা ছবির ব্যাপারে অনেক বেশি সেন্টিমেন্টাল। মুম্বইতে সবকিছুই কেমন যেন প্লাস্টিক এবং মেকি। ওখানে পুরো কর্পোরেট কালচার। সবকিছু পেন অ্যান্ড পেপারে হয়। মুখের কথার কোনও দাম নেই। বাংলা ছবিতে এখনও লোকে ইমোশন, গান, ড্রামা দেখতে চান। মুম্বইতে এরকম ছবি হলে সকলে বলবেন, ‘ইয়ার ইয়ে বহুত ফিল্মি হ্যায়’। আরে ইয়ার, আমরা সকলে ফিল্ম তৈরি করছি। আমরা তো ফিল্মি হবই! একটা লোক আড়াই ঘন্টার জন্য সমস্ত টেনশন, ক্লান্তি ভুলে গিয়ে, হলে ঢুকে একটু রিল্যাক্স করতে চান। তাঁকে যদি এন্টারটেন না করতে পারলাম, তবে আর ছবি বানিয়ে কী লাভ? তা ছাড়া, টলিউডে এতবছর কাজ করার পর আমি কনফেস করতে চাই, এখানে কাজ করতে আমি অনেক বেশি কমফর্টেবল বোধ করি। জিত্, দেব, হিরণ, অঙ্কুশ, শুভশ্রী, শ্রাবন্তী, পায়েল, কোয়েল, এরা সকলেই আমার খুব কাছের। এদের সঙ্গে কাজ করার মজাই আলাদা! আরও একটা কথা বলতে চাই, টলিউডে কোরিয়োগ্রাফার বাবা যাদবকে জায়গা করে দেওয়ার জন্য আমি ‘ভেঙ্কটেশ ফিল্মস’ এবং ‘সুরিন্দর ফিল্মস’-এর প্রতি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।

 

 

‘বস’-এর সেটে জিত্ আপনার উপর কতটা ‘বস’গিরি করেছেন?

একেবারেই না। ইনফ্যাক্ট আমি নবাগত পরিচালক হওয়া সত্ত্বেও, জিত্ আমার উপর ভরসা রেখেছে। আমাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। কাস্টিং থেকে শুরু করে সবকিছু আমরা একসঙ্গে বসে ঠিক করেছি। তবে হঁ্যা, যেহেতু জিত্ ইজ় অলসো দ্য প্রোডিউসার, ও পুরো জিনিসটার উপর কনস্ট্যান্ট মনিটরিং করেছিল।

 

বাবা যাদবের জীবনে ‘বস’ কে?

প্রথমেই বলব আমার মায়ের কথা। ছেলেবেলা থেকে অনেক কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছে। এখনও বাড়ি ফিরলে, প্রথমেই মাকে চাই। মা সবসময় আমার পাশে থেকেছে। এরপর বলব, আমার স্ত্রীর কথা। ও আমার জীবনের অন্যতম বড় সাপোর্ট। আমাকে খুব ভাল বোঝে। ইনফ্যাক্ট, ‘বস’ ছবির শুটিংয়ের সময় ও প্রেগন্যান্ট ছিল, কিন্তু তবুও প্রত্যেকদিন সেটে আমার সঙ্গে থাকত। সরোজজির কথা নতুন করে কিছু বলার নেই। তা ছাড়া আর একজন আছেন, যিনি আমাদের সকলের বস। ভগবান। আমার মা খুব কালীভক্ত। আমাদের কূলদেবীও কালীমা। লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট, আমি জিতের কথা বলব। জিতের সঙ্গে আমার বহুবছরের আলাপ। সেই ২০০৪ সালে ‘বন্ধন’ ছবির হাত ধরে আমাদের বন্ধুত্বের শুরু। এরপর, আমি এবং জিত্ প্রায়সময়ই আড্ডা দিতাম। অনেককিছু নিয়ে আলোচনা করতাম। সেই সময় আমি একবার জিতকে বলেছিলাম, আমার খুব ইচ্ছে, পরিচালনা করার। জিত্ কিন্তু আমার কথাটা মনে রেখেছে এবং একজন কোরিয়োগ্রাফারকে তুলে এনে পরিচালকের আসনে বসানোর জন্য, জিত্‌কে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

 

‘বস’-এর ইউএসপি…

অ্যাটিটিউড। একটা লোক মুম্বইয়ের মতো শহরে গিয়ে, সেই শহরকে রুল করছে, এটা কিন্তু মুখের কথা নয়। এই ছবিটা পরিচালনা করতে আরও সুবিধে হয়েছে কারণ, আমি মুম্বইতে বেড়ে উঠেছি। আই নো হাউ হার্শ মুম্বই ক্যান বি। একটা টু বিএইচকে ফ্ল্যাট পেতে কালঘাম ছুটে যায়। এরকম একটি শহরে গিয়ে সেখানে আপনার রাজত্ব গড়ে তোলার পিছনে চাই প্রচুর পজ়িটিভ এনার্জি। জিত্ হ্যাজ় ফিটেড ইনটু দ্য রোল ভেরি নাইসলি। তা ছাড়া রকি রাজেশের অ্যাকশন, জিত্ গঙ্গোপাধ্যায়ের মিউজ়িক, সবকিছুই এই ছবিকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়। সব মানুষেরই একটা নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ থাকে। ‘বস’ ছবিটি হল একেবারে মাই টাইপ অফ মুভি। অ্যাটিটিউড, রিয়্যাল অ্যাকশন, মনকাড়া গান, ‘বস’ ইজ় অল অ্যাবাউট রিয়্যাল থিংস। এখানে কোনও স্ল্যাপস্টিক কমেডি বা ননসেন্স নেই।

 

আচ্ছা, আপনি তো জিত্-দেব, দু’জনের সঙ্গেই কাজ করেছেন। বর্তমানে এঁরা দু’জনেই টলিউডের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার। তা দেব এবং জিতের কাজের মধ্যে কতটা পার্থক্য রয়েছে?

দু’জনের নেচারই দু’ ধরনের। প্রথমে জিতের কথা বলি। ‘বস’-এর মতো হেভিওয়েট সাবজেক্ট, জিত্ ছাড়া কেউ ক্যারি করতে পারত না। জিতের প্রেজ়েন্স আমার ছবির গল্পকে জাস্টিফাই করে। জিত্ ইজ় দ্য রিয়্যাল গাই উইথ রিয়্যাল অ্যাটিটিউড, রিয়্যাল ডেলিভারি অফ ডায়ালগস। ও যখন সংলাপ বলে, তখন মনে হয় না যে, ও কোনও ডায়ালগ বলছে। হি ইজ় সো ভেরি ন্যাচারাল। জিতের অ্যাকশন এবং অভিনয় অসামান্য। এখন তো ও আবার প্রযোজকও। বিগত আট বছর ধরে দেখছি, জিত্ অনেক ম্যাচিয়োর হয়েছে। হি হ্যাজ় গ্রোন অ্যাজ় আ হিউম্যান বিং অলসো। তা ছাড়া জিত্ খুব ঠান্ডা মাথার এবং ভীষণ শার্প। এদিকে দেব, কলেজ গোয়িং স্টুডেন্ট হিসেবে খুব ভাল। ইয়ং জেনারেশনের মধ্যে ও অত্যন্ত জনপ্রিয়। ওর ধরনের চরিত্র পেলে ও অনবদ্য। আমি দেবের সঙ্গে প্রথম কাজ করি ‘আই লাভ ইউ’ ছবিতে। এখন ‘রংবাজ’ করার সময় লক্ষ করছি, দেব অনেক বেশি ম্যাচিয়োর হয়েছে। ক্যারেক্টারের গ্রিপ সহজেই ধরতে পারে। তা ছাড়া ওর এক্সট্রা অ্যাডভান্টেজ, হি ইজ় আ ফ্যান্টাস্টিক ডান্সার। দু’জনেরই আলাদা-আলাদা স্ক্রিন প্রেজ়েন্স এবং ওরা একটা কমপ্লিট প্যাকেজ।

 

একটা সময় ‘রংবাজ’ ‘বস’-এর সঙ্গে রিলিজ় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন তো শোনা যাচ্ছে, ‘রংবাজ’-এর তিনটি গান এখনও বাকি। আপনি তো এই ছবিরও কোরিয়োগ্রাফার। তা একইসঙ্গে দুটো ছবির প্রেশার সামলাচ্ছেন কীভাবে?

আমি সরোজজির ছাত্র। একসঙ্গে দশটা গানের কোরিয়োগ্রাফি করলেও দেখবেন, প্রত্যেকটি গানের কোরিয়োগ্রাফি আলাদা-আলাদা। ‘রংবাজ’-এর তিনটি গান বাকি। এখনও আলোচনা চলছে, শুটিং শুরু হয়নি।

 

কোরিয়োগ্রাফার বাবা যাদব, কোন নায়ক-নায়িকাকে সেরা ডান্সারের শিরোপা দেবেন?

বলিউডে হৃতিক রোশন। ওর সঙ্গে ‘ফিজ়া’ এবং ‘ইয়াদেঁ’তে কাজ করেছি। অসামান্য নাচ করে। বলিউডে নায়িকাদের মধ্যে শ্রীদেবীজি এবং মাধুরী দীক্ষিতের পাশে কেউ দাঁড়াতে পারবে না। এদিকে টলিউডে সকলেই মোটামুটি ভাল ডান্স করে। ডান্স যে এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক, সেটা সকলে বুঝতে শিখেছে। নায়কদের মধ্যে অঙ্কুশ ভাল ডান্স করে। তবে সোহম আমাকে অবাক করেছে। ‘প্রেম আমার’-এর সোহম এবং এখনকার সোহমের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এখন নাচ করার সময় সোহমকে অনেক কনফিডেন্ট লাগে। এদিকে নায়িকাদের মধ্যে, শ্রাবন্তী, শুভশ্রী, কোয়েল, সকলেই খুব ভাল। শ্রাবন্তী তো দিনে-দিনে বেশি সুন্দরী হচ্ছে! সায়ন্তিকার ডান্সও আমার খুব ভাল লাগে। শি ইজ় ভেরি অ্যাকিউরেট।

 

শেষ প্রশ্ন। পরিচালকরা তো সাধারণত তাঁদের নায়িকাদের সঙ্গে ফ্লার্ট করে থাকেন। তা শুভশ্রীর সঙ্গে ফ্লার্ট করার কতটা সুযোগ পেলেন?

আমি কোনও নায়িকার সঙ্গেই ফ্লার্ট করার সুযোগ পাই না। কারণ, আমার স্ত্রী সবসময় সেটে উপস্থিত থাকে (হাসি)! কিন্তু আমি মনে করি, একজন নায়িকা তার পরিচালকের ড্রিম গার্ল। আড়াই ঘণ্টার জন্য দর্শকের মনে হওয়া উচিত, তাঁর লাইফ পার্টনারও যেন সেই ছবির নায়িকার মতো হয়। এটা কিন্তু পরিচালকের কর্তব্য।